ঢাকা, বুধবার ২৬, আগস্ট ২০২৬ ১৮:৫৬:০৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মাদার তেরেসার জন্মদিন আজ বাজারে সরবরাহ থাকলেও নাগালের বাইরে ইলিশ পাকিস্তানের হাসপাতালে এসি বিস্ফোরণ, ১৫ নবজাতকের মৃত্যু ডলি পার্টন আর নেই, থামল ‘কান্ট্রি কুইনের’ গান ভুটানের রাজার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সৌজন্য সাক্ষাৎ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিব রওশন আরা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ

মাদার তেরেসার জন্মদিন আজ

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:৫২ পিএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

মাদার তেরেসা

মাদার তেরেসা

কেউ যখন অসহায় হয়ে ফুটপাতে পড়ে থাকতেন, কেউ যখন রোগ-শোকে একাকী মৃত্যুর অপেক্ষা করতেন, কেউ যখন সমাজের চোখে হয়ে উঠতেন ‘অপ্রয়োজনীয়’—তখন একজন নারী তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। জাতি কী, ধর্ম কী, পরিচয় কী—এসব প্রশ্ন তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠেনি। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল একটাই—সে একজন মানুষ।

কলকাতার অলিগলি, বস্তি আর ফুটপাতের অসহায় মানুষের মধ্যে তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের জীবনের অর্থ। মানুষের ক্ষত পরিষ্কার করেছেন, মৃত্যুপথযাত্রীকে বুকে টেনে নিয়েছেন, অনাথ শিশুকে আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—মানুষের সেবা মানেই সৃষ্টিকর্তার সেবা। মানুষের দুঃখে যিনি খুঁজে পেয়েছিলেন ঈশ্বরকে।

তিনি মাদার তেরেসা। আজ তাঁর ১১৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের স্কোপিয়ে শহরে একটি আলবেনীয় ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম নেন আগনেস গঞ্জা বয়াজু। পরবর্তী জীবনে বিশ্ব তাঁকে চিনেছে ‘মাদার তেরেসা’ নামে।

মাত্র নয় বছর বয়সেই বাবাকে হারান তিনি। বাবার মৃত্যু পরিবারের ওপর নেমে আনে গভীর সংকট। মা দ্রানা বয়াজু সন্তানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে বড় করে তোলেন। ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি আগনেসের গভীর টান তৈরি হয়।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ধর্মীয় জীবন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৮ সালে গৃহত্যাগ করে যোগ দেন ‘সিস্টার্স অব লরেটো’ সম্প্রদায়ে। এরপর তাঁর জীবনের গন্তব্য হয়ে ওঠে ভারত।

কলকাতার রাস্তায় এক অন্য জীবন

ভারতে এসে প্রথমদিকে তিনি শিক্ষকতা করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে কলকাতার দরিদ্র মানুষের জীবন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। শিক্ষিকার নিরাপদ জীবন ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন শহরের দরিদ্র মানুষের কাছে।

বস্তিতে বস্তিতে ঘুরেছেন। অসুস্থ মানুষের পাশে বসেছেন। অনাথ শিশুদের আশ্রয় দিয়েছেন। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে শেষ মুহূর্তে একাকী থাকতে দেননি। মানুষের দুঃখ তাঁকে যেন নিজের দুঃখ করে তুলেছিল।

১৯৪৮ সালে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করেন। এর পরের কয়েক দশকে তাঁর মানবসেবার পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হয়।

১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর মাত্র ১২ জন সদস্য নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মিশনারিজ অব চ্যারিটি। পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

একসময় যে নারী কলকাতার একটি বস্তিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন পরিণত হয় আন্তর্জাতিক মানবসেবার এক বিশাল নেটওয়ার্কে।

ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল মানবতা

মাদার তেরেসার জীবন নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও তাঁর মানবসেবার কাজ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ, মৃত্যুপথযাত্রী ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর কাজের মূল কেন্দ্র।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় প্রকাশ করা যায় না—তা প্রকাশ করতে হয় কাজে। তাই তাঁর কাছে সেবা ছিল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; ছিল জীবনযাপনের পদ্ধতি।

জাতি, বর্ণ কিংবা ধর্মের বিভাজন তাঁর সেবার দরজা বন্ধ করতে পারেনি। যে মানুষটি তাঁর কাছে সাহায্যের জন্য এসেছেন, তাঁর পরিচয়ের চেয়ে তাঁর অসহায়ত্বই ছিল বড়।

বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি

কলকাতার দরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর কাজ ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। মানবসেবার জন্য তিনি পেয়েছেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল শান্তি পুরস্কার। ১৯৭৯ সালে এই পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হয়।

নোবেল পুরস্কারের পাশাপাশি তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্নসহ বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

তাঁর জীবনের স্বীকৃতির তালিকায় ছিল পদ্মশ্রী, নেহরু পুরস্কার, বালজান পুরস্কার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমসহ বিভিন্ন সম্মাননা। তবে পুরস্কার কিংবা খ্যাতি তাঁর কাজের উদ্দেশ্য ছিল না।

তিনি যে মানুষটির পাশে দাঁড়াতেন, সেই মানুষের মুখে একটু স্বস্তি দেখতে পাওয়াই যেন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

শেষ জীবনেও থামেনি সেবার পথ

দীর্ঘ কর্মময় জীবনে মাদার তেরেসার শরীর বারবার অসুস্থ হয়েছে। ১৯৮৩ সালে রোম সফরের সময় তাঁর প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ১৯৮৯ সালে আবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর শরীরে পেসমেকার বসানো হয়। পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়াসহ নানা শারীরিক জটিলতায় তাঁর স্বাস্থ্য আরও ভেঙে পড়ে।

তবু মানুষের সেবা থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিতে পারেননি তিনি। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ১৩ মার্চ মিশনারিজ অব চ্যারিটির প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

এর মাত্র কয়েক মাস পর, ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান মাদার তেরেসা। একজন মানুষ চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন এমন একটি প্রশ্ন, যা আজও পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে— আমরা অসহায় মানুষের জন্য কতটা করতে পারি?

আজও প্রাসঙ্গিক তাঁর জীবন

আজকের পৃথিবী প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়েছে। শহরগুলো আরও বড় হয়েছে, সম্পদ বেড়েছে, মানুষের জীবন অনেক ক্ষেত্রে আরামদায়ক হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা, রোগ আর সামাজিক বৈষম্যও রয়ে গেছে।

এমন পৃথিবীতে মাদার তেরেসার জীবন তাই শুধু একটি অতীতের গল্প নয়। এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বের একটি স্মারক।

তিনি দেখিয়েছিলেন, পৃথিবী বদলে দেওয়ার জন্য সবসময় বড় ক্ষমতা কিংবা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একজন অসহায় মানুষের পাশে বসে তার হাতটি ধরে রাখাও এক ধরনের বিপ্লব।

তাঁর জন্মদিনে তাই সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হতে পারে তাঁর নাম উচ্চারণ করা নয়; বরং আমাদের চারপাশের অসহায় মানুষটির দিকে একবার ফিরে তাকানো।

হয়তো ফুটপাতে বসে থাকা বৃদ্ধটি একটু খাবার চান। হয়তো হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কাউকে প্রয়োজন। হয়তো কোনো অনাথ শিশুর শুধু একটি নিরাপদ আশ্রয় দরকার। আর হয়তো আমাদের সামান্য মানবিকতাই কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে পুরো পৃথিবী।

মাদার তেরেসার জীবন সেই সহজ সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়— মানুষের জন্য ভালোবাসা কখনো ছোট কাজ নয়। একটি মানুষের কষ্ট লাঘব করাও পৃথিবীকে একটু বেশি মানবিক করে তোলে।