ঢাকা, শনিবার ২১, মার্চ ২০২৬ ১৭:০৬:৩৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রাজধানীতে আজ বন্ধ থাকছে মেট্রোরেল ঈদের দিন ফাঁকা রাজধানী, নিস্তব্ধতায় ভিন্ন এক ঢাকা জাতীয় ঈদগাহে একসঙ্গে নামাজ আদায় করলেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে ‘যমুনা’য় জনতার ঢল চাঁদরাতে কেনাকাটা: ভিড়ে মুখর নগর জীবন নারীদের জন্য রাজধানীর কোথায় কখন ঈদ জামাত আজ ঈদুল ফিতর, দেশজুড়ে আনন্দ-উৎসব

দাদাভাইকে যেমন দেখেছি: আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৯ পিএম, ২১ মার্চ ২০২৬ শনিবার

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই।

রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই।

আমাদের অনেকের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের নাম শুনলেই শৈশব আর কৈশোরের দরজা খুলে যায়। আমার জন্য তেমনই একজন ছিলেন রোকনুজ্জামান খান—আমাদের সবার প্রিয় দাদা ভাই। তিনি ছিলেন শুধু একজন সম্পাদক নন, আমাদের কাছে ছিলেন অভিভাবক, শিক্ষক আর পথপ্রদর্শক।

আমি যখন প্রথম লেখা পাঠিয়েছিলাম দৈনিক ইত্তেফাক-এর কচি-কাঁচার আসর-এ, তখন মনে হয়েছিল এক বিশাল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সেই দরজাটা খুলে দিয়েছিলেন দাদা ভাই নিজেই। লেখা ছাপা হয়েছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা ছিল তাঁর ছোট্ট নোট— “ভাষাটা আরও পরিষ্কার করো। কথাটা ভালো।”

এই ‘আরও ভালো করো’ কথাটাই আমাদের অনেককে সারাজীবনের লেখালেখির পথে ঠেলে দিয়েছিল।

কচি-কাঁচার আসরের বাইরেও দাদা ভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কচি-কাঁচার মেলার স্মৃতি। 

একবার কচি-কাঁচার মেলায় তিনি একদিন আমাকে আর গল্পকার আনিস রহমান ভাইকে ডেকে বলেছিলেন—
“পাঠাগারটা নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্ব তোমাদের দুজনের।”

সে দায়িত্বটা ছিল আমাদের কাছে সম্মানের। দাদা ভাই কচি-কাঁচার মেলার পাঠাগারটি নতুন করে গড়ে তোলার ভার দিয়েছিলেন আমাদের ওপর। তখন থেকে আমরা দুজন নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে আর শুক্রবার সকালে কচি-কাঁচায় যেতাম। বই সাজানো, তালিকা করা, শিশুদের বই নিতে দেওয়া, আবার ফেরত নেওয়া—সব কাজই ছিল আমাদের।

অনেক সময় ক্লান্ত লাগত, কিন্তু দাদা ভাইয়ের কথাটা মনে পড়ত—“কচি-কাঁচার জন্য যা করবে, সেটাই আসল কাজ।”

মেলায় পাঠাগারের টেবিলে বসে শিশুদের চোখে বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখতে দেখতে বুঝেছিলাম, দাদা ভাই আসলে শুধু একটি পাতা নয়, একটি প্রজন্ম তৈরি করছিলেন। তাঁর কাছে লেখা মানে শুধু বাক্য সাজানো নয়, মানুষ গড়া।

দাদা ভাই ছিলেন কঠোর, কিন্তু সেই কঠোরতার ভেতরেও ছিল অদ্ভুত মমতা। ভুল করলে ধমক দিতেন, আবার ঠিক করলে এমনভাবে প্রশ্রয় দিতেন যে মনে হতো, আমরা পারব—আরও ভালো পারব।

কচি-কাঁচার আসরে গেলে মনে হতো, আমরা কোনো অফিসে নয়—একটা পরিবারের ভেতরে ঢুকেছি। দাদা ভাইয়ের টেবিলের সামনে দাঁড়াতে ভয় লাগত, আবার তাঁর কাছেই যেতে মন চাইত। কারণ তিনি আমাদের গুরুত্ব দিতেন।

তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—লেখা সত্য হতে হবে, ভাষা সহজ হতে হবে, আর মনটা হতে হবে পরিষ্কার।

অনেক বড় হয়েও তাঁর সামনে দাঁড়ালে আমরা আবার ছোট হয়ে যেতাম। ‘দাদা ভাই’ ডাকটাই যেন বয়সের হিসাব মুছে দিত। তাঁর চোখে আমরা সবাই কচি-কাঁচাই ছিলাম।

আজ তিনি নেই, কিন্তু দাদা ভাই চলে যাননি। তিনি আছেন—আমাদের লেখার ভেতরে, আমাদের দায়িত্ববোধের ভেতরে, আর কচি-কাঁচার মেলার সেই পাঠাগারের তাকের ফাঁকে ফাঁকে।

যখনই কলম ধরি, মনে হয়— দাদা ভাই যদি এটা পড়তেন, কী বলতেন? হয়তো বলতেন, “ভালো। কিন্তু আরও ভালো করা যায়।”

এই ‘আরও ভালো করা যায়’—এই কথাটাই তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।

দাদা ভাই, আপনি আমাদের শুধু লেখক বানাননি, আপনি আমাদের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছেন। আর সেই দায়িত্ব থেকেই
আমরা মানুষ হতে শিখেছি।

কচিকাচার ভবনটা তখন ছিল বায়তুল মোকাররম মসজিদের বিপরীতে একটি হলুদ চারতলা ভবনে। নিচতলা দিয়ে ঢুকতেই বাঁ হাতের ঘর— সেখানেই বসতেন দাদাভাই, রোকনুজ্জামান খান। সেই ঘরে ঢুকলেই মনে হতো, কোনো অফিসে নয়— ঢুকে পড়েছি বইয়ের এক রাজ্যে।

দাদাভাইয়ের ঘর থেকে সামনে এগোলেই দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। কিন্তু আমাদের যাত্রা প্রায়ই থেমে যেত তাঁর দরজাতেই। দরজা খুলে দেখতাম, রাশভারি মুখে চেয়ারে বসে আছেন তিনি। সামনে বিশাল টেবিলজুড়ে তাবৎ দুনিয়ার পত্র-পত্রিকা আর বই। চারপাশে কাচের আলমারিতে সারি সারি বই—শিশুসাহিত্য, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি। মনে হতো, দাদাভাইয়ের চারপাশে দেয়াল নেই—শুধু বইয়ের সারি।

প্রথম প্রথম তাঁর রাশভারি মুখ দেখে ভয়ই পেতাম। মনে হতো, কী যেন জিজ্ঞেস করবেন! কিন্তু কথা বলতে শুরু করলেই বুঝতাম, এই কঠোরতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে অগাধ স্নেহ। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু যা বলতেন, তা ঠিক নিশানায় গিয়ে লাগত।

একদিন দাদাভাই কচিকাচার মেলার পাঠাগারটি নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব দিলেন আমাকে আর আনিস ভাইকে (গল্পকার আনিস রহমান)। দায়িত্বটা ছিল আনন্দের, আবার ভয়েরও। কারণ দাদাভাইয়ের আস্থা মানে ছিল বিশাল বোঝা কাঁধে নেওয়া।

আমরা দুজন নিয়ম করে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল আর শুক্রবার সকালে কচিকাচায় যেতাম। বই বাছাই করতাম, তালিকা বানাতাম, শিশুদের পড়ার উপযোগী বই আলাদা করতাম। কখনো দাদাভাই নিজে এসে দাঁড়িয়ে দেখতেন।
বলতেন— “এই বইটা রাখো, ওটা বাদ দাও। বাচ্চাদের চোখে যেন আলো জ্বলে— সে বই চাই।”

কথাগুলো আদেশের মতো শোনালেও তাতে ছিল এক ধরনের মমতা। তাঁর কাছে পাঠাগার শুধু বই রাখার জায়গা ছিল না, ছিল ভবিষ্যৎ গড়ার ঘর। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ভালো বই একটা শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে।

দাদাভাইয়ের ঘরে বসে থাকলে মনে হতো, তিনি সময়ের পাহারাদার। একদিকে পুরোনো পত্রিকার স্তূপ, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের জন্য সাজানো স্বপ্নের বই। তাঁর চোখে ছিল শাসনের দৃষ্টি, আবার তাতে ছিল সন্তানের মতো স্নেহ।

আজও চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে— হলুদ ভবন, নিচতলার সেই ঘর, বিশাল টেবিল, কাচের আলমারি আর মাঝখানে বসে থাকা এক রাশভারি মানুষ। মনে হয়, দরজা খুললেই তিনি বলবেন— “কি রে, আজ কী বই এনেছিস?”

কিন্তু দরজা আর খোলে না। তবু দাদাভাই থেকে গেছেন কচিকাচার মেলার প্রতিটি বইয়ে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে, প্রতিটি পাঠাগারের নীরবতায়।

তিনি শুধু সম্পাদক ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রজন্ম গড়ার কারিগর। শিশুদের জন্য তাঁর ভালোবাসা ছিল নীরব সাধনার মতো—প্রচারবিমুখ, অথচ গভীর।

দাদাভাই, আপনার সেই রাশভারি মুখ, আপনার সেই বইভরা টেবিল, আপনার সেই কঠোর অথচ স্নেহময় কণ্ঠ—সবকিছু আজ স্মৃতির ভেতর আরও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

আপনাকে যেমন দেখেছি, সেভাবেই মনে রাখব— বইয়ের পাহারাদার হয়ে, শিশুমনের বন্ধু হয়ে।

কচিকাঁচার বাগানে দাদাভাই:
কচিকাঁচার বেগুনবাগিচায় নতুন ভবনের পেছনে, নিঃশব্দে শুয়ে আছেন দাদাভাই— রোকনুজ্জামান খান।
শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, শিশুদের হাসির কাছেই তাঁর চিরবিশ্রাম।

এ যেন কাকতাল নয়, এক গভীর প্রতীক। যিনি সারাজীবন কচিকাঁচার জন্য লিখেছেন, যিনি শিশুদের স্বপ্নকে বইয়ের পাতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন—তাঁর শেষ ঠিকানাও হলো কচিকাঁচার বাগান।

এই বাগান শুধু গাছের বাগান নয়। এটা স্মৃতির বাগান। এখানে মিশে আছে কচি হাতে লেখা প্রথম গল্প, লাজুক কবিতার খসড়া,
আর দাদাভাইয়ের কড়া অথচ স্নেহমাখা নির্দেশ—“ভালো করে লেখো। মিথ্যে লিখো না।”

নতুন ভবনের পেছনে তাঁর সমাধী—সামনের দিকে ভবিষ্যৎ,
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অতীতের পাহারাদার। যেন তিনি আজও দেখছেন, কে ঢুকছে, কে লিখছে, কে কচিকাঁচার পতাকা বহন করছে।

বেগুনবাগিচার বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় তাঁর নাম। যে শিশু একদিন এখানে বই হাতে আসবে, সে জানবে না— এই বাগানে শুয়ে আছেন একজন মানুষ, যিনি তার জন্যই জীবনভর লড়েছেন। ভালো লেখা, ভালো ভাবনা আর ভালো মানুষ হওয়ার জন্য।

সমাধী মানে শেষ নয়। দাদাভাইয়ের সমাধী মানে— একটি আন্দোলনের চিহ্ন। একজন মানুষের মৃত্যু নয়, একটি আদর্শের স্থায়ী ঠিকানা।

আজ কচিকাঁচার বাগানে দাঁড়ালে মনে হয়—তিনি আমাদের ছেড়ে যাননি। তিনি শুধু ঘর বদলেছেন। অফিসঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে এসে বসেছেন, গাছের ছায়ায়,
শিশুদের কোলাহলের কাছাকাছি।

যেখানে কচিকাঁচা থাকবে, যেখানে গল্প লেখা হবে, যেখানে নতুন প্রজন্ম স্বপ্ন দেখতে শিখবে—সেখানেই থাকবেন দাদাভাই।

নতুন ভবনের পেছনের সেই নিঃশব্দ জায়গাটা তাই আর শুধু সমাধিক্ষেত্র নয়। ওটা এখন কচিকাঁচার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু,
শিশুসাহিত্যের নীরব প্রহরী।

দাদাভাই,
আপনি কচিকাঁচাকে ছেড়ে যাননি। আপনি কচিকাঁচার মাঝেই থেকে গেছেন। 

লেখক পরিচিতি: আইরীন নিয়াজী মান্না, শিশুসাহিত্যক ও সাংবাদিক। সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম, কিশোর লেখা।