ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭, আগস্ট ২০২৬ ১৪:৪২:৪৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
১২৯ বার পেছালো সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল চা-বাগানের কুঁড়েঘর থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তা যাদব ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধসে নেপালের ভয়াবহ বন্যা: ইউএসজিএস নেপালে বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানিতে প্রধানমন্ত্রীর শোক ভারী বৃষ্টির কবলে সৌদির মক্কা, ‘রেড এল্যার্ট’ জারি নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভূমিধস ও বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১৬০ নেপালে আকস্মিক বন্যা: নিহত শতাধিক, নিখোঁজ কয়েক শ পর্যটক

কুসুমোতো ইনে: জাপানের প্রথম নারী ডাক্তার

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:০২ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬ বৃহস্পতিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

উনিশ শতকের জাপান। দেশটি তখনও কঠোর সামাজিক রীতিনীতি, শ্রেণিবিভাজন ও পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ। নারীর জন্য উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা, চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখার সুযোগও ছিল প্রায় অকল্পনীয়। সেই সময় এক তরুণী নিজের অদম্য আগ্রহ, অধ্যবসায় ও সাহস দিয়ে এমন একটি পথ তৈরি করেছিলেন, যে পথে পরবর্তী প্রজন্মের জাপানি নারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রবেশের সুযোগ পায়। তিনি কুসুমোতো ইনে—জাপানের চিকিৎসা ইতিহাসে এক অনন্য নাম।

২৭ আগস্ট ১৯০৩ সালে মৃত্যুবরণ করা এই নারীকে ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় জাপানের প্রথম পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত নারী চিকিৎসক হিসেবে। তাঁর জীবন শুধু একজন চিকিৎসকের জীবনী নয়; এটি জাপানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং নারীর শিক্ষার বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জন্ম এক অসাধারণ পরিবারে

কুসুমোতো ইনের জন্ম ১৮২৭ সালে নাগাসাকিতে। তাঁর বাবা ছিলেন জার্মান চিকিৎসক ফিলিপ ফ্রানৎস ফন সিবোল্ড। তিনি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে জাপানে এসেছিলেন এবং নাগাসাকিতে চিকিৎসা ও পশ্চিমা বিজ্ঞানের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ইনের মা ছিলেন কুসুমোতো তাকী, যিনি সিবোল্ডের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে সে সময়ের জাপানি সমাজের নানা জটিলতার মধ্যেও জীবন কাটিয়েছিলেন।

ইনের জন্মের সময় জাপান ছিল টোকুগাওয়া শোগুনাতের অধীনে। বিদেশিদের প্রবেশ ও বিদেশি জ্ঞান গ্রহণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। ফলে ইনের পারিবারিক পরিচয়ই তাঁর জীবনকে অন্য অনেক জাপানি নারীর চেয়ে ভিন্ন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।

তাঁর বাবা জাপান থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর ইনে মায়ের কাছে বড় হন। বাবার কাছ থেকে সরাসরি দীর্ঘদিন শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তাঁর জীবনে বাবার চিকিৎসাবিদ্যার প্রভাব গভীর ছিল।

চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখার শুরু

ইনের চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষা শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন জাপানে নারীদের চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কোনো সুসংগঠিত পথ ছিল না।

তিনি পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যা বা রানগাকু—অর্থাৎ ডাচ ভাষার মাধ্যমে জাপানে প্রবেশ করা পশ্চিমা জ্ঞান—শেখার সুযোগ পান। পরে বাবার পরিচিত চিকিৎসকদের কাছ থেকে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রসূতিবিদ্যার জ্ঞান অর্জন করেন।

বিশেষ করে প্রসূতিবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। তখন সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের চিকিৎসা করা ছিল মূলত ধাত্রী ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসকদের কাজ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান নিয়ে একজন নারী চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার ধারণাই ছিল অস্বাভাবিক।

কুসুমোতো ইনে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করার চেষ্টা করেন।

সমাজের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে

ইনের সময়ের জাপানে নারীর সামাজিক ভূমিকা ছিল কঠোরভাবে নির্ধারিত। উচ্চশিক্ষা ও পেশাজীবন ছিল প্রধানত পুরুষের ক্ষেত্র।

তার ওপর ইনে ছিলেন এমন একজন নারীর সন্তান, যার বাবা বিদেশি। ফলে সামাজিক পরিচয়ের দিক থেকেও তাঁকে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

কিন্তু তিনি থামেননি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তিনি রোগী দেখা ও চিকিৎসার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বিশেষ করে নারী ও প্রসূতিদের চিকিৎসায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল জ্ঞান আয়ত্ত করতে পারে এবং চিকিৎসক হিসেবে মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

‘ওরানদা ইনে’—একটি ভিন্ন পরিচয়

কুসুমোতো ইনে পরিচিত ছিলেন ‘ওরানদা ইনে’ নামেও। ‘ওরানদা’ বলতে জাপানিরা সে সময় ডাচদের বুঝত।

তাঁর বাবার ইউরোপীয় পরিচয়ের কারণে ইনের জীবনে জাপান ও পশ্চিমা বিশ্বের এক অদ্ভুত সংযোগ তৈরি হয়েছিল।

এই সংযোগই পরবর্তী সময়ে তাঁকে পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

তবে তাঁর পথ কখনোই সহজ ছিল না। চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষা নেওয়ার জন্য তাঁকে পুরুষপ্রধান পরিবেশে প্রবেশ করতে হয়েছে, সামাজিক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে এবং নিজের যোগ্যতা বারবার প্রমাণ করতে হয়েছে।

নারী চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান

কুসুমোতো ইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের একটি ক্ষেত্র ছিল প্রসূতিবিদ্যা।

উনিশ শতকের জাপানে সন্তান জন্মদান ছিল নারীর জীবনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সময়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক পদ্ধতি তখনও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রসবকালীন জটিলতা, সংক্রমণ ও অন্যান্য সমস্যায় বহু নারী মারা যেতেন।

ইনে পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যবহার করে নারী ও প্রসূতিদের চিকিৎসা করেন।

এখানেই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

তিনি শুধু একজন চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী ছিলেন না; তিনি এমন এক সময়ে নারীদের চিকিৎসা করেছেন, যখন নারী চিকিৎসকের উপস্থিতিই ছিল বিরল ঘটনা।

তবে ‘প্রথম নারী চিকিৎসক’ কথাটির অর্থ কী?

কুসুমোতো ইনে সম্পর্কে লেখার সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন।

তাঁকে প্রায়ই ‘জাপানের প্রথম নারী চিকিৎসক’ বলা হয়। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসের বিচারে বিষয়টি একটু সূক্ষ্ম।

তিনি ছিলেন জাপানের প্রথম পশ্চিমা চিকিৎসাবিদ্যায় প্রশিক্ষিত নারী চিকিৎসকদের অন্যতম এবং সাধারণভাবে প্রথম হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু তিনি আধুনিক অর্থে জাপানের প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নারী চিকিৎসক ছিলেন না।

পরবর্তী সময়ে ওগিনো গিঙ্কো জাপানের প্রথম নারী হিসেবে সরকারি চিকিৎসা লাইসেন্স অর্জন করেন এবং ১৮৮০-এর দশকে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

অর্থাৎ ইনের ভূমিকা ছিল পথ তৈরি করার। তাঁর পরের প্রজন্ম সেই পথে আরও এগিয়ে যায়।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার

একজন পথিকৃৎ সবসময় নিজের হাতে একটি সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করে যান না। অনেক সময় তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ হয়—পরবর্তী মানুষদের জন্য বন্ধ দরজাটি প্রথম খুলে দেওয়া।

কুসুমোতো ইনে ঠিক সেটিই করেছিলেন।

তিনি এমন এক সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রবেশ করেছিলেন, যখন জাপানি নারীদের জন্য এই পেশা প্রায় বন্ধ ছিল। তাঁর জীবন পরবর্তী নারী চিকিৎসকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

কয়েক দশক পরে ওগিনো গিঙ্কো যখন আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা লাইসেন্স অর্জন করেন, তখন জাপানে নারী চিকিৎসকদের জন্য যে পথ তৈরি হচ্ছিল, তার পেছনে ইনের মতো অগ্রদূতদের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের মূল্য ছিল অপরিসীম।

ব্যক্তিজীবনের বেদনা

ইনের জীবন শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এতে রয়েছে বিচ্ছেদ, সামাজিক চাপ ও ব্যক্তিগত বেদনার অধ্যায়ও।

তাঁর বাবা সিবোল্ড জাপান থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ইউরোপে ফিরে যান। ফলে বাবার কাছ থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় ইনে ও তাঁর মাকে।

একদিকে তিনি বাবার কাছ থেকে পাওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্তরাধিকার বহন করেছেন, অন্যদিকে বাবার অনুপস্থিতির বেদনাও তাঁর জীবনের অংশ হয়ে থেকেছে।

এই ব্যক্তিগত ইতিহাস তাঁর জীবনকে আরও মানবিক করে তোলে।

নারী ও বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর স্থান

কুসুমোতো ইনের গুরুত্ব শুধু জাপানের চিকিৎসা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীরা বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার দরজা খুলতে লড়াই করছিলেন।

ইউরোপ ও আমেরিকায় তখন এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলসহ নারীরা চিকিৎসাবিদ্যায় নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন। এশিয়াতেও একই সময়ে নারীদের সামনে ছিল শিক্ষা ও সামাজিক স্বীকৃতির কঠিন বাধা।

কুসুমোতো ইনে সেই বৈশ্বিক নারীজাগরণের এশীয় অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

২৭ আগস্ট তাঁর মৃত্যু

দীর্ঘ জীবন শেষে ২৭ আগস্ট ১৯০৩ সালে কুসুমোতো ইনে মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর মৃত্যুদিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন চিকিৎসকের স্মৃতিকে সম্মান জানানো নয়।

এটি সেইসব নারীর সংগ্রামকে স্মরণ করা, যারা এমন সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন যখন তাঁদের সামনে কোনো তৈরি পথ ছিল না।

ইনে হয়তো আধুনিক অর্থে একটি বড় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেননি, কোনো বিশাল গবেষণাগারের নেতৃত্বও দেননি। কিন্তু তিনি যে কাজটি করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক মূল্য অন্য জায়গায়—তিনি দেখিয়েছিলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান নারীর জন্য নিষিদ্ধ কোনো জগত নয়।

পথিকৃৎদের কাজ কখনো একা শেষ হয় না

কুসুমোতো ইনের জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—একজন পথিকৃৎ হয়তো নিজের জীবনে সম্পূর্ণ পরিবর্তন দেখতে পান না। কিন্তু তাঁর পদচিহ্নের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তী প্রজন্ম এগিয়ে যায়।

আজ জাপানের চিকিৎসাক্ষেত্রে অসংখ্য নারী চিকিৎসক, গবেষক ও অধ্যাপক কাজ করছেন। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারে নারীদের উপস্থিতি এখন স্বাভাবিক।

কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে বহু অস্বাভাবিক সাহসের ইতিহাস।

কুসুমোতো ইনে সেই ইতিহাসেরই একজন নারী।

১৮২৭ সালে যে জাপানি মেয়েটির সামনে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দরজা প্রায় বন্ধ ছিল, তিনিই নিজের সাহস ও অধ্যবসায় সেই দরজায় প্রথম কড়া নাড়েন। আর একদিন সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন অসংখ্য নারী।

তাই কুসুমোতো ইনের মৃত্যুদিন কেবল একটি স্মরণদিন নয়—এটি নারীশিক্ষা, নারী চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।

কুসুমোতো ইনে—একজন চিকিৎসক, একজন অগ্রদূত এবং এমন এক নারী, যিনি নিজের সময়ের সীমা অতিক্রম করে ভবিষ্যতের নারীদের জন্য পথ তৈরি করে গেছেন।