ঢাকা, সোমবার ১০, মে ২০২১ ২:০৯:৪০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারছেন না দেশে করোনায় ২৪ ঘণ্টায় প্রাণহানি ৫৬ মার্কেটে মানুষের ঢল, নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই একটা ঈদ বাড়িতে না করলে কী হয়: প্রধানমন্ত্রী ফেরিঘাটে বিজিবি মোতায়েনের পরও ঘরমুখো মানুষের ঢল কাবুলে বিস্ফোরণে নিহত ৫৫ জনের অধিকাংশই ছাত্রী আজ মা দিবস, মাগো…ওগো দরদিনী মা

কেরানীগঞ্জের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা শরিফুন্নেসা

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৪২ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২১ সোমবার

কেরানীগঞ্জের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা শরিফুন্নেসা

কেরানীগঞ্জের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা শরিফুন্নেসা

কেরানীগঞ্জ উপজেলার একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা শরিফুন্নেসা। বর্তমানে বসবাস করছেন কলাতিয়া ইউনিয়নের আলিনগর গ্রামে। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাটি ছিল তাদের বাড়ি। তাদের বাড়িতেই যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন তিনি। একাধিকবার সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন সাহসিকতার সঙ্গে।

একাত্তর সালের সেই উত্তাল সময়ে শরিফুন্নেসার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। সে সময় রেডিওতে এবং আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে জানতে পারেন দেশের মা-বোনদের ওপর পাক হানাদারেরা নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের ধর্ষণ করছে। বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এসব শুনে তরুণী শরিফুরন্নেসা প্রতিশোধ নিতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। ভাবেন, যুদ্ধই একমাত্র রাস্তা হানাদারদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার। এ চিন্তা থেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন শরিফুন্নেসা।

কলাতিয়া ইউনিয়নের আহাদীপুর গ্রামের মেয়ে শরিফুন্নেসা। তার বাবা মোবারক হোসেন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এবং সংগঠক। সে কারণে তাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তার বাবা আগেই ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন। জুলাই মাস থেকে তাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়। চলে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত।

২৬ মার্চ ভোররাতে কেরানীগঞ্জ থানা ও আগানগর কেচি সাহা এলাকার আনসার ক্যাম্প দখল করেন মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা। এই দুটি জায়গা থেকে অস্ত্র লুট করে নিয়ে আসেন তারা। সেসব অস্ত্র দিয়েই চলে প্রশিক্ষণ।

শরিফুন্নেসা ছিলেন বাড়ির বড় ও একমাত্র মেয়ে। ছোট চার ভাই তখন নাবালক। মনে মনে তো যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলই। নিজেদের বাড়িতেই যুদ্ধের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, আর কি বসে থাকা যায়? প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করলেন।

১৯৭১ সালে চারটি সেমিপাকা টিনশেড ঘর ছিল শরিফুন্নেসাদের বাড়িতে। একটি ঘরে মা-বাবা ও ভাইবোনেরা মিলে গাদাগাদি করে থাকতেন। অন্য তিনটি ঘরে মুক্তিযোদ্ধারা থাকতেন। আর বাড়ির পেছনে চলত প্রশিক্ষণ। শরিফুন্নেসার মা নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়াতেন।

তাদের বাড়ির চারদিক ছিল গাছপালায় ঘেরা। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ফলে তাদের কোনো অসুবিধায় পড়তে হয়নি। ভেতরে কী হচ্ছে, তা বাইরে থেকে বোঝা যেত না।

শরিফুরন্নেসাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ঢাকা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোস্তফা মহসিন মন্টু। শরিফুন্নেসা নিজেও তার কাছ থেকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এসএলআর, এসএমজি, রাইফেল, স্টেনগান—এসব অস্ত্র চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন শরিফুন্নেসা। তার দুচোখে তখন শুধু একটাই স্বপ্ন ছিল, পাকবাহিনীকে হারাতে হবে। এ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে।

এর আগে ২ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কেরানীগঞ্জ আক্রমণ করে। এ সময় পাকসেনারা পাঁচ হাজারের মতো বাঙালিকে হত্যা করে।

যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে মা-বাবা শরিফুন্নেসাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। তার মা-ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তবে তিনি যুদ্ধে অংশ নেননি।

বহুবার বহু সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এই বীর নারী যোদ্ধা। তুলসীখালী ঘাট এলাকায় অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অপারেশনে অংশ নিয়েছেন তিনি। তাদের প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি সেনারা বহুবার পিছু হটে যায়। রাতে যুদ্ধ করে রাতেই আবার বাড়ি ফিরে আসতেন তারা।

সালোয়ার-কামিজ পরে যুদ্ধ করেতেন এই বীর নারী। মনে তখন কোনো ভয় বা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করেনি। অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে খবর পান, ধলেশ্বরী নদীতে পাকসেনারা লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসছে। শরিফুন্নেসাসহ অন্যান্যরা তখন দ্রুত অপারেশনে চলে যান। সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে তাদের বহু সময় ধরে গোলাগুলি চলে। পাকসেনাদের গুলিতে একজন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান।  ওমর নামের ওই মুক্তিযোদ্ধা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।

দেশ স্বাধীন হয়ওয়ার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে শরিফুন্নেসার বিয়ে হয়। বর্তমানে ৭১ বছরের বৃদ্ধ শরিফুন্নেসা ভালোই আছি। স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন আলিনগর গ্রামে। প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন ১০ হাজার টাকা।

শরিফুন্নেসার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে ব্যবসা করে, মেজ ছেলে আমেরিকায় থাকে এবং ছোট ছেলে খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত।

এখনো দেশের নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তাদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, এ বিষয়টা খুব খারাপ লাগে এই বীর নারীর। তিনি চান সবাই শান্তিতে থাকুক, ভালো থাকুক প্রিয় মাতৃভূমি।