ঢাকা, বুধবার ০২, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০৯:০১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
খুলনায় মাঝ নদীতে ফেরি-ট্রলার সংঘর্ষ, উদ্ধার ৪০ আজ থেকে একাদশে ভর্তির আবেদন শুরু ৬ অঞ্চলে ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত নারী টি-২০: র‌্যাঙ্কিংয়ে মারুফা-সোবহানার উন্নতি গণতন্ত্র নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক: প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত নেপালে বন্যায় প্রাণহানী বেড়ে ৯৫৫, নিখোঁজ ৪৪৭১

নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

অনন্যা অনু | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৪৯ পিএম, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

হিমালয়ের কান্না, বদ্বীপের অশনিসংকেত: গত কয়েক দিনে নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। হিমালয়ের হিমবাহ ভেঙে সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস এবং কাদার স্রোতে হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু, হাজারো মানুষ নিখোঁজ এবং অসংখ্য গ্রাম-জনপদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, এটি হিমালয় অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ জলবায়ুজনিত দুর্যোগ। বিজ্ঞানীরা এর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের কথা বলছেন। 

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি তাই খুবই স্বাভাবিক—নেপালের এই বিপর্যয় কি আমাদের ভবিষ্যতেরও প্রতিচ্ছবি?

হিমবাহ ভাঙার ঢেউ কোথায় গিয়ে থামে?: নেপালের উত্তরাঞ্চলে তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন ল্যাংটাং অঞ্চলের একটি হিমবাহ ও বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা। ত্রিশূলী ও ভোতেকোশী নদীর পানি কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক মিটার বেড়ে যায়। সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বসতি—সবকিছু কাদার স্রোতে তলিয়ে যায়। 

এই নদীগুলোর পানি শেষ পর্যন্ত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অংশ হয়ে বাংলাদেশমুখী নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়। অর্থাৎ হিমালয়ে যা ঘটে, তার প্রতিধ্বনি একসময় বাংলাদেশের নদীতেও শোনা যায়।

বাংলাদেশের ভয় কোথায়?: বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা বন্যাপ্রবণ সমভূমি। হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার বিপুল পানি এবং বঙ্গোপসাগরের জোয়ার—দুইয়ের মাঝখানে অবস্থান আমাদের। ফলে উজানের যেকোনো অস্বাভাবিক ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। 

নেপালের এই দুর্যোগ বাংলাদেশের সামনে অন্তত পাঁচটি বড় সংকেত তুলে ধরেছে।

১. আকস্মিক বন্যা হবে আরও ঘনঘন

হিমবাহ গলে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এসব হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিচের দিকে ভয়াবহ পানির ঢল নামে। বিজ্ঞানীরা একে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বলেন।

জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) ইতোমধ্যে নেপাল, ভারত ও চীনের সীমান্তজুড়ে অন্তত ৪৭টি উচ্চঝুঁকির হিমবাহ হ্রদের কথা জানিয়েছে। আরও অনেক হ্রদ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

বাংলাদেশে এর প্রভাব হতে পারে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি, নদীর তীব্র স্রোত এবং স্বল্প সময়ে বন্যা।

২. বর্ষার চরিত্র বদলে যাচ্ছে

আগে বর্ষাকাল দীর্ঘ হলেও বৃষ্টির বণ্টন ছিল তুলনামূলক স্বাভাবিক। এখন কয়েক দিনে কয়েক মাসের সমান বৃষ্টি হচ্ছে।

এ বছরও বাংলাদেশে উজানের পানি ও ভারী বর্ষণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু জেলা প্লাবিত হয়েছে। জুলাই মাসে ১০টি জেলায় ১১ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

এটি দেখাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টির ধরন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।

৩. নদী আর আগের মতো থাকবে না

হিমবাহ দ্রুত গললে প্রথম দিকে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে একদিকে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট—দুই ধরনের সমস্যাই বাড়তে পারে। 

৪. পাহাড়ধস ও ভূমিধস বাড়বে

চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি—বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল ইতোমধ্যেই ভূমিধসপ্রবণ।

হিমালয়ে যেমন অতিবৃষ্টি পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে, তেমনি বাংলাদেশের পাহাড়েও অতিবৃষ্টি, বন উজাড় এবং অবৈধ বসতি ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৫. খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে

বন্যা শুধু মানুষ ভাসিয়ে নেয় না; কৃষিজমি, বীজ, খাদ্যগুদাম, মাছের ঘের—সব ধ্বংস করে।

বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের বড় অংশই বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে। একাধিক আকস্মিক বন্যা খাদ্য উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

নেপাল আমাদের ভবিষ্যতের আয়না: নেপালের বিপর্যয়কে অনেকেই “দূরের ঘটনা” ভাবতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একই জলবায়ু ব্যবস্থার অংশ।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ আরও ঘনঘন ঘটবে। লাখো মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে একই সতর্কতা দিয়ে আসছেন—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা একসঙ্গে তীব্র হবে।

আমরা কতটা প্রস্তুত?

বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশ্বের প্রশংসিত দেশ। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছে।

কিন্তু নতুন ধরনের জলবায়ু দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি এখনও পর্যাপ্ত নয়।

যেসব পদক্ষেপ এখনই জরুরি: হিমালয়-উৎস নদীগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা জোরদার করা।

বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দ্রুত করা।

নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো।

পাহাড় ও বন সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

জলবায়ু অভিযোজন বাজেট বাড়িয়ে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।

সীমান্তবর্তী নদীগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

রাজনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন: দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে বন্যা এলেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে—উজানের পানি ছাড়া হয়েছে কি না, কোন দেশের দায় কতটুকু।

কিন্তু নেপালের ঘটনা দেখিয়ে দিল, সব দুর্যোগ মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাঁধের কারণে নয়। হিমবাহ ভাঙা, অতিবৃষ্টি, উষ্ণায়ন—এসব বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের ফল।

তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

শেষ কথা: নেপালের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ যদি শুধু সহানুভূতি জানিয়ে থেমে যায়, তবে সেটি হবে বড় ভুল। হিমালয়ের বরফ গলার শব্দ আসলে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়েও প্রতিধ্বনিত হয়। আজ নেপালের পাহাড় ভেঙেছে, কাল বাংলাদেশের নদী উপচে পড়তে পারে। আজ তাদের গ্রাম কাদায় চাপা পড়েছে, কাল আমাদের শহর পানিতে ডুবতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের সংকট নয়—এটি বর্তমানের বাস্তবতা। নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগ আমাদের সামনে শেষবারের মতো নয়, কিন্তু সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: বাংলাদেশ কি এখনও সময় থাকতে প্রস্তুতি নেবে, নাকি পরবর্তী বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকবে?