ঢাকা, শনিবার ০২, মার্চ ২০২৪ ১৭:১৭:১৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলবো: প্রধানমন্ত্রী গাজায় অনাহারে ১০ শিশুর মৃত্যু অগ্নিকাণ্ড রোধে সর্তক থাকার আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তান্তরের অপেক্ষায় ৬ মরদেহ বেইলি রোডে আগুন পরিচয় মিলল একই পরিবারের আরও তিনজনের মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের ফওজিয়া বইমেলার পর্দা নামছে আজ

‘পঞ্চক’ আমার নির্মাণ বা আবিস্কারও বলা যায়: সিরাজুল ফরিদ 

সিরাজুল ফরিদ  | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৫৪ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৩ বৃহস্পতিবার

শিশুসাহিত্যিক সিরাজুল ফরিদ

শিশুসাহিত্যিক সিরাজুল ফরিদ

শিশুসাহিত্যিক সিরাজুল ফরিদ সম্প্রতি তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। বিগত শতাব্দির ৭০-৮০ দশক দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সমকালীন ও প্রতিবাদী ছড়া নিয়ে। জীবনের শেষ সাক্ষৎকার তিনি দিয়েছিলেন উইমেননিউজ-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান কিশোর লেখার। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন শিশুসাহিত্যিক আহমাদ স্বাধীন। সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। 

আহমাদ স্বাধীন: কেমন আছেন? 

সিরাজুল ফরিদ: করোনা ভাইরাসের আক্রমনে সারা বিশ্বসহ আমাদের দেশের মানুষের মৃত্যু-হার অনেক ছিলো। বিশেষ করে ষাটের অধিক বয়সের মানুষদের মৃত্যু-হার অনেক বেশি। আমার বয়স আশি ছুঁই ছুঁই। এই পরিস্থিতিতে মানুষিক চিন্তা ও শারীরিক দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক। তার পরও আল্লাহর রহমত, বন্ধুদের সীমাহীন দোয়ায় মোটামুটি সুস্থই আছি।

আহমাদ স্বাধীন: লেখালেখি শুরুর গল্পটা শুনতে চাই? লেখা ছাপা হবার প্রথম মাধ্যম ও অনুভূতি কী ছিলো?

সিরাজুল ফরিদ: গন্ডগ্রামে আমার জন্ম। শিশুকাল ও কিশোর বয়স কেটেছে গ্রামেই। গ্রামীণ পরিবেশে মানুষের ও নিজেদের যৌথ পরিবারের নিত্য অভাব। দুঃখ-কষ্টের আহাজারি পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা। ষষ্ট শ্রেণিতে পড়ার সময় পাঠ্য ছিল দ্রুত পঠন। গ্রন্থের  নাম 'চলে মুছাফির'। এটি পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ভ্রমণ কাহিনী। আমার খুব প্রিয় ছিল বইটি। বর্ণনা ছিলো খুবই আকর্ষণীয়। আমার মুখস্থ বিদ্যা নেহায়েত শূন্য। পরীক্ষার খাতায় নিজের ভাষায় উত্তর দিয়েছি। 
১৯৬৭ সালে এসএসসি পাস করি। উপজেলা পাকুন্দিয়া কলেজে পড়ার সময় বাংলার অধ্যাপক মুক্ত আলোচনা করতেন। তার আহবানে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা করি। সেটি কোথায় হারিয়ে ফেলেছি। লেখলেখির কিছুই তো জানতাম না। তবে আমি খুব কল্পনাপ্রবণ ছিলাম। মাঠে গান গাইতাম এক লাইন। পরের লাইন নিজে বানিয়ে গাইতাম। আমাদের বাড়িতে একজন কাজের লোক বছর মেয়াদে কাজ করতো। তার অসাধারণ মেধা। সে অনর্গল কথার পিঠে কথা বলতো। আমি অবাক হয়ে শুনতাম। তাকে অনুস্মরণ করে আমিও কল্পনা করতাম। যার কোনো মাথা মুণ্ডু নেই। 
চাকরিতে যোগদানের পর নানা দুর্যোগ আমার উপর নাজিল হয়।  টাইফয়েট জ্বরে আমার স্মৃতিভ্রম হয়ে যায়। কারো নাম মনে করে চিনতে পারতাম না। এক বছর এই অবস্থায় গিয়েছে। সামান্য সুস্থ হয়ে ১৯৬৯ সালে শেখ বোরহানউদ্দীন কলেজে রাতের সিপ্টে ভর্তি হই। ১৯৭২ সালে মতিঝিল কলোনির টিএনটি কলেজে অধ্যায়ন। রাতের সিপ্টে স্নাতক পড়ার সময় আবু নঈমের সাথে বন্ধুত্ব হয়। ওর সাথে মেলামেশার ফলে ঢাকাস্থ সাহিত্য আসর, দৈনিক পত্রিকার শিশুসাহিত্য পাতার সাথে পরিচয় ঘটে। 
মাঝের সময়কালে আধুনিক কবিতা লিখতাম। আবু নঈম দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কাজ করতো। সেখানেই প্রথম কিশোর কবিতা জমা দেই। তখন সাহিত্য পাতা ও মুকুলের মফিলের দায়িত্বে ছিলেন কবি হাবিবুর রহমান। ১৯৭৩ সালে আজাদ পত্রিকাতেই আমার প্রথম কবিতা  ছাপা হয়। কবিতা ছাপা হয়েছিল আমার শিক্ষা-সনদের নাম সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া নামে। 

আহমাদ স্বাধীন: আপনার শুরুর সময় লেখালেখির পরিবেশ নিয়ে বলুন।

সিরাজুল ফরিদ: লেখালেখি, লেখক এসব বিষয়ে কোনো রকম যোগাযোগ আমার ছিল না। মূলত দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আমার যোগাযোগ তৈরি হয়। আবু নঈম, আলমগীর বাবুল, প্রয়াত আলতাফ আলী হাসু, খালেক বিন জয়নউদ্দীন, ফারুক নওয়াজ, মাহমুদউল্লাহ, আখতার হুসেন, আবু সালেহ, সুকুমার বড়ুয়া, মোহাম্মদ মোস্তফা ও রফিকুল হক দাদুভাই-এর সাথে পরিচয় হয়। ১৯৭৪ সালে ইসলামিক ফাউনণ্ডেশনে শেখ তোফাজ্জল হোসেন তোফা কার্টুনিষ্ট অনুশীলন সাহিত্য সংঘ পরিচালনা করতেন। প্রতি শুক্রবার দশটায় শুরু হয়ে একটা দেড়টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলতো। এখানে শিশুসাহিত্যিক ছড়াকারদের সমাবেশ ঘটতো। সেখানেই পরিচয় হয় বর্তমান শিশুসাহিত্যে ও ছড়াসাহিত্যে যারা দিকপাল তাদের সাথে। অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে অনুষ্ঠান চলতো। অনুষ্ঠানে  পঠিত প্রত্যেকটি লেখার চুল ছেঁড়া আলোচনা হতো। তুখোর আলোচকরাই আলোচনা করতো। 
১৯৭৫ সালে খেলঘর সাহিত্য বাসরের ৫০তম সাহিত্য উৎসব পালিত হয়। অনুষ্ঠানের ভেনু প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ পরিষদের নিচতলায়। জাঁকজমক পূর্ণ এই অনুষ্ঠানে আমরা প্রথম তিন বন্ধু- আমি, আবু নঈম ও নুরুদ্দিন শেখ অংশগ্রহণ করি। এর পর থেকে খেলাঘর পাক্ষিক সাহিত্য বাসরে নিয়মিত যাতায়াত করতে থাকি। খেলাঘর নামে দৈনিক সংবাদের শিশুসাহিত্য পাতায় আধুনিক,  প্রগতিশীল, প্রতিবাদি ও সমাজ সচেতন ছড়া-কবিতা গল্প নিয়মিত ছাপা হয়। খেলাঘর পাক্ষিক সাহিত্য বাসর ও খেলাঘর সাহিত্য পাতার মধ্যে যোগসূত্র ছিল। সাপ্তাহিক খেলাঘর পাতার জন্য যে দিন লেখা নির্বাচন হতো সেদিন সাহিত্য বাসরে যারা আসতো তাদের অনেকেই উপস্থিত থাকতো।
১৯৭৬ সালে খেলাঘরের সম্মেলনের পরে কেন্দ্রীয় অফিস শান্তিনগর আসে। সাহিত্য বাসরের পক্ষ থেকে লেখকদের ঠিকানায় অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠনো, অনষ্ঠান পরিচালনা করা, মাঝেমধ্যে আলোচনায় অংশ গ্রহণ ইত্যাদি কাজে জড়িয়ে থাকতাম। 
সম্ভবত শান্তিনগরে খেলাঘর অফিসে অনুষ্ঠিত সাহিত্য বাসরে আইরীন নিয়জী মান্না নিয়মিত আসতো। ও লেখালেখির প্রতি খুব মনোযোগী ছিলো। মাঝখানে ১০/১৫ বছর ওর সাথে যোগাযোগ ছিলো না। ওর সম্পাদনায় ছোটদের পত্রিকা 'কিশোর লেখা' প্রকাশের সুবাদে আবারো যোগাযোগ হয়। সম্পাদক নিজেই আমাকে খুঁজে বের করেছে। এজন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। 
বিগত শতাব্দির  ৭০/৮০ দশকে সাহিত্যাঙ্গনে কোনো প্রকার কোন্দল ছিলো না। এর কারণ আছে। অন্যায়ের প্রতিবাদে লেখক, কবি, ছড়াকার-শিশুসাহিত্যিক মুখরিত ছিলো। সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কতিপয় দালাল এবং সরকারি আমলা কবি ছাড়া লেখক বন্ধুরা প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নিয়েছে। প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ মঞ্চে প্রতিবাদি ছড়া-কবিতা পড়েছে। সাহিত্য আসরেও অনরূপ প্রতিবাদি লেখাই বেশি পাঠ করা হতো। এইরকম পরিবেশেই ছিলো আমার সাহিত্য চর্চা। 

আহমাদ স্বাধীন: লাগাম টেনে ধর আপনার প্রথম ও সেরা একটি ছড়াগ্রন্থ। এই ছড়ার বই প্রকাশের পটভূমি ও প্রকাশ পরবর্তি পাঠকের অবস্থান নিয়ে বলুন।

সিরাজুল ফরিদ: লাগাম টেনে ধর ছড়া গ্রন্থ প্রকাশ করার চিন্তা মাথায় আসার পর অনেক ভাবতে হয়েছে। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ করবো। কেমন লেখা গ্রন্থের জন্য নির্বাচন করবো। এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়েছে অনেক দিন। দীর্ঘ পনের বছর সাধনার পর গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ। এই গ্রন্থের জন্য শিশুতোষ ছড়া নির্বাচন করা হয় নি। তবে ওদের পড়তে অসুবিধা নেই। কারণ ছড়ার ভাষা সহজ। অন্তর্গত বক্তব্য ব্যাপক। গ্রন্থে মুদ্রিত ছড়ায় এমন কোনো শব্দ প্রয়োগ নেই যা শিশুদের মনে বিরূপ প্রতিক্রয়া হতে পারে। 
সদ্য স্বাধীন দেশ; সমস্যার অন্ত নেই। পঁচাত্তর পরবর্তি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। মানুষের অন্তরে জমাট বাঁধা কষ্ট। রাজাকার আলবদরের উত্থান। সামরিক শাসনের যাতাকলে জনজীবন নিষ্পেষিত। মানুষের মুক্তির চরম আকাঙ্ক্ষা। সামাজিক অন্যায় প্রভৃতি অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদি ছড়াই বাছাই করি। পাণ্ডুলিপির জন্য ১৫০টি  ছোট্ট ছোট্ট বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছড়া তালিকাভুক্ত করি। বড় ছড়া নগন্য। আমার ভাবনা তালিকার ছড়া সবই আমার প্রিয়। কাজেই অভিজ্ঞ একজনকে দেখানো প্রয়োজন। তখন খেলাঘর পাতা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলো মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজীজ। খেলাঘরের আজীজ ভাই। তালিকার সংখ্যাধিক ছড়াই তার হাতে খেলাঘর পাতায় প্রকাশিত। সুতরাং তাকেই তালিকা দেখতে দিলাম। আবদুল আজীজ একান্ত মনোযোগের সাথে ছড়াগুলো পাঠ করেন। তিনি ছড়ার মান, বক্তব্য,  বিষয় ও ছড়া উপস্থাপনার কৌশল বিবেচনায় ছিয়াশিটি ছড়ায় ঠিক মার্ক দেন। সেই মোতাবেক পাণ্ডুলিপি সাজাই। কাজটি সম্পূর্ণ হলে আজীজ ভাই বললেন, পাণ্ডুলিপি কাউকে দেখাতে চান কি? আমি বললাম, কবি দিলওয়ারকে দেখাতে চাই। তার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তার শক্তিশালী ছড়া-কবিতার আমি ভক্ত। আজীজ ভাই একমত হলেন। এর কারণ, ছড়ায় শব্দ প্রয়োগ ও বাক্য গঠনে তার তুলনা বিরল। 
দুজনের মিলিত সিদ্ধান্তের পর আর দেরি করিনি। রাতের ট্রেন ধরে সিলেট যাত্রা করি। সেখানে দিলু ভাই এর বাসায় পৌঁছালাম। বাড়ি বা বাসার চারপাশে সুউচ্চ দেয়াল। গেটে কড়া নাড়তেই তিনি বেরিয়ে আসলেন। আমার নাম বলতেই  আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সিনিয়র একজন স্বনামধন্য কবির অমায়িক ব্যবহারে দারুনভাবে মুগ্ধ আমি। তিনি বেঁচে নেই। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
আমাকে যেভাবে তিনি সম্ভাসন জানালেন, দীর্ঘ জীবনে এমন আর ঘটে নাই। নাস্তা শেষে ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপি বের করে তার হাতে দিলাম। বললাম, এক নজর চোখ বুলিয়ে দিন। আজীজ ভাই ও আমার মিলিত সিদ্ধান্তের কথাও জানালাম। আরো জানালাম শহর, মাজার দেখে এসে চলে যাবো।
দু'ঘন্টা পরেই ফিরে এলাম। এসে দেখি গ্রন্থের মুখবন্ধ হিসেবে যা মুদ্রিত আছে তা লিখে রেখেছেন। তার লেখায় এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, 'যে সমাজে স্বাধীনতা প্রাপ্তির ন'বছর পরেও ব্যক্তি পূজার ঢালাও মহড়া দেখা যায়, সেখানে মানবতার মূল্য কতোটুকু থাকবে, সহজেই অনুমেয়। 
বইটি ১৯৮২ বইমেলায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশক, আবদুল আজীজ, ফুলদল প্রকাশনী, হাতিরপুল। প্রচ্ছদ করেন মাসুক হেলাল। মুদ্রণ-২২৫০ কপি। ৬৪ পৃষ্ঠা গ্রন্থের মূল্য দশ টাকা। মাত্র দু'বছরে সব কপি শেষ হয়ে গেলে দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় ১৯৮৮ সালে। এবারও ২২৫০ কপি মুদ্রিত হয়। তৃতীয় মুদ্রণ ২০০৬ সালে, আমীর প্রকাশন, বাংলাবাজার। চতুর্থ মুদ্রণ নরসুন্দা প্রিন্ট মিডয়া, পঞ্চম মুদ্রণ, ২০১২, নয়াজামানা প্রকাশন।  এ গ্রন্থ প্রথম প্রকাশনার পর, অসংখ্য আলোচনা হয়েছে। ঐ সময় এতো বিপুল সংখ্যক ছড়া নিয়ে কারো ছড়াগ্রন্থ ছিলো না। বর্তমানে এ বইটি আবার মুদ্রণ হওয়া প্রয়োজন।

আহমাদ স্বাধীন: শিশুসাহিত্যের কোন দিকটা শিশুেেদর কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মন করেন? যেমন, ছড়া, রূপকথা নাকি সময়ের সাথে যায় এমন মৌলিক ধারার গল্প?

সিরাজুল ফরিদ: শিশুরা রূপকথা ও ভূতের গল্প পছন্দ করে বটে। তবে ওগুলো মৌলিক সাহিত্য নয়। একজনের কল্পনা অন্যজনের অনুকরণ মাত্র। শিশুতোষ ছড়া-কবিতা শিশুরা পছন্দ করে। আবৃত্তিও করতে পারে। সেগুলো অর্থহীন ছড়াও হতে পারে। আমার মতামত হলো মৌলিকধারার গল্প ও শিশু বয়সে শিশুর চারপাশের পরিবেশ, আচরণ, খেলার জগৎ নিয়ে রচিত ছড়া-কবিতা ওরা বেশি পছন্দ করে।

আহমাদ স্বাধীন: ছোটদের ছড়ায় কোন দিকটায় বেশি নজর দেয়া দরকার? যেমন হাস্যরস, শিক্ষামূলক উপাদান। শৈশব কৈশোরের দুরন্তপনা, বড় হওয়ার পথে জীবন- যাপনের সম্ভাব্য সংকটের সতর্কতা অথবা অন্য কিছু?

সিরাজুল ফরিদ: ছোটদের জীবন যথাযথভাবে তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার অন্ত নেই। তাদের খেলার মাঠ নেই, শরীর গঠনের জন্য। বইয়ের বোঝা বইতে বইতে ওদের নাভিশ্বাস। অভিভাক সন্তানের এ+ পাওয়া নিয়ে পাগল প্রায়। স্কুল থেকে ফিরেই কোচিং ক্লাস। পাঠ্য বইয়ের পাঠ ওরা শেষ করতে পারে না। 
শিশুসাহিত্যের ক্লাসিক বই  হাতে নেয়ার সময় নেই ওদের। গ্রন্থ পাঠ করতে পারলে তো হাস্যরস ও শিক্ষামূলক উপাদান পাবে। ইন্টারনেট আসার পর ওরা এখন টিভির শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানও দেখে না। ওরা দেখে কার্টুন। ওদের বড় হবার পথে, সুন্দর জীবন গঠনের পথে এগুলো বড় সমস্যা। এই সংকট থেকে উত্তরণের রাস্তা কবি-সাহিত্যিকদের জ্ঞান-গর্ব আলোচনা, গল্প-উপন্যাসে, ছড়া- কবিতায় সম্ভাব্য সমাধানের দিকনির্দেশনা থাকতে পারে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে কিংবা সতর্ক করা যেতে পারে।

আহমাদ স্বাধীন: আপনার ছড়া রচনায় একটা বাঁক তৈরি হয়েছে। ছড়ার একটা নতুন আঙ্গিক, যার নাম দিয়েছেন ' পঞ্চক '। এই পঞ্চক নিয়ে বিস্তারিত বলুন।

সিরাজুল ফরিদ: ‘পঞ্চক’ নির্মাণ বা আবিস্কারও বলা যেতে পারে। ২০০৮ সালে ১০০ লিমেরিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের লিমেরিক লেখার সময় একটি সমস্যা সামনে আসে। যেমন,
কথার তো নেই আগা মাথা/ 
কথাই যেন মাথার ছাতা
কথার ঝালে লংকা মরিচ--
বাক্যটি লেখার পর দেখলাম এটি লিমেরিক ফর্মে নেই। বাক্যটি ছোট হবে। পরের বাক্যে অন্ত্যমিল থাকবে। তা আর হলো কই?
কাজেই তৃতীয় বাক্যের আন্ত্যমিল না দিয়ে মুক্ত রেখে
দিলাম। পরের দুটি বাক্য রচনা করলাম--
চামড়া পোড়ায় বালু তাতা/ কথায় থাকে কাঁটা গাঁথা
এখন এই পাঁচটি বাক্যে সয়ংসম্পূর্ণ অর্থবহ একটি ছড়া
তৈরি হয়েছে। যে বক্তব্য আনতে চেয়েছি তা শত ভাগ সম্পূর্ণ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটি লিমেরিক বা ছড়ার ফর্মে নেই। মধ্যের তৃতীয় বাক্য--'কথার ঝালে লংকা মরিচ' এই বাক্যের অন্ত্যমিল থাকলে ছড়ার ফর্মে থাকতো। সুতরাং এই লেখাটি নিয়ে গভীর ভাবনায় হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। এই অবস্থায় দ্বিতীয় পঞ্চক রচিত হয় অনুরূপ ফর্মে--সংসদে হয় উন্নয়নের গান/উন্নয়নের ছুটছে কী যে বান!/বানের জলে যায় ভেসে যায়--জোয়ার ভাটার বাংলাদেশ/ ধূর্ত মাঝির ভাগ্য বেশ। হঠাৎ মাথায় একটি প্রশ্ন এসে আমার চিন্তা-ভাবনাকে এলোমেলো করে ফেলে। অর্থাৎ এই ফর্মের নতুন নাম দিলে কেমন হয়?
যেহেতু পাঁচটি বাক্যে সয়ংসম্পূর্ণ অর্থবহ লেখা তৈরি হয়েছে এর নাম 'পঞ্চক' হতে পারে। সুতরাং বাংলা সাহিত্যে অনুরূপ ফর্ম আছে কি নেই তা নিয়ে সিনিয়র কাব্য-সাধকদের পরামর্শ চাই। 
তাদের মতামতে জানতে পারি, পঞ্চপদি আছে, যার ফর্ম ভিন্ন। অবিজ্ঞ ছড়াশিল্পী শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন-এর সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়। দ্বীপংকর চক্রবর্তীর সাথেও। তারা এই ফর্মের প্রশংসা করলেন। নামাকরণ যথাযথ হয়েছে বলেও মত প্রকাশ করেন। আমি ভরসা পেয়ে যাই। পঞ্চক-নির্মানের অতি সহজ নিয়ম- ছড়ার ফর্মে একটি বিষয়ের পরিপূর্ণ অর্থ বা বক্তব্য প্রকাশের নিমিত্তে প্রথম দু'বাক্যে অন্ত্যমিল থাকবে। 
তৃতীয় বাক্য থাকবে মুক্ত।
শেষের দুটি বাক্যে অন্ত্যমিল দিতে হবে। তবে মূল শর্ত হলো, তৃতীয় মুক্ত বাক্যটি প্রথম দু'বাক্যের বক্তব্য এবং শেষের দু'বাক্যের অন্তর্গত ও অর্থগত বক্তব্যের মাধ্যম
মিডিয়া হিসেবে সমন্বয় সাধন করবে। এক্ষেত্রে লেখক ইচ্ছে করলে মধ্যের তিনটি বাক্যের যে কোনো একটিমুক্ত রেখে এই ফর্মে ছড়া বা কবিতাও নির্মান করতে পারবে। পঞ্চকে মাত্র একটি বিষয়ে বক্তব্য প্রকাশ করবে।

আহমাদ স্বাধীন: বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ সাহিত্য ও ভাষা সাহিত্যে শিশুদের উপযোগী পর্যাপ্ত লেখা আছে কি? অথবা শিশুদের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা কতটা বলে মনে করেন?

সিরাজুল ফরিদ: এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ভাইটাল প্রশ্ন।
মহান স্বাধীনতার জন্য অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণপণ লড়াই। সেক্টরে সেক্টরে তাদের রক্তদানের বীরত্ব গাথা। বর্তমান প্রজন্মের সামনে সামান্যই আছে। সরকারি উদ্যোগে ও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রচুরগ্রন্থ রচিত হয়েছে। বর্তমানেও হচ্ছে। ভবিষ্যতেও রচিত হবে। যা হয়েছে এর ৮০/৯০ ভাগ গ্রন্থই বড়দের। আগামী প্রজন্মের জ্ঞান অর্জনের জন্য যা রচিত হয়েছে তা খুবই নগন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের সাথে যুদ্ধের বিবরণ, আরো অধিক পরিমাণে রচিত হওয়া একান্ত জরুরী। যা লেখক বন্ধুদের কর্তব্য। 

আহমাদ স্বাধীন: আপনার নিজের লেখা আপনার পছন্দের সেরা বইয়ের নাম বলুন।

সিরাজুল ফরিদ: বইমেলা ২০২১ পর্যন্ত আমার প্রকাশিত গ্রন্থ ৪৮টি। এর মধ্যে সবগুলোই আমার পছন্দের। তবে বিশেষায়িত কয়েকটি গ্রন্থের নাম এখানে বলা যেতে পারে--লাগাম টেনে ধর (ছড়); পায়রা নাচে সূর্য হাসে (ছড়া-কবিত); মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ছড়া, চাঁদ হেঁটে যায় আমার সাথে (কবিতা); বুকের ভেতর আগুন (ছড়া); পঞ্চক (প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় খণ্ড); নির্বাচিত হাজার ছড়া (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড); আমিই কিশোর (কিবিতা); শামুক পাড়ে ডিম (ছড়া); শিশু হাসে ফিক ফিক (ছড়া)
মেঘের ঠোঁটে রঙ লেগেছে (ছড়া); ছড়ায় ছড়ায় ছবি; কিশোর গল্প সমগ্র; ছড়াসমগ্র ; শিশু-কিশোর সমগ্র; নিরঙ্কুশ ছড়া; শিশুতোষ ছড়া-কবিতা; আম কাঁঠালের ছায়া (ছড়া); পিঁপড়ে যাবে নানা বাড়ি (গল্প); লিণ্ডা ও মৌটুসী (গল্প); শিশুদের পড়া আধুনিক ছড়া; ব্যাঙার বিয়ে (গল্প); ১০০ লিমেরিক ইত্যদি।

আহমাদ স্বাধীন: আপনার পাঠ করা সেরা কয়েকটি বইয়ের নাম বলেন।

সিরাজুল ফরিদ: বই পড়া আমার নেশা। স্কুল-কলেজ জীবনে যেসব গ্রন্থ পাঠ করেছি তা সবই বড়দের। তবে বড়দের ছোটদের গ্রন্থের মধ্যে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের গল্পসমুহ, উপন্যাস, কাব্যসমুহ, শিশুসাহিত্য, সোনার তরী ও শেষের কবিতা কতোবার পড়েছি তার হিসেব নেই। কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যসমূহ, তার উপন্যাস, শিশুসাহিত্য; সুকান্ত সমগ্র, চলে মুছাফির, লালশালু, সুকুমার রায়ের সমগ্র, সত্যজিৎ রায়র সাহিত্য সমুহ জীবনান্দের কবিতা সমগ্র। এ ছড়া বর্তমান স্বনামধন্য লিখিয়ে বন্ধুদের গ্রন্থ প্রয়োজনেই পড়তে হয়। লেখক জীবনকে সম্বৃদ্ধ করতে পূর্বসুরী ও বর্তমান লেখকদের প্রকাশিত বই পড়া জরুরী। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আমার জীবনে কতো বিচিত্র গ্রন্থ পাঠ করেছি তার হিসেব দেয়া যাবে না।

আহমাদ স্বাধীন: বাংলা শিশুসাহিত্যে নিবেদিত ও সমৃদ্ধ এই সময়ের ক'জন শিশুসাহিত্যিকের নাম বলুন, তারা কেন সেরা?

সিরাজুল ফরিদ: বর্তমানে দেশের শিশুসাহিত্যাঙ্গনে অনেকেই প্রতিশ্রুতিশীল। সত্তর/আশি দশক থেকে যারা এই অঙ্গনে সাধনা করেন তাদের নাম এখানে বলবো না। কারণ কারো নাম বাদ পড়লে বিরাগভাজন হতে হবে।লেখালেখিতে আমার সিনিয়র যারা বেঁচে আছেন তাদের নাম বলতে চাই। সুকুমার বড়ুয়া; আখতার হুসেন, মাহমুদউল্লাহ, মুহাম্মদ মোস্তফা, আবু সালেহ। তারা সবাই প্রতিশ্রুতশীল। বাংলা শিশুসাহিত্য এর বর্তমান অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে তারা অগ্রগণ্য। যারা প্রয়াত হয়েছেন তাদের নাম এখানে বলতে গেলে বিরাট লম্বা তালিকা হয়ে যাবে। তবে অবদান স্বীকার করতেই হবে।

আহমাদ স্বাধীন: নতুন কী লিখছেন? আগামীতে আমরা নতুন কী বই পাচ্ছি আপনার কাছ থেকে?

সিরাজুল ফরিদ: বর্তমানে গদ্য লেখায় মনোযোগ। যে গ্রন্থটি জরুরী প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন তা হলো ৩০০ পঞ্চকের ইংরেজি অনুবাদ। তা ছাড়া জীবনের খণ্ডচিত্র, রঙধুনুতে
রঙের খেলা। কিশোর কাব্য, আধুনিক কবিতা, আমার রচিত গান,  ছড়াসমগ্র দ্বিতীয় খণ্ড। আরো অনেক পাণ্ডুলিপি অপেক্ষমান।

আহমাদ স্বাধীন: তরুণ শিশুসাহিত্যকদের উদ্যেশ্যে বলুন, তারা নিজেদের উৎকর্ষে কী ভাবে এগিয়ে যাবে।

সিরাজুল ফরিদ: একনিষ্ঠ সাধনা ছাড়া কোনো লেখক প্রতিষ্ঠত হতে পারে না। প্রত্যেক মানুষের সাধানার কাজের ক্ষেত্র ভিন্নমুখী। শিশুদের অনেকেই জিজ্ঞেস করেন--তুমি বড় হয়ে কী বা কার মতো হতে চাও? এমন প্রশ্নের উত্তর কোনো কোনো শিশু খুব ঝটপট দিতে পারে। কেউ চিন্তায় পড়ে হাবুডুবু খায়। অনেক ভেবে উত্তর দিয়ে থাকে। সাধারণত একজন শিশুর সামনে যা প্রকটভাবে উদ্ভাসিত বা প্রকাশিত হয় সে হয়তো সে দিকেই আকৃষ্ট হয়। মহৎ ব্যক্তিবিশেষের জীবনী পাঠে আকৃষ্ট হলে সেই ব্যক্তির কথা বলতে পারে। চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী, প্রকৌশলী, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী হতে আকাংখা, আশা প্রকাশ করে। ওরা কবি-সাহিত্যিক হবে এমন প্রত্যাশা কেউ ব্যক্ত করে না। এর কারণ হলো কোনো পরিবারেই কবিদের বা মহৎ সাহিত্যিকদের জীবন নিয়ে আলোচনা হয় না। সুতরাং এই ঋণাত্বক সাধনায় যারা নিজেকে লিপ্ত করবে তাদের স্মৃতিতে বিষয়টি রেখেই সাধনা করতে হবে। নতুনদের মধ্যে অনেকেই পাঠ্য গ্রন্তের ছড়া গল্প-কবিতা পড়ে আকৃষ্ট হয়ে সাহিত্য সাধনায় আসে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক সাহিত্যের ভাষা, চিত্রকল্প মাথায় সহজে আসে না। নতুন প্রজন্মকে বর্তমানে প্রকাশিত বিশিষ্ট লেখকদের রচনা পাঠে মনোযোগী হতে হবে।
নতুনদের জন্য অতি সামান্য মতামত, সাহিত্য সাধনায় লজ্জার কোনো মূল্য নেই। সিনিয়রদের কাছে যেতে হবে। তাদের সাধনার ধারা থেকে, আলোচনার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করতে হবে। পড়ার কোনো বিকল্প নেই। না পড়লে শব্দ সঞ্চয় হবে না। ভিন্নভাবে নিজেকে অর্থাৎ নিজের সাধনাকে উপস্থাপন করা যাবে না। সুতরাং পড়তে হবে, পড়তে হবে, পড়তে হবেই।

আহমাদ স্বাধীন: কিশোর লেখা এবং এ পত্রিকার সম্পাদক আইরীন নিয়াজী মান্না সম্পর্কে কিছু বলুন।

সিরাজুল ফরিদ: কিশোর লেখা শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা। পত্রিকাটি ধারাবাহিকভাবে ক্রমেই উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নতির শিখড়ে উঠবে এই আশা পোষণ করি। আইরীন নিয়াজী মান্না বর্তমানে একজন কর্মনিষ্ঠ সম্পাদক। ও শিশু বয়স থেকে লেখালেখির সাধনায় লিপ্ত। খেলাঘর সাহিত্য বাসরে নিয়মিত লেখা নিয়ে আসতো। এখন ও এক পরিপূর্ণ নারী। সে একজন শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং নিতান্তই একজন ভালো মানুষ। আচার আচরণে মননশীল। নিজের কর্মসম্পাদনায় যতœবান। তার নিজের উন্নতি ও সম্পাদিত সাহিত্য কাগজ কিশোর লেখার উত্তর উত্তর আরো উন্নতি আন্তরিকভাবে কামনা করি।