ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১৪:১৫:৩২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
বাজারে সরবরাহ থাকলেও নাগালের বাইরে ইলিশ পাকিস্তানের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু রংপুরে চার খুন, মা-মেয়ের মরদেহে ধর্ষণের আলামত নেই ডলি পার্টন আর নেই, থামল ‘কান্ট্রি কুইনের’ গান ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব রওশন আরা ডিমের বাজারে ফের অস্বস্তি, এক ডজন ১৫০–১৫৫ টাকা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

নারীর অধিকার: সমতার পথ এখনো এত দীর্ঘ কেন

মানিক নূর | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫২ পিএম, ২৫ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একটি মেয়ে জন্ম নেয়। তার জন্মে একসময় পরিবারের কেউ কেউ মুখ কালো করে ফেলত—‘মেয়ে হয়েছে’ বলে। আজ অনেক পরিবারে সেই দৃশ্য বদলেছে। মেয়ের জন্মে আনন্দ হয়, তাকে স্কুলে পাঠানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়, চাকরি করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। মেয়েরা চিকিৎসক হচ্ছে, প্রকৌশলী হচ্ছে, সাংবাদিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, বিজ্ঞানী ও রাজনীতিক হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়—নারী কি সত্যিই তার পূর্ণ অধিকার পেয়েছে?

উত্তরটি সহজ নয়।

কারণ নারীর অধিকার শুধু স্কুলে যাওয়ার অধিকার নয়, চাকরি করার অধিকার নয়, ভোট দেওয়ার অধিকারও নয়। নারীর অধিকার মানে তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার, নিজের উপার্জনের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার, সম্পত্তিতে ন্যায্য অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসার সমান সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি—মানুষ হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার।

অধিকার কাগজে আছে, বাস্তবে কতটা?

আইন নারীকে অনেক অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আইন আর বাস্তব জীবনের মাঝখানে যে দীর্ঘ পথ, সেখানে এখনো অসংখ্য নারী আটকে আছেন।

একজন নারী উচ্চশিক্ষিত হয়েও নিজের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। একজন চাকরিজীবী নারী নিজের বেতন পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে নিজের প্রয়োজনের টাকা চাইতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। একজন গৃহিণী সারাদিন সংসারের কাজ করেও ‘কিছু করেন না’—এই তকমা শুনতে বাধ্য হন।

এখানেই নারীর অধিকারের সবচেয়ে বড় সংকট।

নারীর শ্রমকে আমরা এখনো অনেক সময় শ্রম হিসেবে দেখি না।

সকালে সবার আগে যে নারী ঘুম থেকে ওঠেন, রাতের শেষে সবার পরে যে নারী ঘুমাতে যান, সন্তানকে স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা, রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর গোছানো—এসব যেন তার স্বাভাবিক দায়িত্ব। এর কোনো আর্থিক মূল্য নেই, সামাজিক স্বীকৃতিও খুব সামান্য।

অথচ এই অদৃশ্য শ্রমের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একটি পরিবার।

নিরাপত্তার অধিকার

নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে নিরাপত্তার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাস্তায়, গণপরিবহনে, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, এমনকি নিজের ঘরের ভেতরেও অনেক নারী নিরাপদ নন। যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌতুক এবং নানা ধরনের সামাজিক নিপীড়ন নারীর জীবনকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করে।

একটি মেয়েকে প্রায়ই বলা হয়—

‘সাবধানে চলবে।’

‘রাতে একা বের হবে না।’

‘ওই পোশাক পরবে না।’

‘কারও সঙ্গে বেশি কথা বলবে না।’

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন শুধু নারীকে সাবধান হতে হবে?

একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের দায়িত্ব হওয়া উচিত অপরাধীকে নিয়ন্ত্রণ করা, নারীর স্বাধীনতা নয়।

নারীর পোশাক, চলাফেরা বা জীবনযাপনকে অপরাধের কারণ হিসেবে দেখানো আসলে অপরাধীর দায়কে আড়াল করে।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: অধিকারের অন্যতম চাবিকাঠি

নারীর ক্ষমতায়নের কথা যতই বলা হোক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সেই ক্ষমতায়ন অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

নিজের আয় থাকলে একজন নারী জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারেন। কিন্তু শুধু আয় করাই যথেষ্ট নয়। সেই আয়ের ওপর তার নিজের নিয়ন্ত্রণও থাকতে হবে।

অনেক নারী চাকরি করেন, ব্যবসা করেন, সংসারে অর্থ দেন; কিন্তু নিজের উপার্জনের টাকা কীভাবে ব্যয় হবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের থাকে না।

অন্যদিকে গ্রাম ও শহরের নিম্নআয়ের অসংখ্য নারী ঘরে-বাইরে শ্রম দেন, কিন্তু তাদের শ্রমের প্রকৃত মূল্য সমাজ স্বীকার করে না।

অর্থনৈতিক অধিকার তাই শুধু চাকরি পাওয়ার অধিকার নয়—ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সম্পত্তিতে অধিকার এবং নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতাও এর অংশ।

মেয়ের জন্য এক নিয়ম, ছেলের জন্য আরেক

নারীর অধিকার সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয় অনেক সময় পরিবার থেকেই।

ছেলে রাতে বাড়ি ফিরলে বলা হয়, ‘বড় হয়েছে, নিজের বুঝ আছে।’

মেয়ে একটু দেরি করলে প্রশ্ন ওঠে, ‘এত রাতে বাইরে কেন?’

ছেলের ভুলকে বলা হয় ‘বয়সের দোষ’।

মেয়ের ভুলকে বলা হয় ‘মেয়েদের এমন হওয়া উচিত নয়।’

ছেলেকে বলা হয়, ‘জীবনে নিজের মতো করে বাঁচো।’

মেয়েকে বলা হয়, ‘সংসারের কথা ভাবতে হবে।’

এই দ্বৈত মানসিকতা বদলানো ছাড়া নারী-পুরুষের সমতা সম্ভব নয়।

সমতা মানে ছেলেকে ছোট করা নয়। সমতা মানে মেয়েকে ছোট না করা।

নারীর শরীর, নারীর সিদ্ধান্ত

একজন নারীর শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার নিজের হওয়া উচিত।

কখন বিয়ে করবেন, সন্তান নেবেন কি না, কতজন সন্তান নেবেন, নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবেন—এসব বিষয়ে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

কিন্তু বাস্তবে অনেক নারী নিজের শরীর সম্পর্কেও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সামাজিক চাপ, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং নানা ধরনের কুসংস্কার তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

নারীকে শুধু মা, স্ত্রী, কন্যা কিংবা বোন হিসেবে দেখলে তার ব্যক্তি পরিচয়টি হারিয়ে যায়।

নারী প্রথমত একজন মানুষ।

তার নিজের স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে এবং নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।

শহরের নারী এগোলেও গ্রামে পথ কঠিন

শহরের শিক্ষিত নারীর সামনে সুযোগ বাড়লেও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু নারীর বাস্তবতা এখনো কঠিন।

দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক কুসংস্কার তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আটকে দেয়।

একজন দরিদ্র পরিবারের মেয়ের কাছে উচ্চশিক্ষা অনেক সময় স্বপ্নের মতো।

তার আগে আসে সংসারের কাজ।

তারপর আসে বিয়ের চাপ।

তারপর সন্তান।

তারপর আরেক সন্তান।

একসময় নিজের জন্য যে মেয়েটির অনেক স্বপ্ন ছিল, সে হয়তো বুঝতেই পারে না—কখন নিজের জীবনটা অন্যদের জীবনের আড়ালে হারিয়ে গেল।

অধিকার মানে সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া

নারীর জন্য শুধু আইন করলেই হবে না। আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

মেয়েদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমাতে হবে। নারীর শ্রমের মূল্য দিতে হবে। নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করতে হবে। গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে হবে।

আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।

কারণ নারীর অধিকার শুধু আদালত, সংসদ কিংবা সরকারি নীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় পরিবারের ডাইনিং টেবিলে, স্কুলের শ্রেণিকক্ষে, কর্মক্ষেত্রে, বাসে, রাস্তায় এবং প্রতিদিনের কথাবার্তায়।

একজন বাবা যখন মেয়েকে বলেন, ‘তুমি পারবে’—সেখানেও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

একজন স্বামী যখন স্ত্রীর মতামতকে নিজের মতামতের সমান গুরুত্ব দেন—সেখানেও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

একজন শিক্ষক যখন ছেলে-মেয়েকে সমান সুযোগ দেন—সেখানেও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

শেষ কথা

নারীর অধিকার কোনো দয়া নয়।

এটি কোনো বিশেষ সুবিধাও নয়।

এটি একজন মানুষের জন্মগত মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার।

যে সমাজ নারীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখে, সে সমাজ কখনো পূর্ণ শক্তিতে এগোতে পারে না। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু, উঁচু ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। সেই দেশের নারীরা কতটা নিরাপদ, স্বাধীন, শিক্ষিত, স্বাবলম্বী ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন—উন্নয়নের আসল মানদণ্ডের একটি সেটিও।

তাই নারীর জন্য আলাদা কোনো পৃথিবী দরকার নেই।

দরকার এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মানুষ হওয়ার কারণে নারী তার অধিকার পাবে; নারী হওয়ার কারণে তাকে অধিকার চাইতে হবে না।

সেদিনই হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থে বলতে পারব—সমতার পথে সমাজ শুধু হাঁটছে না, সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে।