ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ১:৩৭:১১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সারা দেশে অবাধে শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ নিবন্ধন নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ দফা সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ ইরানের পরিস্থিতি খারাপ হলে কঠোর হবে তুরস্ক

স্কুলে স্কুলে ভর্তি ফি নৈরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৩০ এএম, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ রবিবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তির নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ভর্তি ফি পাঁচ হাজার টাকা। আংশিক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ আট হাজার এবং ইংরেজি ভার্সনে ভর্তি ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। উন্নয়ন খাতে কোনো প্রতিষ্ঠান তিন হাজার টাকার বেশি আদায় করতে পারবে না। একই প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী ক্লাসে ভর্তির ক্ষেত্রে সেশন ফি সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা। পুনঃভর্তি ফি নেওয়া যাবে না। তবে এসব শুধু নীতিমালাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে রাজধানীতে এই টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব– এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কঠিন।

ভর্তি ফি নিয়ে স্কুলে স্কুলে বিরাজ করছে চরম নৈরাজ্য। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফি আদায়ে চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। শুধু ভর্তি ফি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত অঙ্কে আদায় করা হলেও, ভর্তি ফির সঙ্গে উন্নয়ন ফি, সেশন ফিসহ নানা অঙ্ক জুড়ে দিয়েছে। কিছু বিদ্যালয় মার্চ পর্যন্ত অগ্রিম বেতন ভর্তির সময় আদায় করছে। সব মিলিয়ে অভিভাবকদের নাভিশ্বাস উঠছে। 

রাজধানীসহ সারাদেশে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফি নিয়ে অনিয়ম চলছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবছর অভিযোগ ওঠে। তবে নৈরাজ্য ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো উদ্যোগ নেই। রাজধানীতে ভর্তি ফির নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে লিটল জুয়েলস স্কুল, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাউথপয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ। 

সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে গত ২১ নভেম্বর থেকে ভর্তির আবেদন কার্যক্রম শুরু হয়ে ৭ ডিসেম্বরে শেষ হয়। এরপর সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তির কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া ১৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। 

শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালায় বলা আছে, ‘সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি সর্বসাকল্যে মফস্বল এলাকায় ৫০০ টাকা, পৌর উপজেলা এলাকায় এক হাজার টাকা, পৌর (জেলা সদর) এলাকায় দুই হাজার টাকা, ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় তিন হাজার টাকার বেশি হবে না।’ বাস্তবে দেখা গেছে, সারাদেশের বেশির ভাগ স্কুলই এ নীতিমালা মানেনি। 

বেশির ভাগ বেসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষ। তারা অতিরিক্ত ফি আদায় করেই ভর্তি নিয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অতিরিক্ত ভর্তি ফির কারণে অভিভাবকরা নিষ্পেষিত হচ্ছেন। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। 

অভিভাবকরা জানান, প্রতি বছর অতিরিক্ত ভর্তি ফি রাখলেও সে অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। দেখা গেছে, মিলাদ মাহফিল, ইউটিলিটি, বিদ্যুৎসহ গুরুত্বহীন নানা খাত তৈরি করে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

ভর্তির নীতিমালায় এবারও ভর্তির সময় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিলের জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়ার নিয়ম করা হয়েছে।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর পুরানা পল্টনের লিটল জুয়েলস স্কুলে নার্সারিতে ভর্তিতে ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। নীতিমালা অনুসারে তা ৩০ হাজার টাকা বেশি। 

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের এক অভিভাবক জানান, তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে তাঁর সন্তানকে ভর্তি করতে ১০ হাজার টাকা ফি দিয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানে তাঁর আরেক সন্তানকে প্রথম শ্রেণিতে ইংরেজি মাধ্যমে ১১ হাজার টাকায় ভর্তি করিয়েছেন। ভর্তি নীতিমালা অনুসারে তা এক হাজার টাকা বেশি। 

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে প্রথম শ্রেণি বাংলা মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ও ইংরেজি মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা লাগছে ভর্তি হতে। এর বাইরে বই-খাতা বাবদ আরও তিন হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন। 

এক অভিভাবক জানান, ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে তাঁর সন্তানকে এক মাসের বেতনসহ আট হাজার ২০০ টাকায় ভর্তি করিয়েছেন। এই শ্রেণিতে মাসিক বেতন ২০০ টাকা। হলিক্রস স্কুলের এক অভিভাবক জানান, তাঁর সন্তানকে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করতে আট হাজার ৩০০ টাকা দিয়েছেন। এর মধ্যে ভর্তি ফি চার হাজার টাকা। বাকি টাকা দুই মাসের বেতন। তেজগাঁওয়ের বিজি প্রেস উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতি শ্রেণিতে ভর্তি হতে লাগছে তিন হাজার ৮০০ টাকা। এই বিদ্যালয়ের মাসিক বেতন ৫০০ টাকা।

মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা অফিসের ভেতরের কম্পাউন্ডে অবস্থিত মোহাম্মদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি ও বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায় করার তথ্য মিলেছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানা শিক্ষা কর্মকর্তা নাইয়ার সুলতানা বলেন, যদি প্রধান শিক্ষক টাকা নিয়ে থাকেন, তা অনৈতিক ও অনিয়ম। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। 

এদিকে রাজধানীর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে প্রতি শ্রেণিতে বাংলা ভার্সনে আট হাজার টাকা ও ইংরেজি ভার্সনে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২৮ হাজারের বেশি। অভিভাবকরা বলছেন, সর্বনিম্ন আট হাজার টাকা করে ধরলেও প্রতিষ্ঠানটি এ বছর ভর্তি থেকে সর্বনিম্ন আয় করেছে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তাদের বক্তব্য, এ প্রতিষ্ঠানটি সচ্ছল। তারা ভর্তি ফি অনেক কম রাখতে পারত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লায়লা আক্তার বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান আংশিক এমপিওভুক্ত। সরকার নির্ধারিত ভর্তি ফি নিয়ে থাকি। ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও একই ফি নিয়েছি। অভিভাবকদের দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র আয় ভর্তি ফি ও টিউশন ফি। প্রতিষ্ঠানে জনবল এবং খরচ বেশি।

দেখা গেছে, কেবল ভর্তি ফি নয়, স্কুলের বেতন বা টিউশন ফিও বেশি নেওয়া হচ্ছে। সরকারের জারি করা টিউশন ফি নীতিমালায় ঢাকায় বেসরকারি স্কুল-কলেজে মাসিক বেতন বা টিউশন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে স্কুলের জন্য ৭০০, কলেজে এক হাজার ১০০ টাকা। অথচ আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ স্কুলে বাংলা মাধ্যমে আদায় করে এক হাজার ৪৫০ টাকা এবং কলেজে বাংলা মাধ্যমে দুই হাজার ২০০ টাকা।

২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর জারি করা নীতিমালায় এমপিওভুক্ত এবং নন-এমপিও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) টিউশন ফি ছাড়াও ২৩ ধরনের নতুন ফি নির্ধারণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মোট চার ক্যাটেগরিতে এসব ফি নির্ধারণ করা হয়। ক্যাটেগরিগুলো হচ্ছে– মাধ্যমিক (এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান), মাধ্যমিক (নন-এমপিও), কলেজ (এমপিওভুক্ত) ও কলেজ (নন-এমপিও)। এ ছাড়া টিউশন ফি নির্ধারণের জন্য মহানগর ও জেলা সদরে আলাদা কমিটি করতে হবে।

নীতিমালায় অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, মুদ্রণ, টিফিন, ম্যাগাজিন, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উৎসব, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন, বিভিন্ন ক্লাব গঠন, লাইব্রেরি, কল্যাণ বা দারিদ্র্য তহবিল, আইসিটি, বাগান ও বাগান পরিচর্যা, ল্যাবরেটরি, স্কাউট, কমনরুম, পরিচয়পত্র, নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা, চিকিৎসাসেবা, বিবিধ, উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, শিক্ষা সফর ফি ইত্যাদি খাতে কত টাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আদায় করতে পারবে, এ বিষয়েও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই ফি সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা।