ঢাকা, মঙ্গলবার ১৫, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৬:১৮:৫৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: মৃত্যুর খবর যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজতে বাংলাদেশের লামিয়া মওলা এশিয়ান গেমস নারী ফুটবল: বাংলাদেশকে হারাল উত্তর কোরিয়া টানা পাঁচ দিন সারাদেশে বর্ষণের আভাস সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনেই রেমিট্যান্স ১৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস

মহাবিশ্বের রহস্য খুঁজতে বাংলাদেশের লামিয়া মওলা

উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:০৬ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র কয়েকশ কোটি বছরেরও কম, তখন জন্ম নেওয়া গ্যালাক্সির আলো আজ পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে। সেই আলো বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা খুঁজছেন মহাবিশ্বের শুরুর গল্প। আর সেই অনুসন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. লামিয়া আশরাফ মওলা।

ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের উৎক্ষেপণ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার নাম। নাসার নতুন প্রজন্মের এই মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগার ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সির বিবর্তন ও সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে গবেষণায় নতুন তথ্য সংগ্রহ করবে।

তবে রোমান মিশনের গল্পে লামিয়া মওলাকে দেখার বিষয়টি কোনো একক বিজ্ঞানীর নেতৃত্বের গল্প নয়। এই মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছে নাসার বৃহৎ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশল দল। লামিয়া মওলার সঙ্গে রোমান-সংশ্লিষ্ট গবেষণার যোগসূত্র নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে তার আগের আন্তর্জাতিক গবেষণাকাজের সূত্র ধরে।

আর সেখানেই বাংলাদেশের জন্য গল্পটি আলাদা হয়ে যায়।

কারণ তিনি শুধু একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী নন তিনি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী, যার গবেষণার বিষয় পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের একেবারে প্রাচীন সময়।

জেমস ওয়েব থেকে মহাবিশ্বের শৈশব

রোমানকে ঘিরে লামিয়া মওলার পরিচিতি তৈরি হয়নি। এর আগেই জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে করা তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।

২০২৪ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত তার নেতৃত্বাধীন গবেষণায় ফায়ারফ্লাই স্পার্কল নামের একটি অতি প্রাচীন গ্যালাক্সি নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। গ্যালাক্সিটি এমন এক সময়ের, যখন মহাবিশ্বের বয়স ছিল আনুমানিক ৬০০ মিলিয়ন বছর।

গবেষণায় গ্যালাক্সিটির ভেতরে একাধিক কমপ্যাক্ট নক্ষত্রগুচ্ছের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের শুরুর দিকে গ্যালাক্সি কীভাবে গড়ে উঠছিল এবং নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া কীভাবে শুরু হয়েছিল এসব প্রশ্ন নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যায়।

অর্থাৎ লামিয়া মওলার গবেষণার বিষয় কোনো দূরবর্তী কল্পকাহিনি নয়। তার কাজের কেন্দ্রে রয়েছে মহাবিশ্বের ইতিহাসের এমন একটি সময়, যার সরাসরি সাক্ষী হওয়ার সুযোগ মানুষের ছিল না। বিজ্ঞানীরা সেই সময়ের আলো বিশ্লেষণ করেই অতীতের মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করছেন।

রোমানের চোখে আরও বড় মহাবিশ্ব

জেমস ওয়েবের সঙ্গে রোমানের পার্থক্য এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। ওয়েব অত্যন্ত গভীরভাবে নির্দিষ্ট মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে পারে। রোমান বড় আকাশজুড়ে দ্রুত জরিপ চালানোর জন্য তৈরি।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, রোমানের ক্ষেত্রদৃষ্টি হাবল স্পেস টেলিস্কোপের তুলনায় অন্তত ১০০ গুণ বড়। ফলে অল্প সময়ে বিশালসংখ্যক গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

এই তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করবেন। গ্যালাক্সি কীভাবে তৈরি ও পরিবর্তিত হয়েছে এবং সৌরজগতের বাইরে থাকা গ্রহগুলো সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রেও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না। কিন্তু এর মহাকর্ষ দৃশ্যমান বস্তুর ওপর প্রভাব ফেলে। দূরবর্তী গ্যালাক্সির আলো কীভাবে মহাকর্ষের কারণে বাঁকছে, সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন।

অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। রোমানের বড় আকাশ জরিপ এই সম্প্রসারণের ইতিহাস আরও নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করবে।

পৃথিবী থেকে ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে

উৎক্ষেপণের পর রোমান পৃথিবীর সাধারণ কক্ষপথে থাকবে না। এটি যাবে সূর্য-পৃথিবীর দ্বিতীয় ল্যাগ্রাঞ্জ বিন্দু বা এল২ অঞ্চলের দিকে। পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার।

সেখানে পৌঁছানোর পরও সঙ্গে সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু হবে না। কয়েক মাস ধরে চলবে বিভিন্ন পরীক্ষা ও প্রস্তুতি। এরপর শুরু হবে মূল বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম। প্রাথমিকভাবে প্রায় পাঁচ বছরের মিশন পরিকল্পনা করা হয়েছে।

রোমানের বড় আকাশ পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বিজ্ঞানীদের এমন একটি মহাজাগতিক মানচিত্র তৈরিতে সাহায্য করবে, যেখানে অসংখ্য গ্যালাক্সি ও মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের জন্য লামিয়া মওলার গুরুত্ব কোথায়

বিশ্বের বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের অংশগ্রহণ নতুন নয়। কিন্তু মহাকাশের মতো বিশেষায়িত গবেষণাক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশি নারীর আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করা এখনও আলাদা করে নজর কাড়ে।

লামিয়া মওলার কাজের গুরুত্ব এখানেই।

তিনি এমন একটি ক্ষেত্রে কাজ করছেন, যেখানে গবেষণার জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ, বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতা। সেই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের গবেষণার জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।

একজন বাংলাদেশি নারী যখন মহাবিশ্বের প্রথম দিকের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করেন, তখন তার পরিচয় শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বাংলাদেশের মেয়েদের জন্যও এটি একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করে বিজ্ঞান ও গবেষণার সবচেয়ে কঠিন ক্ষেত্রগুলোতেও তাদের জায়গা হতে পারে।

নারীর জন্য গবেষণার পথটা আরও বড় হতে পারে

বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও গবেষণার উচ্চ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। পরিবার, সামাজিক প্রত্যাশা, সুযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা গবেষণার পরিবেশ বিভিন্ন কারণে অনেক নারী দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পথ ধরে এগোতে পারেন না।

লামিয়া মওলার পথচলা সেই জায়গায় অন্য একটি ছবি দেখায়।

তার গবেষণার পরিসর দেশের ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর কাজ প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে। মহাবিশ্বের কোটি কোটি বছর আগের ঘটনাকে বোঝার গবেষণায় একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী অংশ নিচ্ছেন এই পরিচয়ই অনেক তরুণীর জন্য সম্ভাবনার একটি উদাহরণ।

এখানে বিষয়টি শুধু ‘বাংলাদেশি নারী সফল হয়েছেন’ এতটুকু নয়। বরং একজন নারী যে গবেষণার নেতৃত্বস্থানীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে পারেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের করণীয়ও আছে

বিদেশের গবেষণাগারে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের সাফল্য দেশের জন্য গর্বের। কিন্তু সেই সাফল্যকে দেশের গবেষণা সক্ষমতায় রূপ দেওয়াও জরুরি।

মহাকাশ গবেষণা মানেই শুধু দূরবর্তী গ্যালাক্সি নয়। স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশের বন্যা, নদীভাঙন, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বাস্তব সমস্যাও বিশ্লেষণ করা যায়।

তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান গবেষণার সুযোগ, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং তরুণ গবেষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

কারণ লামিয়া মওলার মতো বিজ্ঞানীর সাফল্য আমাদের দেখায় মেধার কোনো সীমানা নেই। কিন্তু সেই মেধাকে ধরে রাখার জন্য একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ দরকার।

মহাকাশের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের একটি পরিচয়

ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের অদৃশ্য অংশের রহস্য খুঁজবে। তার ক্যামেরায় ধরা পড়বে অসংখ্য গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ও মহাজাগতিক ঘটনা।

সেই বিশাল মহাবিশ্বের গবেষণায় একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীর নামও যখন আলোচনায় আসে, তখন বাংলাদেশের জন্য সেটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক সাফল্যের খবর নয়।

এটি মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের মেয়েদের স্বপ্নের পরিসরও মহাবিশ্বের মতো বড় হতে পারে।

একসময় যে মেয়েরা বিজ্ঞান পড়বে কি না, গবেষণা করবে কি না এসব নিয়েই প্রশ্ন উঠত, তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ আজ মহাবিশ্বের জন্মের সময়ের গ্যালাক্সি নিয়ে গবেষণা করছেন।

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ ছোট হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মেধার ঠিকানা যে কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, লামিয়া মওলার গবেষণা তারই একটি উদাহরণ।