ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ৮:৪৫:৫০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

নারী মুক্তিযোদ্ধা : ত্যাগ ও বীরত্বের স্বীকৃতি মেলেনি

আপডেট: ০২:১০ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩ সোমবার

nari_o2স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম ঢাকা : মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ গণহত্যার শিকার হয়, যার কমপক্ষে ২০ শতাংশ ছিল নারী৷ অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন সরাসরি৷ তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য কিংবা নথিপত্র নেই৷ রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি মেলেনি, এমনকি সমাজেও স্বীকৃতি নেই একাত্তরে নারীর অসামান্য অবদানের৷ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার পর নারী মুক্তিযোদ্ধাসহ নির্যাতিত নারীর কিছু তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়৷ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তথ্যগুলো থাকলে নারীর 'মানমর্যাদা' ক্ষুন্ন হবে এমনটাই মনে করা হয়েছিল৷ জানা গেছে, এরপর স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীর ত্যাগ ও অবদানের তথ্য-উপাত্ত কিংবা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সনদপত্র দিতে উদ্যোগ নেয়নি সরকার৷ ২০০৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা দেওয়া হয়৷ কিন্তু আজও ওয়েবসাইটের কোথাও পাওয়া যায়নি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, নাম কিংবা ছবি৷ গণবাহিনীর ১১ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধা হিসেবে মোসাম্মত্‍ তারামন বিবি বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন৷ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর কোনো ছবি নেই, শুধু নাম আছে৷ ওয়েবসাইটে তারামন বিবির ঠিকানাসহ তাঁর মা-বাবা ও স্বামীর নাম থাকার কথা, তা-ও নেই৷ অপর বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন (অব.) সিতারা বেগম ও আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি সম্পর্কেও যথেষ্ট তথ্য দেয়নি মন্ত্রণালয়৷ জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর আগের মেয়াদে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ৭০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রে স্বাক্ষর করেন৷ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এসে ওই সনদপত্র বাতিল করে৷ বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত ওই সনদপত্রকে বৈধতা দেয়৷ প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত ওই সনদপত্রেও নাম ওঠেনি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের৷ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে চার লাখ ৭৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আবেদন করেন৷ এর মধ্যে গৃহীত হয় এক লাখ ৫৪ হাজার আবেদন৷ গৃহীত নামের তালিকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রকাশনা 'মুক্তিবার্তা'য় প্রকাশিত হয়েছে৷ মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত তালিকায় কয়েকজন নারীর নাম আছে৷ ফরিদা আখতার সম্পাদিত 'মহিলা মুক্তিযোদ্ধা' বইয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই৷ তবে মাঠপর্যায়ে গবেষণার ভিত্তিতে তিনি তুলে ধরেছেন নারী মুক্তিযোদ্ধাদের করুণগাথা৷ ফরিদা আখতার বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা সরকার করেনি৷ রাষ্ট্রীয় পদক, ভাতাও মেলেনি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের৷ সামাজিক মর্যাদাও জোটেনি তাঁদের কপালে৷ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করা, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিত্‍সাদান, ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানো, তথ্য সরবরাহ থেকে আশ্রয় দেওয়ার মতো অনেক কাজ করেছিলেন নারীরা৷ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও কর্মরত ছিলেন অনেক নারী৷ তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা৷ স্বাধীনতাযুদ্ধে তাঁদের অবদান কোনো অংশে কম নয়৷' সরকারি হিসাবে আড়াই লাখ ও গবেষকদের হিসাবে চার লাখ ৬০ হাজার নারী একাত্তরে ধর্ষিত হন৷ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, একাত্তরে ছয় থেকে আট বছরের মেয়েরাও ধর্ষিত হয়েছিল৷ অমানবিক পরিবেশে নারীদের পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে কিংবা রাজাকারদের ক্যাম্পে আটকে রাখা হতো দিনের পর দিন৷ আত্মহত্যা করারও উপায় ছিল না তাঁদের৷ জামা রাখতে পারতেন না সঙ্গে, মাথার চুলও কেটে দেওয়া হতো, কড়িকাঠে যাতে ঝুলে পড়তে না পারেন৷ নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানিত করার দাবি জানান নারী নেত্রীরা৷ তাঁদের দাবি, 'বীরাঙ্গনা' নন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা৷ মানবাধিকার নেত্রী হামিদা হোসেন বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীকে বীরাঙ্গনা না বলে মুক্তিযোদ্ধা বলা উচিত৷' মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাঁদেরও নাম ওঠানোর দাবি করেন তিনি৷ স্বাধীনতার পর নির্যাতিত নারীদের তত্‍কালীন সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীরাঙ্গনা উপাধি দেন৷ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা আমাদের মা৷' (বাংলার বাণী, ২৭ জানুয়ারি, ১৯৭২)৷ তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্থাপিত হয় নারী পুনর্বাসনকেন্দ্র৷ বিচারপতি কে এম সোবহানকে চেয়ারম্যান ও ড. নীলিমা ইব্রাহিম, বাসন্তী গুহঠাকুরতা ও মমতাজ বেগকে সদস্য করে গঠিত পুনর্বাসনকেন্দ্র নারীদের পুনর্বাসনে সাহায্য করেছিল৷ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে দেখা গেছে, তারামন বিবি ও সিতারা বেগমসহ পাঁচ-সাতজন নারীর ছবি আছে৷ তবে এখানেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তালিকা বা তথ্য নেই৷ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মহাব্যবস্থাপক মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধে নারীর অসামান্য অবদান রয়েছে৷ অনেকেই অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন৷ তাঁদের তথ্য-উপাত্ত, নাম-ঠিকানা থাকা উচিত৷ তবে এ বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের হাতে৷ আমাদের কিছুই করার নেই৷' জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, 'মন্ত্রণালয় আমাদের তালিকা দিলে আমরা তা প্রদর্শন করব৷ নির্যাতন সয়েই নয়, নারীরা প্রতিরোধ করেছিলেন, অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন৷ নতুন প্রজন্মের কাছে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা তুলে ধরা উচিত৷' মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্রে স্থান পায়নি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অশেষ অবদান৷ ইতিহাসে, দলিলে তাঁদের ভূমিকা চিত্রিত হয়েছে নির্যাতিতা হিসেবে, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী হিসেবে৷ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নারীর অবদান তাতে খুবই সামান্য৷ নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা প্রকাশিত গবেষণা মতে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ইতিহাসে শহীদ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের 'শহীদ' বলা হয়নি, নিহত উল্লেখ করা হয়েছে৷ ১৯৭৮ সালে তত্‍কালীন সরকার 'বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প' গ্রহণ করে৷ এর সম্পাদক ছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান৷ দলিল ও তথ্য প্রামাণ্যকরণের জন্য ছিল ৯ সদস্যের 'প্রামাণ্যকরণ\' কমিটি৷ তাতে একজনও নারী ছিলেন না৷ প্রকল্প ১৬ খণ্ডের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে৷ তাতে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে সামান্য তথ্য আছে৷ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত 'বাংলাপিডিয়া' ঘেঁটে দেখা গেছে, সেখানেও মুক্তিযুদ্ধে নারীর অসামান্য অবদান বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই৷ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কিছু কাজ করেছিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র৷ পরে তারা প্রকাশ করেছে গবেষণামূলক বই৷ এ বিষয়ে সুলতানা কামাল বলেন, 'নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো সরকারই খোঁজ নেয়নি৷ মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাঁরা৷ সামাজিকভাবেই তাঁদের অবদান স্বীকৃত নয়৷ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক৷' জানা যায়, ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে নারী নেত্রীরা এক যৌথ ঘোষণায় নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় খেতাব ও ভাতা দেওয়ার দাবি জানান সরকারের প্রতি৷ নারী নেত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, একাত্তরে গণহত্যার পাশাপাশি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে নারীর ওপর নির্যাতন ও ধর্ষণের বিচার করা উচিত৷ জাপান, কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা, বসনিয়া ও ভিয়েতনামে এ রকম বিচার হয়েছে৷ বিচারের পাশাপাশি নারী মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় পদক ও সম্মানী ভাতা দেওয়ার দাবি জানান নারী নেত্রীরা৷ ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩