ঢাকা, শনিবার ২০, এপ্রিল ২০২৪ ৯:১২:০১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হাসপাতালের কার্ডিয়াক আইসিইউ পুড়ে ছাই, রক্ষা পেল ৭ শিশু সবজির বাজার চড়া, কমেনি মুরগির দাম সারা দেশে তিন দিনের হিট অ্যালার্ট জারি কৃষক লীগ নেতাদের গণভবনের শাক-সবজি উপহার দিলেন প্রধানমন্ত্রী চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি, হিট এলার্ট জারি শিশু হাসপাতালের আগুন সম্পূর্ণ নিভেছে

মনের জোরে বাঁচি: তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিন | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:০৮ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২০২৩ রবিবার

লেখক তসলিমা নাসরিন

লেখক তসলিমা নাসরিন

মনের জোরে তিরিশ বছরের নির্বাসন সামলাচ্ছি। একা সম্পূর্ণ একা। এক দেশ থেকে আরেক দেশ। একা। লেখাই এখন পর্যন্ত একমাত্র উপার্জন। পত্র পত্রিকায় লেখা বন্ধ করে দেওয়া হয়, উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। বই ছাপানো বন্ধ  করে দেওয়া হয়, উপার্জন বন্ধ হয়ে যায়। স্ট্রাগল করি একা। মনের জোরে বাঁচি। নারীবিদ্বেষী নিন্দুকেরা গত চার দশক ধরে কুৎসা আর  অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছে। এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি একা। মনের জোরে। সন্ত্রাসীরা  তিন দশকের বেশি হলো ওত পেতে আছে আমার মুণ্ডু কেটে নেবে বলে। পদে পদে হুমকি। যে কোনও  মুহূর্তে আমার ওপর  ঝাঁপিয়ে পড়বে জঙ্গি আততায়ী। আর কিছু নয়, আমাকে বাঁচিয়ে রাখছে মনোবল। 
মন তো সবল ছিলই। শরীরও ছিল সবল,  ছিল ফিট এবং পারফেক্ট। ছিল সুস্বাস্থ্য। আমার  শরীরের সেই  কাঠামোকে টাকার লোভে ভেঙ্গে দিল অ্যাপোলো ইন্দ্রপ্রস্থের এক ক্রিমিনাল। যে কোনও সময় কোনও এক দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, এবং আমি আর হাঁটতে পারবো না। মাঝে মাঝে ভাবি, আমার যদি এমন কোনও অসুখ হয়, যে অসুখ আমাকে শয্যাশায়ী করে ফেলবে, তাহলে কে আমার পাশে থাকবে? কেউ নয়। যে শহরে আমি বাস করি, সে শহরে আমার কোনও আত্মীয় নেই, স্বজন নেই । কিছু চেনা মানুষ আছে কেবল। তারা হয়তো আমাকে একদিন বা দুদিন দেখতে আসবে। ব্যাস। আমার আত্মীয়দের কেউ কি আমার পাশে থাকবে আমার সেবা করার জন্য বা প্রাণে আমার আরাম দেবার জন্য? না, কেউই থাকবে না। জীবন ভর একা ছিলাম, যতদিন বাঁচি, যে দেশেই বাস করি, আমাকে একাই থাকতে হবে। সে আমি খুব ভালই জানি। 
আমি আত্মহত্যা করার লোক নই। আমি প্রচণ্ড রকম জীবন ভালবাসি। কিন্তু তারপরও বলবো, যদি  মস্তিস্ক সুস্থ না থাকে,  তাহলে সে জীবন জীবন নয়, সেই জীবন যাপন করার কোনও অর্থ হয় না, আমি বরং  মুচলেকা দিয়ে যাবো, ইউদেনেসিয়া, বা স্বেচ্ছা মৃত্যুতে সায় দিয়ে। আর যে-ই বাঁচতে চাক, ভেজেটেবল হয়ে বাঁচার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। যদি মস্তিস্ক সুস্থ থাকে, যদি ভাবতে পারি, লিখতে পড়তে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই বেঁচে থাকতে চাই, সে শরীরের জোরে না হোক, মনের জোরে। এই মনটাকে তাই আমি ভালবাসি। এটি আছে বলেই আমি আছি। এর যদি জোর না থাকতো, কবে কোনকালে আমার মৃত্যু হয়ে যেত। 
এই মনে কেবল যে জোর আছে তা নয়, এই মনের মতো নরম আমি খুব কম মনই দেখেছি। এত নরম যে, যে কারও  দুঃখে  কাঁদে, যে কাউকে বিশ্বাস করে ঠকে, ঠকেও আবার বিশ্বাস করে,  যে কারও অভাব দেখলে সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। নরম মনেও বল থাকে। নরম মনে কি বল বা জোর আসলেই থাকে? নাকি আমি বেঁচে ছিলাম, যেহেতু বেঁচে থাকা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না? আসলে একটা  ব্যাপার বরাবরই ছিল আমার, আমি জানতাম আমি আপাদমস্তক সৎ, আমি জীবনে  কোনও অসততা করিনি, কোনও মিথ্যে বলিনি, বারবার প্রতারিত হয়েছি কিন্তু  কারও সঙ্গে প্রতারণা করিনি। নিজেকে আমি জানি বলে নিজেকে  শ্রদ্ধা করেছি, সম্মান করেছি। চরম দুঃসময়েও এই সম্মান এতটুকু টলে যায়নি। নিজের ওপর বিশ্বাস এতটুকু ম্লান হয়নি। সম্ভবত শিরদাঁড়া সোজা  করে বেঁচে থাকার জন্য, এই সম্মানটি খুবই জরুরি। এই সম্মান আছে বলেই সমাজ আমাকে যতই বঞ্চিত করুক, লাঞ্ছিত করুক, আমার কিছুই যায় আসে না; আঘাতের পর আঘাত আসে, আমাকে ধরাশায়ী করতে পারে না। আমি আমার মতো বেঁচে ছিলাম, আমি আমার মতো বেঁচে থাকি। একা।
 

লেখাটি ফেসবুক থেকে নেওয়া।