ঢাকা, বুধবার ১০, জুন ২০২৬ ২৩:১৬:২৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হামে ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন শিশুর মৃত্যু সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ শুরু হবে শিগগিরই: প্রধানমন্ত্রী হাতিয়ায় মেঘনা নদীতে পড়ে শিশু নিখোঁজ ১৭ জেলায় বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার আহবান ডা. জুবাইদার বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় শান্তিরক্ষীদের প্রশংসায় প্রধানমন্ত্রী

এই বর্ষায় কদম ফুল: বৃষ্টিভেজা বাংলার প্রেম

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৪৯ পিএম, ১০ জুন ২০২৬ বুধবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

আকাশজুড়ে কালো মেঘ। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি। ভিজে ওঠে পথঘাট, গাছপালা, মাঠ-ঘাট। আর ঠিক তখনই প্রকৃতির বুকজুড়ে ফুটে ওঠে গোলাকার সোনালি-সাদা এক আশ্চর্য ফুল—কদম। বর্ষা আর কদম যেন একে অপরের পরিপূরক। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে কদম ফুলের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে বাংলার মানুষ যুগ যুগ ধরে বর্ষাকে চিনেছে কদমের সুবাসে, কদমের রঙে।

কদম শুধু একটি ফুল নয়, এটি বাঙালির আবেগ, প্রেম, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্ষার দূত

বাংলাদেশে সাধারণত আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে কদম ফুল সবচেয়ে বেশি ফোটে। গ্রামের পথের ধারে, নদীর তীরে, বাড়ির উঠানে কিংবা শহরের পার্কে কদমগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামার কিছুদিনের মধ্যেই গাছে গাছে দেখা যায় গোলাকার হলুদাভ-সাদা ফুলের সমারোহ।

উদ্ভিদবিদদের মতে, কদমের বৈজ্ঞানিক নাম Neolamarckia cadamba। এটি দ্রুত বর্ধনশীল একটি বৃক্ষ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর বিস্তার থাকলেও বাংলা অঞ্চলে কদম বিশেষ সাংস্কৃতিক মর্যাদা লাভ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একাধিক গবেষক জানিয়েছেন, কদম ফুলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর গোলাকার পুষ্পমঞ্জরি। অসংখ্য ক্ষুদ্র ফুল একত্রিত হয়ে একটি বলের মতো আকৃতি তৈরি করে। তাই দূর থেকেই এটি সহজে নজর কাড়ে।

প্রেমের ফুল, কবিতার ফুল

কদম ফুলের কথা উঠলেই মনে পড়ে যায় বাংলা সাহিত্য ও গানের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা—বর্ষা ও কদম বারবার ফিরে এসেছে নানা রূপে।

বৃষ্টিভেজা বিকেলে কদম হাতে অপেক্ষা করা প্রেমিকের ছবি কিংবা জানালার ধারে বসে কদমের সুবাসে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকার মুখ—এসব চিত্র বাংলার সাহিত্য ও সংগীতে বারবার উঠে এসেছে।

লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, কদম ফুল বাংলার প্রেমের অন্যতম প্রতীক। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে একসময় প্রিয়জনকে কদম ফুল উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। এখনো বর্ষাকালে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কদম ফুলের ছোট ছোট তোড়া বিক্রি করতে দেখা যায়।

শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে কদমের সম্পর্ক

বাংলা ও উপমহাদেশের পুরাণেও কদমের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় বৃক্ষগুলোর একটি ছিল কদম। বৃন্দাবনের কদমতলে কৃষ্ণের বাঁশির সুর ও রাধার সঙ্গে তাঁর লীলার নানা কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত।

এ কারণে অনেক মন্দির ও ধর্মীয় স্থানের আশপাশে কদমগাছ লাগানোর রীতি আজও দেখা যায়।

শহরে হারিয়ে যাচ্ছে কদম

একসময় গ্রামবাংলার প্রায় সর্বত্র কদমগাছ দেখা যেত। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, অবাধ গাছকাটা এবং পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের কারণে কদমগাছের সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

তাদের মতে, কদম শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না, এটি পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত বেড়ে ওঠা এই গাছ ছায়া দেয়, বায়ুদূষণ কমাতে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন পাখি ও কীটপতঙ্গের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

তাই নগর পরিকল্পনায় কদমসহ দেশীয় বৃক্ষকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।

এক মুঠো বর্ষার স্মৃতি

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত নগরজীবনে কদম ফুল যেন আমাদের শৈশবের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় গ্রামের কাঁচা রাস্তা, টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ, পুকুরপাড়ের সবুজ গাছ আর ভেজা মাটির গন্ধ।

বর্ষা আসে প্রতি বছর, আবার চলে যায়। কিন্তু কদম ফুল ফুটলে মনে হয় প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রেমে পড়েছে। গোলাকার ছোট্ট সেই ফুলটি হাতে নিলেই যেন ধরা দেয় এক মুঠো বৃষ্টি, এক মুঠো স্মৃতি আর এক মুঠো বাংলা।

এই বর্ষায় তাই কদম ফুল শুধু চোখের সৌন্দর্য নয়, হৃদয়েরও আশ্রয়। বৃষ্টিভেজা বিকেলে কদমের দিকে তাকালে মনে হয়—প্রকৃতি এখনও তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতাগুলো লিখে যাচ্ছে, নীরবে, ধীরে, কদম ফুলের পাপড়িতে।