ঢাকা, শুক্রবার ৩০, অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৫১:৫৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি, ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১৫ ডলার ছাড়াল বাজারে শীতের সবজির আগমন, স্বস্তি নেই সব পণ্যে শনিবারের মধ্যে সরকারি বাসার ভাড়াটিয়া সরানোর নির্দেশ জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ লাইনচ্যুত, ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ট্রেন চলাচল বন্ধ

মেঘ সরলেই পঞ্চগড়ের আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:০৬ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার

বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মাটি থেকে দেখা যায় হিমালয়ের এই অপরূপ সৌন্দর্য

বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মাটি থেকে দেখা যায় হিমালয়ের এই অপরূপ সৌন্দর্য

বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গ দেখার অপূর্ব অভিজ্ঞতা। ভাবা যায়! কল্পনা করুন, ভোরের আলো ফুটছে। চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদর। পূর্ব আকাশে সূর্যের আভা ছড়িয়ে পড়তেই ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে দিগন্ত। আর সেই নীল আকাশের অনেক দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বরফে ঢাকা বিশাল এক পর্বতশ্রেণি। কখনো শুভ্র, কখনো গোলাপি, কখনো আবার সোনালি আলোয় ঝলমল করছে তার চূড়া। মনে হবে, চোখের সামনে যেন খুলে গেছে অন্য এক পৃথিবীর দরজা। এই অপূর্ব দৃশ্যের নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা।

বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের মাটি থেকে দেখা যায় হিমালয়ের এই অপরূপ সৌন্দর্য। মেঘ ও কুয়াশার আড়াল সরিয়ে গত তিন দিন ধরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর তাতেই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পঞ্চগড়ের পর্যটনপ্রত্যাশীদের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রকৃতিপ্রেমী ও আলোকচিত্রীদের চোখ এখন উত্তরের আকাশে।

কেউ মুঠোফোনে ধরে রাখছেন সেই বিরল দৃশ্য, কেউ আবার ক্যামেরার লেন্সে বন্দি করছেন হিমালয়ের বরফঢাকা চূড়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি ও ভিডিও। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন দৃশ্য দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন অনেকে।

গত বুধবার সকালে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিষ্কার দেখা গেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। মেঘমুক্ত নীল আকাশের পটভূমিতে বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গের সারি যেন প্রকৃতির আঁকা এক বিশাল ক্যানভাস। বিশেষ করে ভোরের আলোয় পাহাড়ের রং বদলে যাওয়ার দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

কাঞ্চনজঙ্ঘা: বরফের রাজ্যে প্রকৃতির বিস্ময়

কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমালয় পর্বতমালার একটি বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার। বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ এই পর্বতশৃঙ্গ ভারত ও নেপালের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে খালি চোখেই দেখা যায় এই পর্বতশৃঙ্গ।

কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর রঙের পরিবর্তন। ভোরের সূর্যের আলো যখন বরফে ঢাকা চূড়ায় পড়ে, তখন কখনো মনে হয় পাহাড়ের গায়ে লেগেছে গোলাপি আবির, কখনো সোনালি রোদ, আবার কখনো শুভ্র বরফে ঝলমল করে ওঠে পুরো পাহাড়। প্রকৃতির এই রূপ দেখতে অনেকেই ভোরের আগেই পৌঁছে যান তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে।

তবে প্রতিদিন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় না। মেঘ, কুয়াশা, বাতাসের জলীয়বাষ্প এবং আবহাওয়ার স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে এর দৃশ্যমানতা। সাধারণত বর্ষা শেষে আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনা বাড়ে। এ কারণে প্রতিবছর শরৎ ও হেমন্তের সময় এই অঞ্চলকে ঘিরে তৈরি হয় পর্যটকদের বাড়তি আগ্রহ।

তেঁতুলিয়া: যেখানে পাহাড়ের সঙ্গে মিশে যায় বাংলার প্রকৃতি

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে গেলে তেঁতুলিয়া হতে পারে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। বাংলাদেশের একেবারে উত্তরের এই জনপদে রয়েছে গ্রামীণ প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য। চা-বাগানের সবুজ, বিস্তীর্ণ মাঠ, নদী, গাছপালা আর শান্ত জনপদ—সব মিলিয়ে তেঁতুলিয়ার পরিবেশ অন্য রকম এক মুগ্ধতা তৈরি করে।

এখানকার চা-বাগান ঘুরে দেখা, গ্রামীণ পথ ধরে হাঁটা কিংবা নদীর ধারে বসে প্রকৃতি উপভোগ করা যায়। মহানন্দা নদীর তীরও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আকর্ষণীয়। নদীর ওপারে ভারতীয় ভূখণ্ড, এপারে বাংলাদেশ—মাঝখানে বয়ে চলেছে মহানন্দা। নদীর তীর থেকে প্রকৃতি উপভোগের পাশাপাশি আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার।

তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও আশপাশের এলাকা থেকেও পর্যটকেরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার চেষ্টা করেন। তবে পাহাড় দেখার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা সময় নিশ্চিত নয়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি তোলার নেশায় প্রকৃতিপ্রেমীরা

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে আনন্দ তৈরি হয়েছে। ফটোগ্রাফার ফিরোজ আল সাবাহ নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি প্রকাশ করে দীর্ঘ প্রতীক্ষার কথা জানিয়েছেন। তাঁর পোস্টে উঠে এসেছে অপেক্ষা, নির্ঘুম রাত আর কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করার আনন্দ।

স্কুলশিক্ষক শাওন ইমরান লিখেছেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে বিদ্যালয় যাই। আজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।’

মঈন উদ্দীন নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘আজকে বাসার সামনে থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলাম। আলহামদুলিল্লাহ।’

এই ছোট ছোট উচ্ছ্বাসই বলে দেয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু পর্যটকদের কাছে নয়, স্থানীয় মানুষের কাছেও কতটা আনন্দের বিষয়।

কখন যাবেন, কীভাবে দেখবেন?

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় পঞ্চগড় ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রাখা জরুরি। সাধারণত বর্ষা শেষ হওয়ার পর আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করলে দৃশ্যমানতার সম্ভাবনা বাড়ে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত পাহাড় দেখার জন্য ভালো সময় হতে পারে। তবে আবহাওয়ার কারণে কোনো দিনই দেখা নিশ্চিত নয়।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় যেতে বাস কিংবা ট্রেনে যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে পঞ্চগড়গামী আন্তনগর ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। পঞ্চগড় শহর থেকে তেঁতুলিয়া যেতে স্থানীয় যানবাহন পাওয়া যায়। সেখানে রাতযাপনের জন্য আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালা রয়েছে। ভ্রমণের আগে থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত ও আবহাওয়ার তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।

অপেক্ষার নাম কাঞ্চনজঙ্ঘা

গত দুর্গাপূজার ছুটিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক পর্যটক পঞ্চগড়ে এসেছিলেন। কিন্তু মেঘের কারণে অনেকে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখতে পাননি। প্রকৃতির কাছে মানুষের এই অপেক্ষা কখনো আনন্দে পূর্ণ হয়, কখনো ফিরে যেতে হয় কিছুটা হতাশা নিয়ে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানিয়েছেন, আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় বর্তমানে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের আবহাওয়া আরও এক থেকে দুই দিন থাকতে পারে। তবে ৩১ অক্টোবর আকাশে মেঘের সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘ তৈরি হলে পর্বতশৃঙ্গটি আবার আড়ালে চলে যেতে পারে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে যাওয়ার আনন্দ আসলে শুধু একটি পাহাড় দেখার আনন্দ নয়। এটি প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতাকে অনুভব করার অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হাজার মাইল দূরের বরফঢাকা হিমালয় দেখার সুযোগ সত্যিই অসাধারণ।

তাই কখনো পঞ্চগড় গেলে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষায় নয়, তেঁতুলিয়ার সবুজ, মহানন্দার শান্ত জল আর উত্তরের নির্মল প্রকৃতির সঙ্গেও কিছুটা সময় কাটিয়ে আসুন। হয়তো মেঘ সরে গিয়ে এক সকালে আপনার সামনেও খুলে যাবে হিমালয়ের সেই অপূর্ব দৃশ্য। আর সেই মুহূর্তের স্মৃতি অনেক দিন রয়ে যাবে মনের গভীরে।