ঢাকা, মঙ্গলবার ২৮, জুলাই ২০২৬ ১৫:৩৮:১৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ছয় মাসে ৮৬ শিশু হ*ত্যা, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৩৬ জন হাইকোর্টে একদিনে ৭ হাজার ৮৫৩ মামলা নিষ্পত্তির রেকর্ড হেপাটাইটিস ‘সি’ সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষ দশে বাংলাদেশ গ্যাসের ঘাটতিতে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও শিল্প সংকট রেকর্ড ভাঙতে পারে ইউরোপের দাবানল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল ১০ আগস্ট

লড়াই করে জাতীয় ফুটবলে ফারিহার উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:০৭ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

কখনো কাদামাটিতে নেমে ধান রোপণ, কখনো পচা পানিতে পাট ধোয়ার কাজ করতেন নাটোরের লালপুর উপজেলার জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা (ফারিহা মনি)। অভাব আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই কিশোরীর স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়া। কঠিন জীবন তার স্বপ্ন পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ মেয়েদের ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ফারিহা। রাজশাহী বিভাগের হয়ে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে আলোচনায় আসেন এই ক্ষুদে ফরোয়ার্ড। যদিও ফাইনালে রংপুর বিভাগের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েছে তার দল। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন ফারিহা।

ফাইনালে হারের আগে বরিশাল বিভাগকে ৫-০ এবং সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে রাজশাহী বিভাগ। এই দুই ম্যাচে দলের করা সাত গোলের মধ্যে একাই পাঁচটি গোল করেন ফারিহা। বরিশালের বিপক্ষে চারটি এবং খুলনার বিপক্ষে একটি গোল করে দলের জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।

সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনাল শেষে প্রধান অতিথি  হিসেবে বিজয়ী ও রানার্সআপ দলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা
লালপুর উপজেলার নান্দরায়পুর গ্রামের বাসিন্দা ফারিহা বর্তমানে স্থানীয় নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা মুকুল মন্ডল বাকপ্রতিবন্ধী। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত কোনো কাজ করতে পারেন না। মা আজেলা বেগম স্থানীয় এলজিইডির সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের কাজে দিনমজুর। পাঁচ সদস্যের পরিবারে অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী।

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন ফারিহা

সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিতে বাবার অনুপস্থিতিতে ভাইয়ের সঙ্গে মাঠে নেমে ধান রোপণ করতে হয় ফারিহাকে। কখনো পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়ার মতো কঠিন শ্রমও করতে হয়। তবে, দিনের পরিশ্রম শেষে ফুটবলের অনুশীলন কখনো বাদ বাদ দেননি ফারিহা।

৮ কিলোমিটার দূরে অনুশীলন
ফুটবলের প্রতি অদম্য ভালোবাসাই তাকে প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে নাটোরের নর্থবেঙ্গল চিনিকলের পাশের নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে নিয়ে গেছে। নিজের সাইকেল চালিয়ে সেখানে গিয়ে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করেন তিনি।

কোনো কারণে সাইকেল নষ্ট হলে ফারিয়াকে অনুশীলনে যাওয়ার ভাড়া দিতে পারতেন না পরিবারের সদস্যরা। এমনকি, অর্থের অভাবে ফারিহার জন্য ভালো মানের বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না পরিবারের। সেই সংকটে পাশে দাঁড়ান তার কোচ মোহাম্মদ জুয়েল রানা। সমাজের কটু কথা পেরিয়ে এগিয়ে চলা ফারিহার পথের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি।

কোচই হয়েছেন অভিভাবক
ফারিহা বলেন, “খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার কোচ মোহাম্মদ জুয়েল রানার। আমাদের পরিবারের পক্ষে সবসময় যাতায়াত খরচ বা ভালো বুট কেনা সম্ভব হতো না। স্যার নিজের সন্তানের মতো আমাকে সহযোগিতা করেছেন। অনুশীলনে যাওয়ার ভাড়া ও বুট কেনা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় খরচ পর্যন্ত তিনি দিয়েছেন। আজ আমি যেখানে এসেছি, তার বড় কৃতিত্ব স্যারের।"

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুটবলে হাতেখড়ি হয় ফারিহার। উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে খেলতে না পারলেও পরে সুস্থ হয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

জাতীয় নারী ফুটবল দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমা তার প্রিয় খেলোয়াড়। সেই ভালোবাসা থেকেই নিজের জার্সির নম্বরও রেখেছেন ১৭।

টুর্নামেন্টে নিজের গোল নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত নন এই কিশোরী। তার ভাষায়, “আমি একা কিছুই করতে পারতাম না। আমার সতীর্থরা ভালো পাস দিয়েছে বলেই আমি গোল করতে পেরেছি। এই সাফল্য পুরো দলের।”

কোচের চোখে ভবিষ্যতের তারকা
ফারিহার কোচ মোহাম্মদ জুয়েল রানা বলেন, “ফারিহা অত্যন্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী একজন ফুটবলার। অভাব-অনটন তাকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। অনেক সময় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করেছি। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে একদিন সে জাতীয় দলে নিয়মিত খেলবে এবং দেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৌরব বয়ে আনবে।”

প্রতিমন্ত্রীর শুভেচ্ছা
নাটোর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল নিজের ফেসবুক পেজে ফারিহাকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, “বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক- এটাই আমার প্রত্যাশা।”

স্বপ্ন এখন লাল-সবুজের জার্সি
গ্রামের কাঁচা পথ, ধানক্ষেত, পাটের আঁশ আর সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই পথ এখন জাতীয় ফুটবলের মঞ্চে পৌঁছেছে। অভাব কিংবা সামাজিক বাধা যাকে থামাতে পারেনি, সেই ফারিহার স্বপ্ন এখন একদিন বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পতাকা উঁচুতে তুলে ধরা।