ঢাকা, মঙ্গলবার ০৮, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:০০:৩১ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় মন্তব্য: সাংবাদিক হুদা গ্রেপ্তার শিরোপার পথে গফ, ওসাকাকে হারিয়ে শেষ আটে রিবাকিনা কাজাখস্তানকে উড়িয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ সারা বছরই ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু, এক সপ্তাহে ২৪ প্রাণহানি স্ত্রীকে শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও পাঠানোর ৩ দিন পর লাশ উদ্ধার সাক্ষরতার হার বাড়লেও দেশের পৌনে ৪ কোটি মানুষ নিরক্ষর

নিখোঁজের পরও থেমে থাকে খোঁজ, ৭ মাসে ২ হাজার শিশু নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫৭ এএম, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

নিখোঁজের পরও থেমে থাকে খোঁজ, ৭ মাসে ২ হাজার শিশু নিখোঁজ

নিখোঁজের পরও থেমে থাকে খোঁজ, ৭ মাসে ২ হাজার শিশু নিখোঁজ

দেশে শিশু নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নিখোঁজ হওয়ার পর অনেক শিশুকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু দীর্ঘদিনেও পরিবারের কাছে ফিরছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, নিখোঁজের পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতেই পরিবারকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। তদন্ত ও উদ্ধারের ক্ষেত্রেও পুলিশের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে কিংবা তারা নিজেরাই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।

নিখোঁজের এই পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে আরও অনেক শিশু, যাদের কোনো জন্মনিবন্ধন নেই, নেই স্থায়ী ঠিকানা বা পরিবারের নির্ভরযোগ্য তথ্য। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরের বস্তি ও ফুটপাতে বেড়ে ওঠা পথশিশু এবং অভিভাবকহীন শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। ফলে বাস্তবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৬ মাসেও সন্তানের সন্ধান পাননি সাবেক পুলিশ সদস্য

রাজবাড়ী থেকে গত বছরের ২০ মে নিখোঁজ হয় শিশু তামিম। ১৬ মাস ধরে সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম। পুলিশের চাকরি করা সত্ত্বেও সন্তানকে উদ্ধারে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিশু সন্তানকে হারানোর পর ১৬ মাস ধরে পথে পথে দৌড়াতে দৌড়াতে আমার মন-মানসিকতা কোনো কিছুই ঠিক নেই। পুলিশের কাছে দৌড়েছি। নিজে সাবেক সদস্য হয়েও পুলিশের কাছ থেকে তেমন সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি। প্রথম দিকে কয়েক দিন তারা ভালো ব্যবহার করেছে। কিন্তু মাসখানেক পর থানায় গেলে মনে হতো, আমি যেন কোনো অন্যায় করে এসেছি। কোনো সম্মান পাইনি।’

নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে একজন সাবেক পুলিশ সদস্যকেও যদি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

জিডি নিতেও গড়িমসি

রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকা থেকে গত ১৩ মে নিখোঁজ হয় শিশু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তার বাবা জসিম পেশায় ফুচকা বিক্রেতা। তিনি জানান, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ইব্রাহিম বাসার ভবনে ঢোকে। এরপর ভবন থেকে তাকে আর বের হতে দেখা যায়নি।

জসিমের অভিযোগ, ‘পল্লবী থানা প্রথমে জিডি নিতে চায়নি। সকালে আসেন, বিকেলে আসেন—এভাবে সময়ক্ষেপণ করে ১৫ মে জিডি নেয়। জিডি করার পরও পুলিশ শুধু ঘুরিয়েছে। ১৭ দিন এভাবে ঘোরানোর পর মামলা নেয়। পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে।’

ইব্রাহিমের মতো অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যায় নানা প্রক্রিয়া ও অপেক্ষায়। অথচ সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সাত মাসে নিখোঁজ ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু

পুলিশ সদর দপ্তরের গত বৃহস্পতিবারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনো নিখোঁজ ৬৮ জন।

অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১ হাজার ৯৭০ জন।

অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে দুই হাজারের বেশি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। এ পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নানা কারণে নিখোঁজ হচ্ছে শিশু

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কেউ পরিবারের অগোচরে খেলতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার বাস বা গণপরিবহন থেকে ভুল জায়গায় নেমে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আবার প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ, পাচার ও মুক্তিপণের জন্য শিশু অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।

কখনো কখনো মুক্তিপণ দেওয়ার পরও সন্তানকে জীবিত ফিরে পাচ্ছেন না স্বজনরা। আবার অপহরণকারী চক্রের হাতে পড়ে অনেক শিশুকে বিভিন্ন ধরনের অমানবিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নেই নিখোঁজ শিশুদের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস

নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের অন্যতম উদ্বেগ হলো—দেশে এমন কোনো একক ও পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস নেই, যেখান থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে জানা যাবে প্রতিবছর কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, কতজন অপহরণের শিকার হচ্ছে, কতজন পাচার হচ্ছে, কতজন নিজেরাই ফিরে আসছে এবং কতজনের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে।

ফলে নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত চিত্র এবং তাদের পরিণতি নিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় হিসাব তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।

অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পথশিশু ও অভিভাবকহীন শিশুদের ক্ষেত্রেও আলাদা নজর দেওয়া জরুরি। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর বস্তি ও রাস্তায় বেড়ে ওঠা অনেক শিশুরই জন্মনিবন্ধন নেই। নেই মা-বাবা কিংবা পরিবারের সদস্যদের নির্ভরযোগ্য তথ্য। এসব শিশু নিখোঁজ হলে তাদের খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই এসব শিশুর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘প্রথম কয়েক ঘণ্টাই গুরুত্বপূর্ণ’

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে উদ্ধার অভিযানের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ে নিখোঁজ শিশুর ছবি, পোশাকের বিবরণ, সর্বশেষ অবস্থানসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারলে শিশুকে দ্রুত উদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে কাজ করা আহসানিয়া মিশনের ‘অধিকার ও শাসন’ প্রকল্পের টিম লিডার শেখ মহব্বত হোসেন বলেন, কখনো কখনো পুলিশ ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে নিখোঁজ শিশুদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দিয়ে যায়। পরে দেখা যায়, কোনো কোনো শিশু দুই-তিন বছর বা তারও বেশি সময় পর পরিবারের কাছে ফিরে আসে। আবার কোনো কোনো শিশু কখনোই পরিবারের কাছে ফিরতে পারে না।

তিনি বলেন, ‘কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলের উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচার চালানো উচিত। প্রয়োজনে শিশুর ছবিসহ পোস্টারিং করতে হবে এবং গণমাধ্যমে প্রচার করতে হবে। সঠিকভাবে প্রচারণা চালাতে পারলে ৭০ শতাংশের বেশি শিশু পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে।’

সমন্বিত তদন্তের পরামর্শ সাবেক আইজিপির

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শিশু কীভাবে নিখোঁজ বা অপহৃত হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, অপহরণ ও নিখোঁজের সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে হবে। রহস্য উদঘাটনে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও শিশুদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী অধ্যাপক বলেন, অনেক শিশু অপহরণের শিকার হচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ পাচারও হচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধী চক্র অপহৃত শিশুদের দিয়ে অমানবিক কাজ করাচ্ছে। আবার কোনো কোনো চক্র মুক্তিপণের জন্য শিশু অপহরণ করছে।

তার মতে, শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

‘অসহযোগিতার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ শিশু উদ্ধারে তৎপর রয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো ভুক্তভোগী পরিবার যদি অভিযোগ করে যে কোনো থানা জিডি নিতে অনীহা দেখিয়েছে বা অসহযোগিতা করেছে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই বিভিন্ন ধারণা থেকে অভিযোগ করেন। এ কারণে অনলাইন জিডির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন জিডি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিলম্বের সুযোগ নেই।

তবে পুলিশের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবারের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। জনসমাগমপূর্ণ স্থান, বাজার, মেলা, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনের মতো জায়গায় শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রয়োজন জাতীয় সমন্বিত ব্যবস্থা

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু থানায় জিডি করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। নিখোঁজের পরপরই তথ্য আদান-প্রদান, আন্তঃথানা যোগাযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিশু শনাক্তকরণ ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য প্রচারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া শিশুদের তথ্য সংরক্ষণ এবং তারা কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিল, কোথায় ছিল, কীভাবে উদ্ধার হলো—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করাও জরুরি।

আইন বিশেষজ্ঞ ও শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর মতে, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় রেসপন্স সিস্টেম গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর পেছনে রয়েছে একটি উদ্বিগ্ন পরিবার; আর সময় যত গড়ায়, সন্তানকে নিরাপদে ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তাও তত বাড়তে থাকে।