ঢাকা, রবিবার ১৪, জুন ২০২৬ ৩:১১:১৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
৮তলা থেকে পড়ে অভিনেত্রীর মৃত্যু, স্বামী রিমান্ডে ১০ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালু হচ্ছে কাল চ্যাটজিপিটির প্রভাবে তরুণীর মৃত্যু, ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা হাম ও উপসর্গে আরও ৫ শিশুর প্রাণহানী বার কাউন্সিলের এমসিকিউতে পাস করলেন জাইমা রহমান প্যারাগুয়েকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র হার এড়িয়ে বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম পয়েন্ট

শেকড়ের সন্ধানে: কুমিল্লা আমার শেকড়, আমার গর্ব

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫৪ পিএম, ১৩ জুন ২০২৬ শনিবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড়ই হোক, তার শেকড়ের টান কখনও ফুরিয়ে যায় না। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। জীবনের নানা প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছি, কাজ করেছি, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে যখন বলি, ‘আমার নানা ও দাদার বাড়ি কুমিল্লায়’, তখন বুকের ভেতর এক ধরনের গর্বের অনুভূতি জেগে ওঠে।

কুমিল্লা আমার কাছে শুধু একটি জেলা নয়; এটি আমার পূর্বপুরুষের স্মৃতি, আমার পারিবারিক ইতিহাস, আমার আত্মপরিচয়ের অংশ। এই জেলার মাটিতে মিশে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, বাঙালির সংস্কৃতির উজ্জ্বল অধ্যায়, জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য এবং মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা।

ইতিহাসের পাতায় কুমিল্লা

বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে কুমিল্লার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসবিদদের মতে, এই অঞ্চল ছিল প্রাচীন সমতট রাজ্যের অংশ। গুপ্ত যুগ, পাল যুগ, চন্দ্র রাজবংশ কিংবা দেব রাজবংশ—প্রতিটি সময়েই এই অঞ্চলের ছিল বিশেষ গুরুত্ব।

কুমিল্লার নাম উচ্চারিত হলেই প্রথম যে স্থানের কথা মনে আসে, তা হলো ময়নামতি। লালমাই-ময়নামতির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অমূল্য ভাণ্ডার। এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার, মন্দির, স্তূপ ও প্রত্ননিদর্শন।

শালবন বিহারের ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, যেন সময় কয়েকশ বছর পেছনে চলে গেছে। ইটের পর ইট সাজিয়ে গড়ে ওঠা সেই স্থাপনা আজও অতীতের গল্প বলে। কত জ্ঞানী ভিক্ষু, কত শিক্ষার্থী, কত গবেষক এই প্রাঙ্গণে হেঁটেছেন—ভাবলেই বিস্ময় জাগে।

কোটিলা মুরা, রূপবান মুরা, চরপত্র মুরা কিংবা আনন্দ বিহারের মতো প্রত্নস্থলগুলো শুধু কুমিল্লার নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের মূল্যবান সম্পদ।

নবাব ফয়জুন্নেছা: নারী জাগরণের অগ্রদূত

কুমিল্লার ইতিহাসের আরেকটি উজ্জ্বল নাম নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী নবাবদের একজন। নারীশিক্ষা, সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

যখন মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, তখন তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নারীশিক্ষাকে উৎসাহ দিয়েছেন, সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান প্রজন্মের নারীরা যে শিক্ষার আলোয় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন, তার পেছনে ফয়জুন্নেছার মতো অগ্রগামী নারীদের অবদান অনস্বীকার্য।

সংগীতের আকাশে কুমিল্লার নক্ষত্র

কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে শচীন দেব বর্মণের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করতেই হয়। তাঁর সুরে মিশে ছিল বাংলার নদী, মাঠ, গ্রাম আর মানুষের জীবনবোধ।

ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি। তাঁর সুর করা গান আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। কুমিল্লার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী প্রমাণ করেছেন, মফস্বলের ছোট্ট একটি জেলা থেকেও বিশ্বমানের প্রতিভা উঠে আসতে পারে।

রসমালাই: কুমিল্লার মিষ্টি পরিচয়

কুমিল্লার নাম শুনলে অনেকেরই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা নরম রসমালাই। এই মিষ্টান্ন শুধু একটি খাবার নয়; এটি কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কুমিল্লায় এসে রসমালাই কিনে নিয়ে যান। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরাও দেশে এলে কুমিল্লার রসমালাইয়ের স্বাদ নিতে ভুল করেন না।

দুধ, ছানা আর কারিগরদের দক্ষতার অনন্য সমন্বয়ে তৈরি এই রসমালাই কুমিল্লাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি।

শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র

কুমিল্লা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখান থেকে বহু শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও প্রশাসক বেরিয়ে এসেছেন।

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কুমিল্লার মানুষ বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। আজও জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলছে।

মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লার ভূমিকা ছিল গৌরবময়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন।

অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তবু মাথা নত করেননি। মুক্তিযুদ্ধের সেই ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস কুমিল্লার মানুষের গর্ব।

আজও জেলার বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ, গণকবর ও স্মৃতিফলক সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে।

মানুষের হৃদয়েই কুমিল্লার আসল সৌন্দর্য

ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কুমিল্লাকে যতটা সমৃদ্ধ করেছে, তার চেয়েও বেশি সমৃদ্ধ করেছে এখানকার মানুষ।

কুমিল্লার মানুষ অতিথিপরায়ণ, আন্তরিক ও পরিশ্রমী। গ্রামের উঠানে বসে গল্প করা, উৎসব-পার্বণে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে-আপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এসব এখনও এই জেলার সামাজিক সংস্কৃতির অংশ।

এখানকার আঞ্চলিক ভাষার মধ্যেও রয়েছে আলাদা মাধুর্য। সেই ভাষা শুনলেই মনে হয়, যেন খুব পরিচিত কোনো আপনজন কথা বলছে।

আমার কুমিল্লা

আমি যখন কুমিল্লার কথা ভাবি, তখন শুধু একটি জেলার কথা ভাবি না। আমি ভাবি আমার পূর্বপুরুষদের কথা, সেইসব মানুষের কথা, যারা এই মাটিতে জীবন গড়েছেন, স্বপ্ন দেখেছেন, সন্তানদের বড় করেছেন।

ময়নামতির ধ্বংসাবশেষ, নবাব ফয়জুন্নেছার সংগ্রাম, শচীন দেব বর্মণের সুর, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা কিংবা রসমালাইয়ের মিষ্টি স্বাদ—সবকিছু মিলিয়ে কুমিল্লা এক অনন্য জনপদ।

আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতেও কুমিল্লা তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গৌরব বয়ে চলেছে মাথা উঁচু করে। সেই জেলার মেয়ে হিসেবে আমি গর্বিত।

কারণ, কুমিল্লা শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি, একটি আবেগ। আর সেই আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার শেকড়, আমার পরিবার, আমার পরিচয়।

তাই গর্ব করে বলতে চাই—আমি কুমিল্লার মেয়ে। কুমিল্লা আমার গর্ব, কুমিল্লা আমার ভালোবাসা।