ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১২:৩৭:২৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
পাকিস্তানের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু রংপুরে চার খুন, মা-মেয়ের মরদেহে ধর্ষণের আলামত নেই ডলি পার্টন আর নেই, থামল ‘কান্ট্রি কুইনের’ গান ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব রওশন আরা ডিমের বাজারে ফের অস্বস্তি, এক ডজন ১৫০–১৫৫ টাকা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

আজও বন্ধ হয়নি বাল্যবিয়ে, চলছে হরদম

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪৭ এএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

রাতের আঁধারে বাড়ির উঠানে প্যান্ডেল টাঙানো হয়। পাশের বাড়ির মানুষও জানে না, এমনভাবে আয়োজন। মেয়েটির বয়স মাত্র ১৫। কয়েক দিন আগেও সে স্কুলে যেত, বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করত, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিত। এখন তার হাতে মেহেদি, কপালে টিপ, পরনে বিয়ের শাড়ি। বাবা-মায়ের যুক্তি—‘মেয়েকে ঘরে রেখে ঝুঁকি নিতে চাই না।’

এমন ঘটনা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো অচেনা নয়। গোপনে বিয়ে, নীরবে বিদায়—দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা আর সামাজিক চাপের কাছে হেরে যাচ্ছে কিশোরীরা।

আইন আছে, প্রশাসন আছে, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি আছে, সভা-সেমিনার আছে, প্রচারণা আছে—তারপরও কিশোরীদের অনেকের শৈশবের শেষ অধ্যায় লেখা হচ্ছে বিয়ের কাবিননামায়।

সাম্প্রতিক জাতীয় তথ্যও বলছে, সমস্যাটি এখনো ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের বহুমাত্রিক জরিপে দেখা গেছে, দেশে ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় এমন নারীর হার ৫৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু গতি এত ধীর যে সমস্যাটি এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত।

আর ২০২৫ সালের জরিপের আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য হলো—২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেছেন। একই সময়ে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বর্তমানে বিবাহিত কিশোরীর হার ২০১৯ সালের ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।

অর্থাৎ, কাগজে কিছুটা অগ্রগতি হলেও বাস্তব জীবনে বাল্যবিবাহের চাপ এখনো প্রবল।

কারা সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের শিকার?

বাল্যবিয়ের শিকার মূলত কিশোরী মেয়েরা। আর তাদের মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দরিদ্র পরিবার, গ্রামীণ এলাকা এবং কম শিক্ষিত পরিবারের মেয়েদের।

২০২৫ সালের বহুমাত্রিক জরিপের তথ্য বলছে, গ্রামীণ এলাকায় ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার ৫৯ শতাংশ, শহরে ৫০ শতাংশ। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৯ শতাংশ; সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে হার ৪১ শতাংশ।

অর্থাৎ বাল্যবিয়ে শুধু ‘সচেতনতার অভাবের’ গল্প নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, শিক্ষাবঞ্চনা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং সুযোগের বৈষম্য।

দেশের কোন অঞ্চলে বেশি?

দেশের সব অঞ্চলে বাল্যবিবাহ থাকলেও এর মাত্রা সমান নয়।

২০২৫ সালের বহুমাত্রিক জরিপের বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে—৬৭ শতাংশ। এরপর খুলনা ৬৫ শতাংশ এবং রংপুর ৬৩ শতাংশ। বরিশালে ৬১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫৬ শতাংশ, ঢাকায় ৫৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫১ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে—২৯ শতাংশ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও চোখে পড়ে। বাল্যবিবাহের সঙ্গে দরিদ্রতা, সেবার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক রীতিনীতির সম্পর্ক রয়েছে; বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র এলাকায় ঝুঁকি বেশি।

কেন গোপনে মেয়ের বিয়ে দেন বাবা-মা?

প্রশ্নটি খুব সহজ—আইন থাকা সত্ত্বেও বাবা-মা কেন মেয়ের বিয়ে গোপনে দেন?

উত্তরটি একমাত্রিক নয়।

একটি গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিভাবকদের বড় একটি অংশ মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতাকে বিয়ের কারণ হিসেবে দেখেন। কেউ ভয় পান রাস্তায় হয়রানি বা প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে, কেউ ‘পারিবারিক সম্মান’ রক্ষার কথা ভাবেন। সামাজিক রীতিনীতি ও উপযুক্ত পাত্র না পাওয়ার ভয়ও বড় কারণ। আর দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ অনেক বাবা-মা বাল্যবিবাহকে অপরাধ হিসেবে নয়, ‘মেয়েকে নিরাপদে রাখার ব্যবস্থা’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক সামাজিক মানসিকতা।

যে সমাজে একটি মেয়েকে নিরাপদ রাখতে তাকে স্কুল থেকে সরিয়ে বিয়ে দিতে হয়, সেখানে আসলে মেয়েটি নিরাপদ নয়—সমাজই নিরাপদ নয়।

‘মেয়ে ঘরে থাকলে সমস্যা’

গ্রামের অনেক পরিবারে এখনো একটি ধারণা কাজ করে—মেয়ে বড় হয়ে উঠছে, তাকে ঘরে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুলে যাতায়াতের পথে হয়রানি হতে পারে। কেউ প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারে। মেয়ে নিজের পছন্দে কাউকে বিয়ে করে ফেলতে পারে। ‘মান-সম্মান’ নষ্ট হতে পারে।

এই ভয় থেকে বাবা-মা মনে করেন, দ্রুত বিয়ে দিলে সব ঝামেলা শেষ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিয়ে কোনো কিশোরীর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। বরং বাল্যবিবাহ তার শিক্ষা বন্ধ করে, অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং তাকে সহিংসতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার মধ্যে ঠেলে দেয়।

জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেও বাল্যবিবাহের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপের সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।

বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বা ঘরবাড়ি হারানোর মতো সংকটে একটি পরিবারের আয় কমে গেলে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া অনেক পরিবারের কাছে ‘একটি দায়িত্ব কমানো’র পথ বলে মনে হয়।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও জলবায়ু-ঝুঁকির সঙ্গে বাল্যবিবাহের সম্পর্ক এবং কিশোরীদের নিজ উদ্যোগে অল্প বয়সে বিয়ের নতুন প্রবণতার কথা তুলে ধরে। সংস্থাটি শুধু সচেতনতা নয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক, সমন্বিত ও ব্যবস্থাভিত্তিক উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছে।

আইন আছে, কিন্তু ফাঁকও আছে

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ২০১৭ সালের আইন রয়েছে। জাতীয় কর্মপরিকল্পনাও আছে—২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে।

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিও রয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় কমিটির পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযানও চালানো হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে ৪ হাজার ৮টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ করা হচ্ছে।

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—হাজার হাজার বিয়ে ঠেকানোর পরও কেন সমস্যাটি কমছে না? কারণ একটি বিয়ে বন্ধ করা আর একটি পরিবারকে বাল্যবিবাহ থেকে বের করে আনা এক জিনিস নয়।

আজ প্রশাসন গিয়ে একটি বিয়ে বন্ধ করল। কিন্তু মেয়েটির স্কুলে যাওয়ার পরিবেশ নেই, পরিবারে আয় নেই, রাস্তায় নিরাপত্তা নেই, সামাজিক চাপ আছে—তাহলে কয়েক মাস পর অন্যভাবে আবার বিয়ের আয়োজন হতে পারে।

গোপন বিয়ের নতুন কৌশল

প্রশাসনকে ফাঁকি দিতে অনেক পরিবার বিয়ের আয়োজন গোপন রাখে। কখনো রাতের বেলায়, কখনো দূরের আত্মীয়ের বাড়িতে, কখনো অন্য এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছানোর আগেই অনুষ্ঠান শেষ করার চেষ্টা চলে।

এখানে জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বয়সের সঠিক প্রমাণ না থাকলে অথবা তথ্য গোপন করা হলে বাল্যবিবাহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বাল্যবিবাহে সহায়তাকারী নিবন্ধনব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিবাহ নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও ডিজিটালভাবে যাচাইযোগ্য করার পরামর্শ দিয়েছেন।

শুধু বাবা-মাকে শাস্তি দিলে কি সমাধান হবে?

এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক। অবশ্যই আইন ভাঙলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শুধু বাবা-মাকে শাস্তি দিয়ে বাল্যবিবাহ নির্মূল করা যাবে না। কারণ অনেক বাবা-মা নিজেরাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপে সিদ্ধান্ত নেন। তাদের সামনে যদি বিকল্প না থাকে, শুধু ভয় দেখিয়ে সমস্যার সমাধান দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

প্রয়োজন—মেয়েটিকে স্কুলে ধরে রাখা, দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া, কিশোরীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং পরিবারকে বোঝানো যে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া নয়, শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

শিক্ষাবিদ ও নীতিবিশ্লেষকেরা বারবার বলছেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়।

২০২৫ সালে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছিলেন, মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে পরিবার, সমাজ এবং বিশেষ করে শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা দরকার। তাঁর মতে, বাল্যবিবাহ মোকাবিলায় সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব প্রয়োজন।

ম্যানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামও সামাজিক রীতি, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়, দারিদ্র্য এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে বাল্যবিবাহের বড় চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, অনেক স্থানীয় কমিটি কার্যকরভাবে কাজ করে না।

আর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বিশ্লেষণ বলছে, শুধু প্রচার-প্রচারণা দিয়ে আর কাজ হবে না; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

মেয়েটির শরীরের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায় মেয়েটির শরীরে। কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই গর্ভধারণ শুরু হলে রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা, অকাল প্রসবসহ নানা ঝুঁকি বাড়ে। অল্প বয়সে মা হওয়া শুধু একজন কিশোরীর জীবনকেই বিপন্ন করে না, তার সন্তানের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

২০২৫ সালের জরিপে বাংলাদেশের ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে জন্মহারের সূচকও বেড়ে প্রতি হাজারে ৯২ হয়েছে, যা ২০১৯ সালের ৮৩ থেকে বেশি।

অর্থাৎ বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতিরও বড় সমস্যা।

একটি বিয়ে মানে একটি সম্ভাবনার মৃত্যু

বাল্যবিবাহের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না। একটি মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থেমে যায়। কেউ শিক্ষক হতে পারত। কেউ সাংবাদিক হতে পারত। কেউ উদ্যোক্তা হতে পারত। কেউ হয়তো বিজ্ঞানী। কেউ হয়তো শুধু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চেয়েছিল।

বিয়ের পর সেই সম্ভাবনার অনেকগুলোই হারিয়ে যায়। পরিকল্পিত জীবনের জায়গা নেয় রান্নাঘর, সন্তান, সংসার এবং নির্ভরশীলতা।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশু বয়সে বিয়ে হওয়া মেয়েদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিয়ের পর পড়াশোনা থেকে ছিটকে যায় এবং কর্মসংস্থান বা শিক্ষার বাইরে চলে যায়।

তাহলে পথ কোথায়?

পথ আছে। কিন্তু সেই পথ শুধু ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন’ লেখা পোস্টার দিয়ে তৈরি হবে না।

প্রথমত, মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দরিদ্র পরিবারকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, কিশোরীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, বিবাহ নিবন্ধনে বয়স যাচাই কঠোর করতে হবে।

পঞ্চমত, ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটিকে সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।

ষষ্ঠত, মেয়েদের নিজেদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সপ্তমত, ধর্মীয় ও স্থানীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে বাল্যবিবাহের পক্ষে অপব্যবহার করা না যায়। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিসেফসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও বহু-পক্ষীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শেষ কথা

বাল্যবিবাহ বন্ধের লড়াইয়ে বাংলাদেশ একেবারে ব্যর্থ—এ কথা সত্য নয়। পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক দশকে হার কমেছে। কিন্তু বর্তমান গতিতে এই অর্জন যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান হারে অগ্রগতি চললে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল হতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

দুইশ বছর কোনো শিশুর অপেক্ষা করার সময় নয়।

যে মেয়েটি আজ স্কুলের বেঞ্চে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে, তাকে বলা যায় না—‘আর দুইশ বছর অপেক্ষা করো।’

তার জীবন আজই। তার শৈশব আজই। তার স্বপ্নও আজই।

তাই বাল্যবিবাহ ঠেকাতে শুধু বিয়ের আসরে অভিযান চালালে হবে না; যে ভয়, দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ ও বৈষম্য একটি পরিবারকে মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য করে, সেই মূল জায়গায় আঘাত করতে হবে।

কারণ একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা মানে শুধু একটি বিয়ে বন্ধ করা নয়। একটি মেয়ের শৈশব ফিরিয়ে দেওয়া, তার শিক্ষার দরজা খোলা এবং একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখা।