ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৮, অক্টোবর ২০২৬ ৪:৪৯:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ `দেনমোহরের জন্য স্ত্রীকে হয়রানি করলে ক্ষতিপূরণ দিবে স্বামী` গোল ও জোড়া অ্যাসিস্টে বিদায়ী ম্যাচ স্মরণীয় করে রাখলেন মেসি বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা, গ্রেপ্তার ১ অনলাইনে প্রেমের ফাঁদ, ব্রিটেনে নতুন বাংলাদেশিদের আইনি ঝুঁকি বিশ্ববাজারে বাড়ল সোনার দাম

বেড়ে চলেছে নিত্যপণ্যের দাম: নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেই

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৪৩ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

বাজারে গেলে এখন আর মানুষ পণ্যের দাম জানতে চায় না, দাম শুনে কতটা অবাক হতে হবে—সেটাই যেন হিসাব করে। একদিন যে পণ্যের দাম ছিল এক রকম, পরদিন সেটিই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, সবজি, মাছ, মাংস—কোনো কিছুই যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্থির হয়ে থাকতে চাইছে না।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দাম বাড়ছে নিয়মিত, কিন্তু মানুষের আয় বাড়ছে অনিয়মিতভাবে কিংবা আদৌ বাড়ছে না।

ফলে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন আর শুধু বাজারের একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত। সংসারের বাজেট কাটছাঁট করতে করতে অনেক পরিবার এখন প্রয়োজন আর সামর্থ্যের মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে সমঝোতা করছে।

কোনো পরিবার হয়তো মাছের পরিমাণ কমাচ্ছে, কোনো পরিবার মাংস কেনা বাদ দিচ্ছে, কেউ ফল কেনা বন্ধ করেছে, কেউ কম দামের সবজি খুঁজছে। কেউ আবার বাজারের তালিকা হাতে নিয়ে দোকানে গিয়ে হিসাব মেলাতে না পেরে কিছু পণ্য না কিনেই ফিরে আসছে।

প্রশ্ন হলো—এভাবে আর কত দিন?

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো কোনো পণ্যের দাম বেড়েছে, ডলারের বিনিময় হার প্রভাব ফেলেছে—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কেন শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে?

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে দাম বাড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে কত সময় লাগে? আবার সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও কেন হঠাৎ কোনো পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ে? কৃষকের কাছ থেকে যে পণ্য কম দামে বের হয়, সেটি রাজধানীর বাজারে এসে কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয় কীভাবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু ‘বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বাজার কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে?

আমাদের বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বস্তিকর চিত্র দেখা যায়। উৎপাদক এক দাম বলেন, পাইকার আরেক দাম, আড়তদার আরেক দাম এবং খুচরা বিক্রেতা গিয়ে ভোক্তার সামনে আরেক দাম বলেন।

এই পুরো ব্যবস্থার কোথাও যদি অস্বাভাবিক মুনাফা, কারসাজি, মজুতদারি কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, তাহলে তার দায় কে নেবে?

সরকার বাজার তদারকির কথা বলে। অভিযানও হয়। জরিমানা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীকে শাস্তিও দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের অভিযানে কি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সমাধান সম্ভব?

অভিযান যেন অনেক সময় বাজারের স্থায়ী চিকিৎসা নয়, সাময়িক ব্যথানাশক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজ একটি বাজারে অভিযান হলো। কাল অন্য বাজারে দাম বাড়ল। আজ পেঁয়াজের দাম নিয়ে আলোচনা, কাল ডালের দাম, পরদিন তেলের দাম। এক পণ্যের দাম কমাতে গিয়ে আরেক পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

এভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা করা যায় না।

মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে কবে?

কৃষক তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না—এ অভিযোগ বহু বছরের। অথচ একই পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সময় দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

তাহলে অতিরিক্ত অর্থটি কোথায় যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে হবে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কত ধাপে পণ্য হাতবদল হচ্ছে, প্রতিটি ধাপে কত টাকা যোগ হচ্ছে, কোথায় অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে—এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা দরকার।

শুধু খুচরা দোকানদারকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার পাইকার বা আড়তদারকেও একতরফাভাবে দায়ী করে লাভ নেই। প্রয়োজন পুরো বাজারব্যবস্থার জবাবদিহি।

মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোরতা কোথায়?

বাজারে কোনো পণ্যের সংকট তৈরি হলেই যদি দাম বাড়ে, তাহলে সেটি অনেক সময় স্বাভাবিক সরবরাহ-চাহিদার ফল হতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হলে সেটি ভিন্ন বিষয়।

ব্যবসার স্বাধীনতা থাকবে, মুনাফাও থাকবে। কিন্তু মুনাফার নামে ভোক্তাকে জিম্মি করার অধিকার কারও নেই।

যদি কোনো ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দিলে হবে না। পুনরাবৃত্তি হলে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ বাজারে কারসাজি শুধু একজন ক্রেতার পকেট কাটে না; এটি লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

মানুষের আয় বাড়ছে না, ব্যয় বাড়ছে

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি এখানে।

একজন চাকরিজীবীর বেতন হয়তো বছর শেষে সামান্য বাড়ে। একজন শ্রমিকের আয় প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভর করে। একজন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আয় প্রায় স্থির। কিন্তু বাজারদর স্থির নয়।

ফলে একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে হচ্ছে।

এটাই বাস্তব অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া।

একজন মা বাজারে গিয়ে যদি আগের মতো এক কেজি মাছ কিনতে না পারেন, সন্তানের জন্য ফল কমিয়ে দিতে হয়, ভালো মানের চালের বদলে কম দামের চাল কিনতে হয়—তাহলে বিষয়টি কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে মানুষের পুষ্টি, স্বাস্থ্য, জীবনমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশ জড়িয়ে আছে।

একটি পরিবার যখন খাদ্যতালিকা সংকুচিত করতে বাধ্য হয়, তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের অনেক হিসাবই অর্থহীন হয়ে যায়।

শুধু অভিযান নয়, স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার

বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে ছবি তোলা এবং জরিমানার খবর প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রথমত, নিত্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে হবে। কোথা থেকে কত পণ্য আসছে, কত দামে আসছে এবং কোন পর্যায়ে কত দামে বিক্রি হচ্ছে—এর একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, কৃষক ও উৎপাদকের সঙ্গে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষক যদি ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারেন, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীদের অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ কমবে।

চতুর্থত, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কোনো পণ্যের আমদানি বা সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেলে সেখানে প্রতিযোগিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পঞ্চমত, বাজার তদারকি সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবের বাইরে রেখে কার্যকর করতে হবে। যে ব্যবসায়ী যত বড়ই হোন, আইন ভাঙলে তাঁকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

মানুষের পকেটেরও তো সীমা আছে

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনযাত্রাকে সহনীয় রাখা। উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজারে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খান, তাহলে উন্নয়নের সুফল নিয়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন উঠবেই।

সরকারকে তাই শুধু মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে।

কারণ পরিসংখ্যান বলে মূল্যস্ফীতি কত শতাংশ। কিন্তু বাজারের ব্যাগ বলে দেয় একটি পরিবারের কষ্ট কতটা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণ মানুষের এক ধরনের অসহায়ত্ব তৈরি হচ্ছে। মানুষ প্রতিবাদ করে, বাজারদর নিয়ে কথা বলে, গণমাধ্যমে খবর হয়—তারপরও কিছুদিন পর আবার একই চিত্র ফিরে আসে।

এই চক্র ভাঙতেই হবে।

সরকারের দায়িত্ব শুধু দাম বাড়ার পর বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা নয়। দাম কেন বাড়ছে, কোথায় বাড়ছে, কারা বাড়াচ্ছে এবং কেন তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ব্যবস্থা নেওয়া।

নিত্যপণ্যের বাজার কোনো খেলাঘর নয়। এখানে মানুষের খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার হিসাব জড়িয়ে আছে।

একজন মানুষের আয় যদি ১০ টাকা বাড়ে, কিন্তু তাঁর দৈনন্দিন খরচ ২০ টাকা বাড়ে, তাহলে কাগজে তাঁর আয় বেড়েছে—বাস্তবে তিনি দরিদ্র হয়েছেন।

তাই বাজারের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিকে আর ‘স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

সরকারকে বাজারের পেছনে নয়, বাজারের সামনে দাঁড়াতে হবে।

কোথাও মজুতদারি হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোথাও কারসাজি হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরবরাহে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীর অস্বাভাবিক দৌরাত্ম্য থাকলে সরবরাহব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—ভোক্তাকে বাজারের সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ হিসেবে রেখে দিলে চলবে না।

কারণ যে বাজারে ব্যবসায়ীর মুনাফার হিসাব আছে, সেখানে ভোক্তার বেঁচে থাকার হিসাবও থাকতে হবে।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়তেই থাকবে, আর মানুষ কেবল কম খেয়ে, কম কিনে, কম বেঁচে সেই দাম মেনে নেবে—এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ এখন আর সরকারের ‘সদিচ্ছার’ বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।