ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ৫:৫৫:৪৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

মুক্তিযুদ্ধ ও নারী প্রসঙ্গ

আপডেট: ০৮:২৩ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩ বুধবার

Nari_009জান্নাতুল ফেরদৌস পান্না ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির জনকের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় এ দেশের নারীরাও৷ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দিনগুলো ছিলো রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের৷ আর মুক্তিযুদ্ধে নারীদের, নারী যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ এবং অবদান অনস্বীকার্য৷ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধিনতার ৪০ বছরেও মুক্তির এই সংগ্রামে আমরা আমাদের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভালভাবে শনাক্ত করতে পারিনি৷ দেশে সম্মুখ সমর এবং নারী যোদ্ধাদের সংখ্যা কম নয়৷ পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি ও তাঁদের সম্পর্কে বেশ জানতে পারছি৷ কিন্তু যে নারীরা ৭১এ মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতা দিয়েছে, সম্বম হারিয়েছে, তাদেরকে কেন আমরা শনাক্ত করছি না তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে৷ মুক্তিযুদ্ধে নারী বলতে আমার মানসপটে ভেসে উঠতো বীরাঙ্গনা আর নির্যাতিতা নারীদের কথা, যাদের কয়েকজনকে আমি আমার এলাকায় দেখেছি৷ কিন্তু আজ খুব কষ্ট লাগে এই বিষয়টা আমার জ্ঞানের বাইরে ছিলো৷ প্রবাসী সরকার তাদের সেই অদম্য প্রাণশক্তিকে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত করার মানসে ভারত সরকারের সহায়তায় কলকাতার পার্ক সার্কাস ও পদ্মপুকুরের মাঝামাঝি গোবরা নামক স্থানে শুধু মহিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করে৷ সেটি 'গোবরা ক্যাম্প' নামেই প্রচলিত ছিল৷ ঐ ক্যাম্পটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী৷ জানা যায়, নারী যোদ্ধাদের জন্য অনুরূপ আরো তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে৷ গোবরা ক্যাম্পে মেয়েদের দেয়া হতো তিন রকম ট্রেনিং৷ ১. সিভিল ডিফেন্স ২. নার্সিং ৩. অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ৷ সিভিল ডিফেন্সের প্রশিক্ষক ছিলেন শিপ্রা সরকার ও সেবা চৌধুরী৷ নার্সিং শেখাতেন ডা. মীরালাল ও ডা. দেবী ঘোষ৷ অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ কৌশল শেখাতেন ক্যাপ্টেন এসএম তারেক ও মেজর জয়দীপ সিংহ৷ বেগম মুশতারী শফীর 'নারী, বলো আমরাও মানুষ' বইটির উপরোক্ত অনুচ্ছেদে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি নারীর প্রস্তুতির বর্ণনা সম্যকরূপে ধরা দেয়৷ এই বর্ণনার মধ্যদিয়ে আমরা জানতে পারি, পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সম্মুখ সমরে লড়াই করেছেন, জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন৷ কিন্তু 'ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্বমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা' কথাটির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে খাটো করা হয়, যা কাম্য নয়৷ এমন অনেক নারী আছেন যারা ছদ্মবেশে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, আছেন এমন অনেকে যারা ছেলেদের সাথে ছেলেদের পোশাক পরে যুদ্ধ করেছেন, বাড়ি থেকে কাউকে না বলে চুপিসারে একটি চিরকুট রেখে রণাঙ্গনে গিয়েছেন, যুদ্ধে শত্রুর গুলিতে কিংবা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের আক্রমণে শহীদ হয়েছেন৷ আবার অনেকেই পরিবারের আপনজনকে কিংবা সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য লড়েছেন সমরে, পাকিস্থানি গোলার সামনে রেখেছেন স্বল্পপ্রাণ কিন্তু দেশপ্রেমীক প্রাণ৷ এরকম একটি ঘটনার উদাহরণ যশোরের হালিমা পারভীন৷ ১৯৭১ সালে হালিমা অষ্টম শ্রেণীতে পড়তেন৷ স্বপ্ন ছিল শিক্ষিত হয়ে বড়ো মানুষ হবেন৷ পাকিস্থানি বাহিনী তাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং তার পিতাকে নির্মম প্রহার করে৷ এ দেখে হালিমার মনে প্রতিশোধস্পৃহা জন্মায়৷ তিনি তার পরিবারের অন্যদের সঙ্গে অস্ত্র তুলে নেন৷ তারা ৩৫ জন তরুণ-তরুণীর একটি বাহিনী গড়ে তোলেন এবং ট্রেনিং নেন৷ হালিমা একাধিক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন এবং আর্মি ও রাজাকার হত্যা করেন৷ একটা পর্যায়ে স্থানীয় দালালরা খবর দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে৷ তারা ঘেরাও হয়ে যান৷ কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ধরা দেন, নইলে অনেক গ্রামবাসীও মারা পড়ত৷ তাঁদের যশোর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়৷ তাঁর সামনেই সব পুরুষ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়৷ হালিমার সঙ্গে ধরা পড়েছিলেন ফাতেমা ও রোকেয়া নামের আরো দু'জন নারী যোদ্ধা৷ হালিমার ভাষায়, 'যশোর ক্যান্টনমেন্টে আমরা আরো হাজার হাজার নারীকে বন্দি থাকতে দেখি তাদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছিল তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না৷ নিজ হাতে তাদের কবর খুঁড়তে হতো৷ বাড়ি ফেরার পর আমি বুঝলাম আমার যুদ্ধ শেষ হয়নি৷ যদিও যশোর স্বাধীন হয়েছে কিন্তু আমি স্বাধীন হইনি৷ আমার যুদ্ধ যেন নতুন করে শুরু হলো৷ কিন্তু এবারের যুদ্ধ আমার নিজ মানুষদের সঙ্গে, আমার নিজের দেশের সঙ্গে যাদের জন্য আমি যুদ্ধ করেছি, যাদের জন্য আমি সব হারিয়েছি৷ আমার যুদ্ধ এখনো চলছে৷' তার এই যুদ্ধ চলার কারণ হলো, তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যুদ্ধের মধ্যে বন্দি হন৷ কিন্তু তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ওঠেনি, উঠেছে বীরাঙ্গনার খাতায়৷ এই ঘটনা শুধু একজন হালিমার গল্পই না, বহু হালিমাকে এই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশের কথাই আমরা জানি না৷ কারণ মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান বলতে সাধারণত পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সহযোগিতা আর সম্বমহানীকেই ধরে নেয়া হয়৷ কিন্তু গত দশক থেকে ধীরে ধীরে আমাদের সামনে আসছে নারীদের অবদানের কথা, যেগুলো আগে আমাদের জানা ছিলো না৷ আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় সমরে অংশগ্রহণকারী নারীর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন এমন নারীর সংখ্যা অনেক বেশি৷ কিন্তু যে সকল নারী নিজেদের জীবন বাজি রেখে যোদ্ধাদেরকে পাকবাহিনীর নানা তথ্য সরবরাহ করেছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, অসুস্থ যোদ্ধাদের সেবা করেছেন, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করার জন্য পাকসেনার কাছে নিজের সন্তানকে ধরিয়ে দিয়েছেন তারাও তো মুক্তিযোদ্ধা৷ তাদের অবদানও সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের থেকে কোনো অংশে কম নয়৷ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে রক্ষা করার জন্য নিজের সম্মানকে, সম্বমকে বলি দিতে হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে৷ তাদেরকে বীরাঙ্গনা বললেও তারা তো বীর৷ দেশমাতৃকার জন্য নিজের সম্বম বির্সজন দেয়াও যুদ্ধের সামিল৷ দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছরের মাথায় এসেও আমরা আমাদের মুক্তির সংগ্রামে নারীদের অবদানকে সেভাবে সনাক্ত করতে পারিনি৷ সরকারি পর্যায়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং তাদের সংখ্যা সনাক্ত করার তেমন কোনো প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়নি৷ আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেটুকু কাজ হয়েছে তা নগণ্য৷ অত্যন্ত দুঃখজনত হলেও সত্যি সরকারি উদ্যোগে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধের ১৬ খন্ডের গ্রন্থেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো তথ্য নেই৷ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে কয়েক বছর হল৷ সেখানেও নারী মুক্তিযোদ্ধা কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই৷ পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা কয়েকবার করে হাল নাগাদ করা হলেও সেখানে নারী যোদ্ধাদের নিয়ে কোনো কাজই করা হয়নি৷ এটা আমাদের ব্যর্থতা৷ জাতি হিসেবে আমাদের এই ব্যর্থতার দায় আমাদেরকেই গ্রহণ করতে হবে৷ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং তাদের স্বীকৃতির জন্য সরকারের উচিত আশু কর্মসূচি গ্রহণ করা৷ তা না হলে বিষয়টি সরকারের জন্য যেমনি লজ্জার তেমনি লজ্জার জাতি হিসেবে আমাদেরও৷ লেখক : সাংবাদিক ১৮ ডিসেম্বর ২০১৩