ঢাকা, রবিবার ২৭, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪:১৪:৫২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
নেতানিয়াহুর সফরের প্রতিবাদ, অস্কারজয়ী অভিনেত্রী গ্রেফতার একটানা বৃষ্টির কারণে তলিয়ে গেছে ব্যাংকক দেশের বাজারে কমল সোনার দাম মেঘনা নদী থেকে ৩ ভাই-বোনের মরদেহ উদ্ধার জাতিসংঘ সফর শেষে দেশের পথে প্রধানমন্ত্রী বাঙালি কবি এবং নারীবাদী লেখিকা কামিনী রায়ের মৃত্যু দিবস বাংলা সাহিত্যের ১০ নক্ষত্র:যাঁদের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ বাংলাভাষা বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত: প্রধানমন্ত্রী

বাংলা সাহিত্যের ১০ নক্ষত্র: যাদের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ বাংলাভাষা

উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৫৬ এএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

বাংলা সাহিত্য হাজার বছরের ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার ধারক। চর্যাপদের সময় থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত অসংখ্য কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের সাহিত্যকর্ম শুধু বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিশ্বসাহিত্যের পরিসরেও জায়গা করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শরৎচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে জসীমউদ্দীন, মীর মশাররফ হোসেন ও বেগম রোকেয়া, প্রত্যেকেই বাংলা সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন ধারাকে শক্তিশালী করেছেন।

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বাংলা সাহিত্যের বিশ্বকবি

১৮৬১ সালের ৭ মে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতে রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকেননি। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সংগীত, প্রকৃতি ও দর্শনের প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।

কৈশোরেই তার সাহিত্যচর্চার সূচনা। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, চিত্রকলা ও দর্শনসহ সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি কাজ করেছেন। তার সাহিত্যজীবনের বিস্তার এত ব্যাপক যে বাংলা সাহিত্যের বহু শাখার বিকাশের সঙ্গে তার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।

‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘বলাকা’, ‘গীতাঞ্জলি’, ‘মানসী’, ‘ক্ষণিকা’সহ বহু কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় নতুন সৌন্দর্য ও ভাবনার জন্ম দিয়েছে। তার উপন্যাসের মধ্যে ‘চোখের বালি’, ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘যোগাযোগ’ ও ‘শেষের কবিতা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘গল্পগুচ্ছ’-এর গল্পগুলোয় তিনি বাংলার সমাজ, পরিবার, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, মানবিক সংকট ও গ্রামীণ জীবনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।

রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার রচিত গান ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামে স্বতন্ত্র সংগীতধারা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’ তার রচনা।

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি ছিলেন এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক।

সাহিত্যের পাশাপাশি শিক্ষা ও মানবকল্যাণেও তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিনিকেতনে তিনি যে শিক্ষাভাবনার বিকাশ ঘটান, তা পরবর্তী সময়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি তৈরি করে।

১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন রবীন্দ্রনাথ। তবে তার সাহিত্য ও সংগীত আজও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

২. কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি

১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন তিনি। মক্তবের শিক্ষকতা, মসজিদে ইমামতি এবং লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার মধ্য দিয়ে তার জীবনের প্রাথমিক সময় কাটে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন নজরুল। সেনাজীবন শেষে কলকাতায় এসে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কবিতা ও লেখায় ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ পেতে থাকে।

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। তার কবিতায় একদিকে যেমন বিদ্রোহ, অন্যদিকে তেমনি প্রেম, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার আহ্বান রয়েছে। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণিমনসা’ ও ‘সিন্ধু হিন্দোল’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক সাহিত্যিক। কবিতার পাশাপাশি তিনি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও গান লিখেছেন। বাংলা গানের জগতে তার অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলগীতি নামে তার গানের স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠে। ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত, প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক গানসহ বিভিন্ন ধারায় তিনি বিপুলসংখ্যক গান রচনা করেন।

তার সাহিত্যকর্মে পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রপ্রভাবের বাইরে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠায়ও নজরুলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়।

১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার কবি হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে আজও অনন্য।

৩. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: বাংলা উপন্যাসের শক্ত ভিত

১৮৩৮ সালের ২৭ জুন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁঠালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়েই তার সাহিত্যিক উত্থান ঘটে।

তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যসম্পাদক। বাংলা ভাষায় আধুনিক উপন্যাসের বিকাশে তার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা উপন্যাসে নতুন যুগের সূচনা হয়। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘মৃণালিনী’, ‘বিষবৃক্ষ’, ‘ইন্দিরা’, ‘চন্দ্রশেখর’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘রাজসিংহ’ ও ‘আনন্দমঠ’।

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকর্মে প্রেম, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক দ্বন্দ্ব, ইতিহাস ও রাজনৈতিক চেতনা নানা মাত্রায় উঠে এসেছে। তার উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণ এবং কাহিনির বিন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

‘আনন্দমঠ’ তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। এ উপন্যাসেই ‘বন্দে মাতরম’ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়, যা পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়।

সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা প্রবন্ধ ও সাহিত্যসমালোচনায় নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটে।

বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্য ছিল শক্তিশালী, যুক্তিনির্ভর ও শিল্পসম্মত। ধর্ম, সমাজ, নৈতিকতা ও দর্শন নিয়ে তার প্রবন্ধগুলোও বাংলা মননশীল সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিকদের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার হাতে বাংলা উপন্যাস কেবল গল্প বলার মাধ্যম থাকেনি, হয়ে উঠেছিল সমাজ ও মানুষের গভীর পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র।

৪. মাইকেল মধুসূদন দত্ত: আধুনিকতার অগ্রদূত

১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার দেওয়ানি আদালতের আইনজীবী এবং মা জাহ্নবী দেবী।

কৈশোরে কলকাতায় এসে হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন মধুসূদন। ইংরেজি সাহিত্য তার চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। জীবনের এক পর্যায়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে নামের সঙ্গে ‘মাইকেল’ যুক্ত করেন।

বাংলা সাহিত্যে তার প্রবেশ নাটক দিয়ে। ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ ও ‘কৃষ্ণকুমারী’ তার উল্লেখযোগ্য নাটক। ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসনের মাধ্যমে তিনি সমকালীন সমাজের নানা অসঙ্গতি ব্যঙ্গ করেছেন।

তবে তার সবচেয়ে বড় কীর্তি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত এই মহাকাব্যে তিনি রামায়ণের প্রচলিত কাহিনিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের সফল প্রয়োগ বাংলা কবিতায় বড় পরিবর্তন আনে।

‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’ ও ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ও তার গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। বাংলা সনেট রচনার ক্ষেত্রেও তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তিজীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছেন মধুসূদন। ইউরোপে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার চেষ্টা করেন। জীবনের শেষদিকে অর্থকষ্ট ও অসুস্থতায় ভুগেছেন।

১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বাংলা কবিতায় ছন্দ, বিষয় ও ভাষার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করে মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার অন্যতম প্রধান দরজা খুলে দেন।

৫. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: মানুষের জীবনের কথাশিল্পী

১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। আর্থিক অনটনের কারণে তার জীবন সহজ ছিল না। কর্মজীবনের একটি বড় সময় তিনি ভাগলপুর ও পরে বার্মায় কাটান।

তার সাহিত্যিক জীবনের মূল শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীর মমতায় তুলে ধরা। বিশেষ করে নারী, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের সামাজিক সংকট তার উপন্যাসে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

‘দেবদাস’, ‘চরিত্রহীন’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দত্তা’, ‘গৃহদাহ’, ‘পথের দাবী’, ‘পরিণীতা’ ও ‘পল্লীসমাজ’ তার বিখ্যাত উপন্যাস। ‘মহেশ’, ‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘রামের সুমতি’সহ তার ছোটগল্পও বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক জনপ্রিয়।

শরৎচন্দ্রের ভাষা ছিল সহজ ও স্বাভাবিক। জটিল অলংকারের পরিবর্তে মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি গদ্য ব্যবহার করে তিনি পাঠকের কাছে পৌঁছে যান। তার নারী চরিত্রগুলো বিশেষভাবে স্মরণীয়। সমাজের বিধিনিষেধ, নারীর প্রতি বৈষম্য এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তার বিভিন্ন রচনায় উঠে এসেছে।

‘পথের দাবী’ উপন্যাসে রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পাওয়ায় ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল। তার সাহিত্যকর্মে সমাজসংস্কার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন শরৎচন্দ্র। বাংলা সাহিত্যে সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতিকে এত সহজ অথচ আবেগঘন ভাষায় তুলে ধরার কারণে তিনি আজও সবচেয়ে বেশি পঠিত কথাশিল্পীদের একজন।

৬. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রকৃতি ও মানুষের কথাশিল্পী

১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উত্তর চব্বিশ পরগনার মুরাতিপুরে জন্মগ্রহণ করেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার শিক্ষাজীবন এগিয়ে যায়। শিক্ষকতা, গৃহশিক্ষকতা ও বিভিন্ন চাকরির পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান।

১৯২১ সালে ‘উপেক্ষিতা’ গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তার সাহিত্যিক জীবনের সূচনা হয়। এরপর বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন।

‘পথের পাঁচালী’ তার সবচেয়ে পরিচিত উপন্যাস। গ্রামীণ বাংলার দরিদ্র পরিবার, প্রকৃতি, শৈশব ও মানুষের ছোট ছোট আনন্দ-বেদনা এই উপন্যাসে অসাধারণ মমতায় ফুটে উঠেছে। পরে ‘অপরাজিত’ উপন্যাসে অপু চরিত্রের জীবনযাত্রা আরও বিস্তৃত হয়।

‘আরণ্যক’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘ইছামতী’, ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘অশনি সংকেত’, ‘দেবযান’সহ তার বহু রচনা বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের পরই তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন এবং প্রকৃতির বর্ণনার সঙ্গে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবন ও সমকালীন আর্থসামাজিক বাস্তবতা তার সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

বিভূতিভূষণের প্রকৃতিচিত্র বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। বন, নদী, মাঠ, গ্রাম ও মানুষের জীবন তার লেখায় পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।

‘চাঁদের পাহাড়’ কিশোর পাঠকদের মধ্যে আজও জনপ্রিয়। অন্যদিকে ‘আরণ্যক’ মানুষের সভ্যতা ও প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে গভীর ভাবনার জন্ম দেয়।

১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন বিভূতিভূষণ। তার ‘ইছামতী’ উপন্যাসের জন্য তিনি মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন।

৭. জীবনানন্দ দাশ: নিসর্গ ও আধুনিকতার কবি

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও সাহিত্যিক এবং মা কুসুমকুমারী দাশও কবিতা লিখতেন। সাহিত্যিক পরিবেশেই তার শৈশব কাটে।

ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লিখতেন জীবনানন্দ। ১৯১৯ সালে তার প্রথম কবিতা ‘বর্ষ-আবাহন’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’।

তার কবিতায় বাংলার প্রকৃতি, ইতিহাস, নিঃসঙ্গতা, প্রেম, মৃত্যু, সময় ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন নতুন ভাষা পেয়েছে। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘রূপসী বাংলা’ ও ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

‘বনলতা সেন’ বাংলা কবিতার অন্যতম পরিচিত নাম। তবে জীবনানন্দের কবিতা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়। তার কবিতায় আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা, যুদ্ধ, নগরজীবন, ইতিহাস ও অস্তিত্বের সংকটও গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

তিনি কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। ‘মাল্যবান’, ‘সুতীর্থ’, ‘জলপাইহাটি’সহ তার উপন্যাসগুলো মৃত্যুর পর বিশেষভাবে পাঠকের কাছে পরিচিতি পায়।

জীবদ্দশায় তার সাহিত্যকর্ম সবসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি। পরবর্তী প্রজন্মে তার কবিতা নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়। বাংলা আধুনিক কবিতার বিকাশে তার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা কবিতায় প্রকৃতি ও আধুনিক মানুষের অন্তর্জগতকে এক অনন্য ভাষায় প্রকাশ করে জীবনানন্দ দাশ স্বতন্ত্র সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেছেন।

৮. মীর মশাররফ হোসেন: মুসলিম সমাজের জাগরণের সাহিত্যিক

১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মীর মশাররফ হোসেন। উনিশ শতকের বাংলা মুসলিম সমাজের পরিবর্তন ও জাগরণের সময়ে তার সাহিত্যিক জীবন বিকশিত হয়।

তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সমাজের জীবন, ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতাকে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

‘জমিদার দর্পণ’ তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নাটক। এতে জমিদারি শোষণ ও সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ তার সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি। কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত এই গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

মীর মশাররফ হোসেনের অন্যান্য রচনার মধ্যে ‘রত্নাবতী’, ‘বসন্তকুমারী’, ‘গাজী মিয়াঁর বস্তানী’, ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ উল্লেখযোগ্য।

তার লেখায় ইতিহাস, ধর্মীয় আবেগ, সমাজবাস্তবতা ও মানবিক অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা মুসলিম সাহিত্যধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। উনিশ শতকের সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে বাংলা ভাষায় মুসলিম সমাজের চিন্তা ও অনুভূতিকে সাহিত্যের মাধ্যমে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

১৯১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন মীর মশাররফ হোসেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান শুধু নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের সাহিত্যিক প্রকাশ নয়, বরং উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

৯. বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের পথিকৃৎ

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। সে সময় মুসলিম সমাজে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। পরিবারের প্রচলিত বাধার মধ্যেও তিনি ভাই ও বোনের কাছ থেকে বাংলা ও ইংরেজি শেখেন।

বিয়ের পর তার সাহিত্যচর্চা আরও বিস্তৃত হয়। তিনি নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে লিখেছেন।

তার অন্যতম বিখ্যাত রচনা ‘সুলতানার স্বপ্ন’। ইংরেজিতে লেখা এই রচনায় তিনি এমন এক কাল্পনিক সমাজের চিত্র এঁকেছেন যেখানে নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেয়। পরে এটি বাংলা ভাষাতেও ব্যাপক পরিচিতি পায়।

‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে নারীদের আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক অবস্থানের প্রশ্ন উঠে এসেছে। ‘অবরোধবাসিনী’ গ্রন্থে তিনি পর্দাপ্রথা ও নারীর ওপর আরোপিত নানা সামাজিক বিধিনিষেধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। তার প্রবন্ধ ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’সহ বিভিন্ন লেখায় নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

রোকেয়া শুধু লেখক ছিলেন না, নারীশিক্ষা বিস্তারে বাস্তব উদ্যোগও নিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে তিনি আনজুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯১১ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল, যা পরবর্তীকালে নারীশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়।

তার সাহিত্য ছিল যুক্তিবাদী, ব্যঙ্গাত্মক ও সমাজসচেতন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষার অভাবে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না।

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন বেগম রোকেয়া। জন্ম ও মৃত্যুদিন একই হওয়ায় ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে রোকেয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়। নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তার সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আজও গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত।

১০. জসীমউদ্দীন: পল্লিজীবনের কবি

১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুরের তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জসীমউদ্দীন। গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে বাংলার পল্লিজীবন, লোকসংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তার সাহিত্যজীবনের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।

ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লিখতেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তার কবিতা সাহিত্যজগতে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘পল্লিকবি’ নামে পরিচিত হন।

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগুলোর একটি। রূপাই ও সাজুর করুণ প্রেমকাহিনির মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও সামাজিক বাস্তবতা এখানে ফুটে উঠেছে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ও তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ।

‘রাখালী’, ‘বালুচর’, ‘ধানক্ষেত’, ‘সকিনা’, ‘মাটির কান্না’সহ তার বিভিন্ন রচনায় বাংলার কৃষক, মাঝি, রাখাল, গ্রামীণ নারী ও সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র উঠে এসেছে।

জসীমউদ্দীন শুধু কবিতা লেখেননি, বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পল্লিগান, লোককথা ও গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপাদান তার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

তার কবিতার ভাষা ছিল সহজ, সুরেলা ও মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। ফলে গ্রামীণ জীবনের অনুভূতি পাঠকের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে পৌঁছে যায়।

জসীমউদ্দীনের সাহিত্যিক গুরুত্ব এখানেই যে তিনি বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষকে কেবল পটভূমি হিসেবে রাখেননি, বরং তাদের জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রেম, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন জসীমউদ্দীন। বাংলা সাহিত্যে পল্লিজীবনের যে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা তিনি নির্মাণ করেছেন, তা তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় কবিতে পরিণত করেছে।

সূত্র: ইন্টারনেট