ঢাকা, শুক্রবার ২১, আগস্ট ২০২৬ ২২:৫৯:৩৬ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শপথ নিলেন নতুন ৪ মন্ত্রী, ২ প্রতিমন্ত্রী হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল গ্যাস সংকট আর লোডশেডিংয়ে রাজধানীবাসীর ভোগান্তি চরমে সবজির বাজারেও অস্বস্তি, হাঁসফাঁস ক্রেতারা সিআইসির প্রথম নারী ডিজি সেলিনা সুলতানা দাবানল-দাবদাহ, ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ইউরোপ

গ্যাস সংকট আর লোডশেডিংয়ে রাজধানীবাসীর ভোগান্তি চরমে

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৫৩ পিএম, ২১ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

রাজধানীর কোনো কোনো বাসায় ভোররাতেও চুলায় আগুন জ্বলছে না। আবার কোথাও গ্যাসের আশায় রাত ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত জেগে থাকতে হচ্ছে। গ্যাস না পেয়ে যারা বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকারের ওপর ভরসা করছেন, তারাও হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। ফলে একদিকে রান্নার সময় বদলে গেছে, অন্যদিকে বেড়েছে বিদ্যুৎ ও বিকল্প জ্বালানির খরচ। এতে রাজধানীর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারে নিত্যদিনের রান্নাবান্না এখন যেন জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যুদ্ধের নাম।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, হাজারীবাগ, জিগাতলা নিউমার্কেট ও আজিমপুর এলাকার বাসিন্দারা জানায়, লাইনে দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস পাওয়া যায় না। রাত ১ থেকে ২টার পর সামান্য গ্যাস পাওয়া যায়, তাতে রান্না করা অনেক কষ্টের। 

এ দিকে কবে নাগাদ স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ হবে, তাও নির্দিষ্ট করে জানাতে পারছে না সরকার। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার জন্য এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন হওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে তিতাসের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহও চাহিদার তুলনায় অনেক কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়ির চুলায়। একইসঙ্গে গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও স্বস্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী।

রাজধানীর বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট এখন শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়, অনেক পরিবারের কাছে এটি প্রতিদিনের নতুন দুশ্চিন্তার নাম। দিনের বেলা চুলায় আগুন না থাকায় কেউ রাত গভীর হওয়ার অপেক্ষায় থাকছেন, কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন। ঘুমের সময় কমছে, বাড়ছে ক্লান্তি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের ওপর চাপ পড়ছে। সংসারের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে তাদের দিনের কাজের পাশাপাশি রাতের ঘুমও বিসর্জন দিতে হচ্ছে।

রাজধানীর হাজারীবাগে বাসিন্দা শানু আক্তার। তিনি গৃহিণী। দিনের বেলায় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নার জন্য এখন তাকে রাতের অপেক্ষা করতে হয়। এতে সংসারের স্বাভাবিক কাজের পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে তার ঘুম ও বিশ্রাম।


রোকেয়া আক্তার বলেন, ‘‘রাত জেগে রান্না করার পরও সকালে সন্তানদের স্কুল ও স্বামীর কর্মস্থলের প্রস্তুতি নিতে হয়। ফলে পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে চাইলেও বিদ্যুৎ চলে গেলে সেটিও অচল হয়ে পড়ে। রান্না তো করতেই হবে। গ্যাস না থাকলে না খেয়ে তো আর থাকা যাবে না। তাই যত রাতই হোক, গ্যাস এলে রান্না করি। এখন মনে হয়, চুলায় আগুন জ্বালানোর জন্যই সারা দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’’ 

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সালমা ও তার স্বামী দুজনই কর্মজীবী। তিনি বলেন, ‘‘গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের দৈনন্দিন রুটিনও বদলে গেছে। অফিস শেষে বাসায় ফিরে রান্না করার মতো সময় এমনিতেই কম থাকে। তার ওপর দিনের বেলায় গ্যাস না থাকায় কখনো রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কখনো বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার আনতে হচ্ছে।’’ 

তিনি বলেন, ‘‘আমরা দুজনই চাকরি করি। অফিস থেকে ফিরে রান্না করে খেয়ে বিশ্রাম নেওয়াটাই আমাদের স্বাভাবিক রুটিন ছিল। এখন গ্যাস কখন আসবে, সেই চিন্তায় থাকতে হয়। অনেক সময় রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেলে বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়। এতে একদিকে যেমন খাবারের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে সময় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কেনা সম্ভব নয়। আবার গভীর রাতে গ্যাস এলে ক্লান্ত শরীর নিয়েও রান্না করতে হয়। পরদিন সকালে আবার অফিস, এভাবে আমাদের ঘুম ও বিশ্রাম দুটোই কমে গেছে।’’ 

গ্যাসের অনিশ্চয়তায় রাজধানীর অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক চুলা ও রাইস কুকার কিনেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে গেলে এই বিকল্পও অকার্যকর হয়ে পড়ে।

কাকলি বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘‘মাসে গ্যাসের বিল দেওয়ার পরও রান্নার জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ থাকলেই যে রান্না করা যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। ফলে একই পরিবারের রান্নার খরচ ও সময় দুটিই বেড়েছে।’’  

তিনি বলেন, ‘‘এখন গ্যাসের জন্য রাত জাগতে হয়। আবার বিদ্যুৎ কখন যাবে সেই চিন্তাও করতে হয়। রান্নার মতো একটা সাধারণ কাজ করতেও এখন সময়, ধৈর্য আর বাড়তি খরচ লাগছে।’’ 


গ্যাসের সংকট সামাল দিতে রাজধানীর অনেক পরিবার এখন বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করছে। এতে রান্নার ব্যবস্থা সচল থাকলেও বাড়ছে মাসিক সংসার খরচ। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য নিয়মিত সিলিন্ডার কেনা এখন বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এতদিন অনেক পরিবার রাত বা ভোরে গ্যাসের চাপ বাড়ার সময় রান্না করে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিলেও সাম্প্রতিক সংকটে সেই ব্যবস্থাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় বৈদ্যুতিক চুলাও সব সময় নির্ভরযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠছে না। ফলে গ্যাসের বিলের পাশাপাশি সিলিন্ডার কিংবা বিদ্যুতের বাড়তি খরচ দুই দিক থেকে চাপে পড়ছেন নগরবাসী। জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব এখন শুধু রান্নাঘরে নয়, টান পড়ছে পরিবারের মাসিক বাজেটেও।

এখন গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়ির রান্না ঘরে আটকে নেই। রান্নার কাজ করা নারী, ছোট খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সিএনজি চালক ও শিল্পকারখানার কর্মীদের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে রান্নার সময় গ্যাস পাওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন, কেউ গভীর রাতে। আবার কেউ রান্নার ঝামেলা এড়াতে হোটেল বা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনছেন। এতে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও বাড়ছে।

সংকটের নেপথ্যে এলএনজি নির্ভরতা, সমাধান কি?
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা ও এলএনজি কার্গো সরবরাহে বিঘ্নকে সামনে আনা হলেও, এর পেছনে রয়েছে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতা। ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। শুরুতে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও ধাপে ধাপে তা টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতা ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে একটি টার্মিনাল সচল হওয়ার মধ্য দিয়ে সংকটের মূল ঝুঁকি কাটছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে ক্রমেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক নথিতেও বলা হয়েছে, দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত ও উৎপাদন কমছে এবং বাড়তি চাহিদা মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন একা যথেষ্ট হবে না।

ফলে মহেশখালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি, জাহাজ বা কার্গো সরবরাহে বিঘ্ন কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি জাতীয় গ্যাস সরবরাহে পড়ে। সাম্প্রতিক সংকটেও টার্মিনাল বন্ধ থাকার প্রভাবে আবাসিক রান্না থেকে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বিভিন্ন খাতে চাপ তৈরি হয়েছে।