ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ১০:৪০:১৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

চিঠি আর আসে না, ডাকহরকরা হারিয়ে গেছে

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৩২ পিএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

এক সময় মানুষ কথা বলত কাগজে। আজ মানুষ কথা বলে স্ক্রিনে। ডিজিটাল যুগে এসে চিঠি যেন ধীরে ধীরে নির্বাসিত এক নাগরিক। হাতে লেখা অক্ষরগুলোর আর তাড়া নেই, খাম মোড়ানো অনুভূতির আর পথচলা নেই। এখন খবর আসে এক সেকেন্ডে—হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, ই-মেইল। কিন্তু চিঠি? সে আর আসে না। তাই ডাকপিয়নেরও আর তাড়া নেই, কাজ নেই। পোস্ট অফিসগুলো ঝিমিয়ে পড়ে থাকে দুপুরের রোদের মতো নিথর হয়ে।

এক সময় প্রতিটি সকাল ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টায় শুরু হতো। দূর থেকে ভেসে আসত “টিং টিং” শব্দ। সেই শব্দে বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপন লাগত। কার চিঠি এলো? কার অপেক্ষার অবসান ঘটল? প্রেমিকের, ছেলের, স্বামীর, না কি দূর শহরে পড়তে যাওয়া মেয়ের?

আজ ডাকপিয়নের সেই ঘণ্টা আর শোনা যায় না। মাঝে মাঝে সে আসে বটে, কিন্তু হাতে চিঠি নেই—আছে বিল, নোটিশ, বিজ্ঞাপনের কাগজ। ভালোবাসা, খবর, দীর্ঘ অপেক্ষার গল্পগুলো আর তার থলেতে ঢোকে না।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লেটার বক্সগুলোও যেন আজ বড় একা। লাল রঙের শরীরে ধুলো জমে, মুখে তালা পড়ে থাকে দিনের পর দিন। বৃষ্টি পড়ে তাদের গায়ে, রোদে রং ফিকে হয়ে আসে। কেউ আর কাগজ ভাঁজ করে ভেতরে ঢোকায় না নিজের বুকের কথা। কেউ আর লিখে না—
“আমি ভালো আছি।”
“তোমাকে খুব মনে পড়ছে।”
“মা, তোমার হাতের ভাত খেতে ইচ্ছে করছে।”

পোস্ট অফিসের ভেতরে ঢুকলে আজকাল শোনা যায় নিস্তব্ধতা। কাঠের কাউন্টার, পুরোনো স্ট্যাম্প, দেয়ালে টাঙানো বিবর্ণ ক্যালেন্ডার—সবই যেন সময়ের ভারে ক্লান্ত। আগে এখানে মানুষের ভিড় হতো। কেউ টাকা পাঠাতে এসেছে, কেউ চিঠি পাঠাতে, কেউ প্রিয়জনের খবর নিতে। এখন সেখানে বসে থাকা কর্মচারীরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কাজ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। যেন শব্দ আছে, ভাষা নেই।

চিঠি শুধু খবর ছিল না, চিঠি ছিল অনুভূতি। চিঠি মানেই তো স্মৃতি, অপেক্ষা আর মানুষের গন্ধ।
চিঠিতে থাকত হাতের লেখা—কারো অক্ষর কাঁপা, কারোটা শক্ত, কারোটা বেঁকে যাওয়া। সেই লেখার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত মনের অবস্থা। কাগজে থাকত অশ্রুর দাগ, কখনো সুগন্ধি, কখনো চায়ের ছিটে। কোনো কোনো চিঠির সঙ্গে লুকানো থাকত শুকনো ফুল, কোনো কোনো চিঠিতে থাকত শুধু নীরবতা।

আজকের বার্তা ঝরঝরে, ঝকঝকে, কিন্তু গন্ধহীন।
এখন “I miss you” লেখা হয় কিবোর্ডে, কিন্তু তার ভেতরে আর অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস থাকে না। এখন “ভালো আছি” লেখা হয় এক লাইনে, কিন্তু তার পাশে মায়ের চোখের জল দেখা যায় না।

ডাকপিয়ন এখন আর কারো প্রিয় মানুষ নয়। আগে তাকে দেখলেই দরজা খুলে যেত, চোখে জ্বলত প্রশ্ন—“চিঠি আছে?” এখন তাকে দেখে কেউ তাড়াতাড়ি দরজা খোলে না। সে যেন খবরহীন এক বাহক, যার হাতে আর গল্প নেই।

চিঠির সঙ্গে হারিয়ে গেছে অপেক্ষার আনন্দও।
আগে মানুষ জানত, চিঠি আসতে সময় লাগবে। সেই সময়টুকুতে মানুষ ভাবত, কল্পনা করত, দিন গুনত। আজ বার্তা আসে সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু তার মূল্যও ফুরিয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে।

লেটার বক্সগুলো তাই আজ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে উদাস হয়ে। যেন তারা বলতে চায়—
“আমাদের ভেতরে আর কেউ নিজের মন ঢোকায় না।”
“আমরা এখন শুধু লোহার বাক্স, স্মৃতির বাক্স নই।”

হয়তো কোনো একদিন আবার মানুষ ক্লান্ত হবে দ্রুততার জীবনে। আবার খুঁজবে ধীরতা, খুঁজবে হাতের লেখা, খুঁজবে কাগজে জমে থাকা অনুভূতি। হয়তো তখন আবার ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা বাজবে। আবার লেটার বক্স খুলবে নিয়ম করে। আবার কেউ লিখবে—
“এই চিঠিটা শুধু তোমার জন্য।”

ততদিন পর্যন্ত চিঠির দেশ থাকবে নীরব। ডাকঘর থাকবে অপেক্ষায়।
আর লাল লেটার বক্সগুলো দাঁড়িয়ে থাকবে রোদ-বৃষ্টির ভেতর— পুরোনো দিনের গল্প বুকে নিয়ে, 
আজকের মানুষের অবহেলায়,
নীরব এক বিষণ্ন স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে।