ঢাকা, বুধবার ২২, জুলাই ২০২৬ ২০:১৫:৪৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

কোথায় যায় পরিত্যাক্ত শিশু!

আপডেট: ১০:৪৬ এএম, ৫ নভেম্বর ২০১৪ বুধবার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম, ঢাকা : দেশে আশংকাজনক হারে বাড়ছে অনাকাংখিত শিশুর সংখ্যা। ওদের কারো জন্ম অভিজাত পাড়ার ক্লিনিকে কারো বা জন্ম বস্তিতে। কেউ কেউ আবার জন্ম নিয়েছে সরকারী হাসপাতালে। কিন্তু মা-বাবার স্নেহ জোটেনি তাদের ভাগ্যে। নিস্পাপ এসব শিশুদের মা-বাবার পরিচয় অজানাই থেকে গেছে। এসব অসহায় শিশুকে তার নিষ্ঠুর-নির্দয় বাবা-মা বা পরিবারের কেউ নির্দিধায়-নিসংকোচে ফেলে যাচ্ছে ডাষ্টবিনে, হাসপাতালে কিংবা ক্লিনিকে। কোথায় যায় এসব পরিত্যাক্ত শিশু! প্রতি বছর দেশে প্রচুর এধরনের শিশু জন্মগ্রহণ করলেও মোট পরিসংখ্যান নেই কোথাও।সিটি কর্পোরেশনের সমাজকল্যান বিভাগে আলাপ করে জানা যায় ঢাকা মহানগরীতে কত অনাকাংক্ষিত শিশুর জন্ম হয় তা তাদের জানা নেই। ডিসিসিতে এধরণের কোনো প্রকল্পও নেই। পুলিশের কাছেও এধরণের কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, বিভিন্ন ক্লিনিক ও পূর্নবাসন কেন্দ্রে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ বছরে দেশে এ ধরনের শিশুর সংখ্যা বেড়েছে আশংকাজনক হারে। এদের অধিকাংশই অবৈধ সম্পর্কের ফসল। জানা গেছে এসব অনাকাংক্ষিত শিশুরাই আবার কারো কারো জীবনে হয়ে উঠছে পরম আকাংক্ষিত। দত্তকের মাধ্যমে তারা পাচ্ছে মা-বাবা। পাচ্ছে জীবনের নিশ্চয়তা। বেড়ে উঠছে ভালো পরিবেশে। বস্তির শিশু কন্যা বা পুত্রটি আশ্রয় পাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ দেশের অভিজাত পরিবারে। আবার অনেক সময় অভিজাত ঘরের মেয়ের অনাকাংক্ষিত সন্তানটির স্থান হচ্ছে গরীর খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে। সমাজ সেবা অধিদপ্তরে কথা বলে জানা গেছে এসব শিশুদের জীবনের নিশ্চয়তার কথা চিন্তা করে তারা ছোট্টমনি শিশু নিবাস নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রথম পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি নিবাস তৈরি করা হয়। এই তিনটি নিবাসের প্রতিটিতে ১০০টি করে আসন রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে মোট ২শ এবং ঢাকায় ২৫টি শিশু রয়েছে। দ্বিতিয় পর্যায়ে সিলেট, খুলনা ও বরিশালে মোট ৩ শ আসনের আরো তিনটি শিশু নিবাস গড়ে তোলা হয়। এগুলোতে নিয়মিত ৫০ শতাংশ শিশু থাকে। এসব শিশুদের প্রতি মাসে মাথাপিছু ব্যয় ১৫শ টাকা। ওদের পেছনে সরকারের প্রতি বছর ব্যয় হয় প্রায় এক কোটি বারো লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। এছাড়া প্রতিটি নিবাসে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারি রয়েছে ১৫-২০ জন। সমাজ কল্যান মন্ত্রনালয়ের আওতায় পরিচালিত প্রতিটি নিবাসে শিশুদের দেখ-ভালের জন্য রয়েছেন তিন জন খালাম্ম, একজন মেট্রন, একজন কটেজ মাদার এবং দুজন করে শিক্ষিকা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছোট্টমনি শিশু নিবাসের প্রকল্প পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, এসব নিবাসে ০ থেকে ৫ বছর বয়সী অনাকাংক্ষিত ও পরিত্যক্ত শিশুদের রাখা হয়। বিভিন্ন ক্লিনিক থেকে আমরা তাদের সংগ্রহ করি। তাছাড়াও বিভিন্ন রাস্তা, ডাষ্টবিন, সরকারি হাসপাতাল থেকেও সংগ্রহ করা হয়। কোথাও এধরণের শিশু আছে জানা মাত্রই আমাদের কর্মীরা গিয়ে বাচ্চাটিকে নিয়ে আসে। থানায় জিডি করে সব আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্ণ করার মাধ্যমে শিশুটিকে গ্রহণ করা হয়। তিনি আরো বলেন, ৭ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদেরকে এখানে রাখা হয়। তারপর তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আরেকটি প্রকল্প শিশু পরিবারে ও সরকারী এতিমখানাগুলোতে। দেশের মোট ৮৫টি শিশু নিবাসে এসব পরিত্যক্ত শিশুদের থাকা-খাওয়া, লেখা-পড়াসহ আতœকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। এসব শিশুদের দত্তক দেয়ার সরকারী কোনো নিয়ম নেই। এসব বাচ্চাদের মধ্যে আঠারো বছর বয়স হলে মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয় এবং ছেলেদের চাকরিসহ বিভিন্ন রকম কর্মসংস্থানমূলক কাজের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। জানা গেছে রাজধানীর আজিমপুর ছোট্টমনি নিবাসে বর্তমানে ২৫টি অনাংকাংক্ষিত পরিত্যক্ত শিশু রয়েছে। এদের কারো বয়স ২ কারো বা মাত্র ৪। আবার কেউ মাত্র দুদিন বয়সের। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে এই শিশুগুলোকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকো থেকে কুঁড়িয়ে পাওযা গেছে। যতদিন শিশুগুলো এখানে থাকে এখানের সেবিকারা তাদেরকে লালন-পলন করেন। সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এধরণের শিশুদেরকে সংগ্রহ করে বেসরকারী পূর্নবাসন কেন্দ্রগুলো। এর মধ্যে গিভেন্সি গ্রুপ অব ইনড্রাষ্টিস লিমিটেডের বয়স্ক ও শিশু পুর্ণবাসন কেন্দ্র, পুরোনো ঢাকার মিশনারিজ চ্যারিটি হোম, স্প্যানিস সংস্থা ইন্টারপেটিস চিলড্রেন হোম। শ্যামলীর শিশু পল্লী এবং বাংলাদেশ মসজিদ কমিটি এসব বাচ্চাদের সংগ্রহ করে প্রতিপালনের মাধ্যমে দত্তক দিয়ে থাকে। গিভেন্সি গ্রুপ অব ইনড্রাষ্টিস লিমিটেডের বয়স্ক ও শিশু পুর্ণবাসন কেন্দ্রের এই প্রকল্পটি ১৯৯০ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। গিভেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। গাজীপুরের মনিবাবু বাজারের কুন্ডিবাড়ির বিশিয়াতে এই নিবাসে। পুলিশের সহায়তায় তারা এ বাচ্চাগুলো সংগ্রহ করেন বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, রাস্তা ও ডাষ্টবিন থেকে। এখানে শিশুদেরকে সংগ্রহ করে এনে ২/১ দিনের মধ্যেই দত্তক দিয়ে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুকুল জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা মোট ২০০টি পরিত্যক্ত শিশুকে দত্তক দিয়েছেন। জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০জন শিশুকে দত্তক দিয়েছেন চাকরিজীবী পরিবারের কাছে। আর ৮০ থেকে ৯০ জনকে দত্তক দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ি পরিবারের কাছে। বেশ কয়েকটি শিশুকে আমেরিকা, হল্যান্ড ও কানাডায় প্রবাসী বাংলাদেশী নি:সন্তান দম্পত্তি দত্তক নিয়েছেন। সরকারে বিধি-নিষেধ অনুযায়ী কোনো বিদেশরি কাছে শিশু দত্তক দেয়া হয় না বলেও তিনি জানান। বাংলাদেশ বিমানের পাইলট এবং একজন আর্মী অফিসারও এখান থেকে শিশু দত্তক নিয়েছেন। তারা নিজেদের সন্তানের মতো করে এসব শিশুদের প্রতিপালন করছেন। এ শিশুরা এখন ভালো আছে। স্কুলে পড়াশুনা করছে। খতিব মুকুল আরো জানান, তারা রাজধানীর বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ক্লিনিক এবং সরকারী হাসপাতালকে জানিয়ে রেখেছেন পরিত্যক্ত শিশু পেলে তাদের দেয়ার জন্য। খবর পেলেই পুলিশী ও আইনী ঝামেলা শেষে এসব বাচ্চাদের তারা সংগ্রহ করেন। এছাড়াও পুলিশের সহায়তায় ঢাকার রাস্তা-ঘাটে ও ডাষ্টবিনে ফেলে যাওয়া সদ্যজাত বাচ্চাদের তারা সংগ্রহ করেন।পরিত্যক্ত, অবহেলিত এসব অসহায় শিশুকে লালন-পালন করার জন্য এই পূর্নবাসন কেন্দ্রে সুপারভাইজার, ডাক্তার, সেবিকা, বুয়া-আয়া এবং বয় রয়েছে। তিনি জানান, এসব শিশুদের দত্তক নেয়ার জন্য প্রতি মাসেই ২০ থেকে ৩০টি আবেদন জমা থাকে তার অফিসে। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও দশ বছরের বেশি দাম্পত জীবনের দম্পত্তিদের কাছেই তারা সাধারণত শিশু দত্তক দেন। দত্তক নিতে ইচ্ছুক দম্পত্তিদের সম্পর্কে বিস্তারিত খোজ খবর নিয়ে তারপর প্রতিষ্ঠানের শর্তানুযায়ী স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে শিশু দত্তক দেয়া হয়। শিশুটির ছবি তুলে রাখা হয় এবং শর্তানুযায়ী শিশুর আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত শিশুটির সকল খোজ খবর এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত জানাতে হয়। তিনি জানান, সাধারণত নি:সন্তান দম্পত্তিরাই এসব শিশুদের দত্তক নিয়ে থাকে। তাছাড়া অনেক সময় ছেলে সন্তানের অভাব পূরণ করতে অনেকে এদের দত্তক নেয়।শিশু দত্তক দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কোনো রকম অর্থ গ্রহণ করে না। মিশনারিজ চ্যারিটি হোম দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনাকাংখিত শিশুদের সংগ্রহ করে লালান-পালন করে এবং তাদের পুর্ণবাসনের ব্যবস্থা করে। তারা এসব বাচ্চাদের দত্তকও দেন। ইন্টারপেটিস চিলড্রেন হোম পরিত্যক্ত শিশুদের সংগ্রহ করে লালান-পালন করে এবং তাদের পুর্ণবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করে। তারাও এসব বাচ্চাদের দত্তক দেয়। খোজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৯ সাল থেকে তারা বাংলাদেশে কাজ করছে। তাদের কাছে বর্তমানে সর্বমোট একশটির বেশি অনাকাংক্ষিত শিশু আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও বর্তমানে পৃথিবীর আরো ৭টি দেশে তাদের এধরনের প্রকল্প রয়েছে। ০৫.১১.২০১৪