ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ১৪:২৪:৫৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
উত্তাল দিল্লি, বিশেষ ঘোষণা মোদির টানা বৃষ্টিতে তছনছ কৃষি-অর্থনীতি ৪ অঞ্চলে‘অতি ভারী’বৃষ্টির পূর্বাভাস, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা চারদিন পর বন্ধ হলো কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট টুর্নামেন্টের সেরা একাদশ ঘোষণা করেছে ফিফা

দেড় হাজার বছরের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী আয়া সুফিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫১ এএম, ২৩ জুলাই ২০২৬ বৃহস্পতিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক সুলতানাহমেত এলাকায় দাঁড়িয়ে আয়া সুফিয়ার বিশাল গম্বুজের দিকে তাকালে মনে হয়, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং দেড় হাজার বছরের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে আসেন ইতিহাস, স্থাপত্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জনে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, উসমানীয় শাসন এবং আধুনিক তুরস্ক, তিনটি ভিন্ন যুগের ইতিহাস একসঙ্গে ধারণ করে আছে এই স্থাপনাটি।
‘হাজিয়া সোফিয়া’ শব্দটির অর্থ ‘পবিত্র প্রজ্ঞা’ বা ‘দিব্য জ্ঞান’। এটি কোনো ব্যক্তির নাম নয়, বরং খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার প্রতীক। প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে এই স্থাপনাটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।
আয়া সুফিয়ার নির্মাণকাজ শুরু হয় ৫৩২ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের নির্দেশে। নিকা বিদ্রোহে আগের গির্জাটি ধ্বংস হওয়ার পর তিনি এমন একটি উপাসনালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যা সে সময়ের বিশ্বের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি পায়। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং ৫৩৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। 

স্থাপনাটির নকশা করেছিলেন বিখ্যাত স্থপতি অ্যান্থেমিয়াস অব ট্রালেস এবং ইসিডোর অব মিলেটাস।

পরবর্তী প্রায় এক হাজার বছর আয়া সুফিয়া ছিল পূর্ব অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের প্রধান ক্যাথেড্রাল এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। এখানেই সম্রাটদের অভিষেক অনুষ্ঠিত হতো এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। দীর্ঘ সময় এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা হিসেবে পরিচিত ছিল এবং স্থাপত্য প্রকৌশলের এক বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
আয়া সুফিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ এর বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ। প্রায় ৫৬ মিটার উচ্চতার এই গম্বুজ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের বিস্মিত করে আসছে। একাধিক ভূমিকম্পে গম্বুজের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে আরও উন্নত প্রকৌশল ব্যবস্থায় পুনর্নির্মাণ করা হয়। 

১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় আয়া সুফিয়া লুটপাটের শিকার হয় এবং কিছু সময়ের জন্য এটি রোমান ক্যাথলিক গির্জা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে আবার বাইজেন্টাইনদের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে।

১৪৫৩ সালে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর আয়া সুফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেন। এরপর ভবনটিতে যুক্ত করা হয় মিনার, মিহরাব, মিনবার এবং বিশাল ইসলামি ক্যালিগ্রাফি। তবে, ভবনের ভেতরে থাকা বহু খ্রিস্টান মোজাইক সংরক্ষণ করা হয়। ফলে একই স্থাপনার ভেতরে আজও পাশাপাশি দেখা যায় বাইজেন্টাইন শিল্পকলা ও উসমানীয় ইসলামি স্থাপত্যের অনন্য সমন্বয়।

১৯৩৪ সালে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের সরকারের সিদ্ধান্তে আয়া সুফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয় এবং ১৯৩৫ সাল থেকে এটি বিশ্বের সব ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরে ২০২০ সালে তুরস্কের আদালতের রায়ের পর এটি আবার মসজিদ হিসেবে চালু হয়। বর্তমানে এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশি ও বিদেশি দর্শনার্থীরাও ভবনটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক এলাকাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সেই তালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন আয়া সুফিয়া। স্থাপত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য সমন্বয়ের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে সম্ভাব্য বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় আয়া সুফিয়ার গম্বুজ ও মূল কাঠামো সংরক্ষণে ধাপে ধাপে সংস্কারকাজ চলছে। তবে, সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যেও নিয়মিত নামাজ ও পর্যটকদের প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে।

আয়া সুফিয়ার ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুবিশাল গম্বুজ, সোনালি বাইজেন্টাইন মোজাইক, বিশাল আরবি ক্যালিগ্রাফি, মার্বেল পাথরের স্তম্ভ এবং শত শত বছরের শিল্পকর্ম। ইতিহাসের এতগুলো স্তর একই স্থাপনার ভেতরে বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।

ইস্তাম্বুলে এসে আয়া সুফিয়ার সামনে দাঁড়ালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, আবার শুধু একটি প্রাচীন গির্জাও নয়। এটি এমন এক স্থাপত্য, যেখানে দেড় হাজার বছরের ইতিহাস, দুই মহাসাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার এবং দুটি মহান ধর্মীয় ঐতিহ্য একই ছাদের নিচে আজও সমানভাবে জীবন্ত। এ কারণেই আয়া সুফিয়া শুধু তুরস্কের গর্ব নয়, এটি সমগ্র বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক।