ঢাকা, শনিবার ৩১, অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৪২:৫৫ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা, জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে ছেলেরা এইচএসসির ফল প্রকাশ: কোন বোর্ডে পাসের হার কত এইচএসসির ফল: জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ অনলাইনে দ্রুত এইএসসির ফল জানবেন যেভাবে আজ এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ, জানবেন যেভাবে

তাপপ্রবাহের নীরব শিকার অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গর্ভের শিশু

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৪:৩৬ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় মাতৃস্বাস্থ্যকে দিতে হবে বিশেষ গুরুত্ব। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবজীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এক গভীর সংকট। বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহের তীব্রতা, বিস্তৃতি ও স্থায়িত্ব বাড়ছে। অস্বাভাবিক গরমে বিপর্যস্ত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু এই তাপপ্রবাহের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিকারদের মধ্যে রয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এবং তাঁদের গর্ভের শিশুরা। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা, পরিকল্পনা কিংবা নীতিনির্ধারণে তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী যখন প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাটান, তখন তাঁর শরীরকে নিজের পাশাপাশি গর্ভের শিশুর প্রয়োজনও সামাল দিতে হয়। গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম বেড়ে যায়, রক্ত সঞ্চালন ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এর সঙ্গে বাইরের উচ্চ তাপমাত্রা যুক্ত হলে পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, হিট এক্সহস্টশন ও হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। বিষয়টি শুধু মায়ের শারীরিক অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়তে পারে গর্ভের শিশুর বিকাশেও।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে সময়ের আগে সন্তান জন্ম, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু গবেষণায় গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত একটি শিশুর জন্মের আগেই তার জীবনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: ঝুঁকি বাড়ছে, প্রস্তুতি কতটুকু?
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের। ভৌগোলিক অবস্থান, জনঘনত্ব, আর্দ্র আবহাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে তাপপ্রবাহের অভিঘাত এখানে বহুমাত্রিক। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই গরমের মধ্যে রান্না করেন, ঘরের কাজ সামলান, কারখানায় কাজ করেন কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বের হন। অনেকের বসবাস টিনের ঘরে, যেখানে দুপুরের তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের চেয়েও অসহনীয় হয়ে ওঠে।

জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার দিন ছিল বছরে গড়ে ৩৪ দিন। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে গড়ে সাতটি অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ দিন যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে এই অতিরিক্ত দিনের সংখ্যা ছিল বছরে গড়ে ৩০টি। এই হিসাবই বলে দেয়, গর্ভবতী নারীদের জন্য তাপপ্রবাহ কতটা বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। 
Home


২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ক্লাইমেট সেন্ট্রালের বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) জানিয়েছে, এই তিন মাসে বাংলাদেশে ৩১ দিন ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর মধ্যে ২৫টি অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ দিন যুক্ত হয়েছে। কুমিল্লা ও ঢাকায়ও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। 
United News Bangladesh


বাংলাদেশে এ বিষয়ে সরাসরি গবেষণার ফলও সামনে এসেছে। কক্সবাজারের চকরিয়ায় ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬২৪টি গর্ভধারণের ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরিচালিত একটি গবেষণায় তাপমাত্রার সঙ্গে গর্ভপাতের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২৮ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রার মধ্যে গর্ভপাতের সমন্বিত সম্ভাবনা ১৬ থেকে ২১ ডিগ্রি তাপমাত্রার তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। উচ্চ তাপমাত্রার দলে গর্ভপাতের হার ছিল ১১ দশমিক ২ শতাংশ, আর তুলনামূলক কম তাপমাত্রার দলে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি তাপমাত্রা ও গর্ভপাতের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ; সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। 
The Daily Star


এই গবেষণার ফলাফল আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কারণ, গর্ভাবস্থায় একজন নারী শুধু নিজের শরীরের জন্য নয়, অনাগত সন্তানের জীবন ও বিকাশের জন্যও প্রতিনিয়ত লড়াই করেন। অথচ তাঁর চারপাশের পরিবেশ কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
শহর ও গ্রামের নারীদের সংকট
ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে কর্মজীবী অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকি আরও বেশি। তৈরি পোশাক কারখানা, ক্ষুদ্র শিল্প, দোকান, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে কর্মরত অনেক নারীকে দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই, বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, বিশ্রামের সুযোগও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়েও তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

অন্যদিকে গ্রামের নারীদের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। কৃষিকাজ, গবাদিপশুর পরিচর্যা, রান্নাবান্না, পানি সংগ্রহসহ পরিবারের অধিকাংশ কাজ তাঁদেরই করতে হয়। গরমের সময় এসব কাজের চাপ কমে না। বরং তাপপ্রবাহের সঙ্গে পানির সংকট যুক্ত হলে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং নিরাপদ পানির অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

এখানে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আমাদের দেশে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অনেকেই নিজের অসুস্থতা বা শারীরিক অস্বস্তিকে গুরুত্ব দেন না। পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের বিশ্রাম, পুষ্টি ও চিকিৎসাকে উপেক্ষা করেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের নারীদের পক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কতটা?
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহযোগিতায় ২০২৪ সালের ৫ মে তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় জাতীয় নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাপজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা এবং সময়ের আগে প্রসবের মতো জটিলতা মোকাবিলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 
UNICEF Global


এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু শুধু নির্দেশিকা প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং মাতৃসেবা কেন্দ্রে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা তাপপ্রবাহের সময় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা দিতে পারেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর মা, নবজাতক ও শিশুর ওপর তাপের প্রভাব পর্যবেক্ষণের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক সূচক প্রকাশ করেছে। এতে সময়ের আগে প্রসব, মৃত সন্তান জন্ম, কম ওজনের শিশু, গর্ভাবস্থাজনিত উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয় পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে। 
World Health Organization


বাংলাদেশের জন্যও এ ধরনের তথ্যভিত্তিক নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। আবহাওয়ার তথ্যের সঙ্গে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাতৃস্বাস্থ্যের তথ্য যুক্ত করতে হবে। কোন এলাকায় তাপপ্রবাহের সময় গর্ভপাত, অপরিণত প্রসব কিংবা কম ওজনের শিশুর জন্ম বাড়ছে, তা নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। তাহলেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
কী করা জরুরি?
প্রথমেই অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য বিশেষ তাপপ্রবাহ সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর যখন কোনো এলাকায় তাপপ্রবাহের সতর্কতা দেবে, তখন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মাতৃসেবা কেন্দ্রগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কাছে মোবাইল বার্তা, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

কর্মজীবী অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গার্মেন্টস ও অন্যান্য শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বিশ্রামের সুযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের সময় পরিবর্তন করতে হবে। তীব্র তাপপ্রবাহের সময় তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কর্মক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের জন্যও বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি পরামর্শ এবং তাপপ্রবাহের সময় করণীয় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর নারীদের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচণ্ড গরমে বাইরে যাওয়া যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা, ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে বিশ্রাম নেওয়া এবং ভারী শারীরিক পরিশ্রম কমানো প্রয়োজন। মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক মাথাব্যথা, বমি, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া কিংবা গর্ভাবস্থায় শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।
জলবায়ু পরিকল্পনায় মাতৃস্বাস্থ্য কোথায়?
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের নানা পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব পরিকল্পনায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে?

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনায় নারী ও শিশুকে শুধু সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। গর্ভবতী নারীদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি থাকতে হবে। জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে মাতৃস্বাস্থ্যকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিশেষ করে শহরের বস্তি, শিল্পাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং উত্তরাঞ্চলের তাপপ্রবণ জেলাগুলোতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও নিরাপদ বিশ্রামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হাসপাতাল ও মাতৃসেবা কেন্দ্রগুলোকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। বাংলাদেশে কোন সময়ে, কোন অঞ্চলে এবং কোন পেশায় নিয়োজিত অন্তঃসত্ত্বা নারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে।

এখানে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে অর্থায়ন পাওয়া যায়, তার একটি অংশ মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যয় করা উচিত। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয় নয়; মানুষের জীবন রক্ষাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।
অনাগত শিশুর নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার আগেই যদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সেই শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না রাখা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা শুধু সামাজিক অবহেলা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষারও ব্যর্থতা।

আমরা প্রায়ই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার কথা বলি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্মের আগের সময়টুকু কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে ভাবি কি? জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলাশয় সংরক্ষণ কিংবা নগরায়ণ পরিকল্পনার পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একটি সুস্থ শিশুর জন্ম কেবল একটি পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়; এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ। গর্ভের শিশুকে নিরাপদ রাখা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো অন্তঃসত্ত্বা নারীর সুস্থতা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তাপপ্রবাহের এই নতুন বাস্তবতায় মাতৃস্বাস্থ্যকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁদের গর্ভের শিশুকে সামনে রাখতে হবে। কারণ জলবায়ু সংকটের দায় তাঁদের নয়, কিন্তু এর মূল্য যেন তাঁদের অনাগত সন্তানকে দিতে না হয়।

তথ্যসূত্র ও প্রাসঙ্গিক গবেষণা:

1. ক্লাইমেট সেন্ট্রাল—বাংলাদেশে গর্ভাবস্থায় তাপঝুঁকি বিশ্লেষণ। Extreme Heat Risks to Pregnancy: Bangladesh।

2. নেচার মেডিসিন—৬৬ দেশের ১৯৮টি গবেষণার ভিত্তিতে তাপমাত্রা ও মাতৃ-নবজাতক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক। গবেষণাপত্র।

3. ইউনিসেফ বাংলাদেশ—তাপজনিত অসুস্থতা থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় জাতীয় নির্দেশিকা। জাতীয় নির্দেশিকা প্রকাশ।

4. ডেইলি স্টার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬—বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন। Rising Heat Takes a Toll on Maternal, Child Health।

5. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা—মা, নবজাতক ও শিশুর ওপর তাপের প্রভাব পর্যবেক্ষণের নির্দেশক। WHO-এর ২০২৬ সালের নির্দেশিকা।