ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৬, মার্চ ২০২৬ ১৫:৩২:৩২ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
চট্টলা এক্সপ্রেসে অগ্নিকাণ্ড: আড়াই ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক সীতাকুণ্ডে ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেসে আগুন দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবি: নিহত বেড়ে ২৩ বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা সংস্কারের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বধ্যভূমি মহান স্বাধীনতা দিবস আজ

অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল: ‘হিট অ্যান্ড রান’

রাতুল মাঝি | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:৩৭ পিএম, ২৬ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ফাইল ছবি।

ফাইল ছবি।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা হামলা জোরদার হলেও রাজধানী ঢাকা তখনও কার্যত পাকবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পরিস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক’ দেখাতে পাকিস্তান সরকার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এ অবস্থায় বিদেশি প্রতিনিধি দল—বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ সংশ্লিষ্টরা—ঢাকায় এসে অবস্থান নেবে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ। এই সফরকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা করা হয় এক দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযান।

পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি:
মেজর খালেদ মোশাররফ-এর নেতৃত্বে কে-ফোর্সের বিশেষ ইউনিট ক্র্যাক প্লাটুন থেকে বাছাই করা ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নেতৃত্বে ছিলেন বীর প্রতীক হাবিবুল আলম। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—ঢাকা নিরাপদ নয়, এখানে যুদ্ধ চলছে—এটি বিদেশিদের সামনে প্রমাণ করা।

ভারী অস্ত্র নয়, প্রত্যেকের হাতে ছিল কয়েকটি গ্রেনেড ও হালকা অস্ত্র। ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল—দ্রুত আঘাত, দ্রুত সরে পড়া—এই ছিল মূল পরিকল্পনা।

কে ফোর্সের প্রথম এই অপারেশনে দলে ছিলেন এফএফ আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন, মাহমুদ আহমেদ (শহীদ), শ্যামল ভাষণ, আনোয়ার রহমান, মোফাজ্জেল হোসেন মায়া, ফাতেহ আলী চৌধুরী, আবু সাইদ খান, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ, গাজী গোলাম দস্তগীর, তারেক এম.আর চৌধুরী, নাজিবুল হক, রেজা, আব্দুস সামাদ, জুয়েল, জাব্বার, ইফতেখার এবং হাবিবুল। অপারেশনের নাম দেওয়া হলো ‘অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল – হিট অ্যান্ড রান’।

ঢাকায় অনুপ্রবেশ:
কুমিল্লা সীমান্ত পেরিয়ে নৌকা, পায়ে হেঁটে এবং গ্রামীণ পথ ধরে গোপনে ঢাকায় প্রবেশ করে ১৭ জনের দলটি। অস্ত্র বলতে প্রত্যেকের কাছে ৫টি করে গ্রেনেড আর একটি করে বেয়নেট। এই দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে সর্বাধুনিক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সঙ্গে আছে সব মিলিয়ে ১৬০ পাকিস্তানি রুপী। এই দিয়েই চলতে হবে পুরো দলকে। ৩ জুন রওনা দিয়ে কখনো নৌকা, কখনো ধানের ক্ষেত, কখনো বিরানভূমি পার করে ঢাকায় ঢোকে মুক্তিযোদ্ধারা।
কয়েকদিন ধরে হোটেল এলাকা রেকি করে তারা। অপারেশনের জন্য একটি গাড়ি প্রয়োজন হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে একটি গাড়ি জোগাড় করা হয় ৭ জুন।

৯ জুন: দুঃসাহসিক হামলা:
নির্ধারিত দিনে গেরিলারা হোটেলের আশপাশে অবস্থান নেয়। পরিকল্পনা ছিল বাইরে থেকে গ্রেনেড হামলা করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে তারা আরও এগিয়ে যায়—হোটেলের প্রবেশমুখ ও বিদেশি প্রতিনিধিদের গাড়ি লক্ষ্য করে সরাসরি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

হঠাৎ বিস্ফোরণ ও গুলিতে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও এই আঘাতে পাকিস্তানি বাহিনী হতভম্ব হয়ে পড়ে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হোটেলের ভেতরে থাকা বিদেশি কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের মধ্যেও।

‘হিট অ্যান্ড রান’—সফল প্রত্যাবর্তন:
আক্রমণের পরপরই গেরিলারা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। পুরো অভিযানটি কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়। পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই তারা নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
এই হামলার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিদেশি প্রতিনিধি দল সরাসরি বুঝতে পারে—ঢাকা মোটেই শান্ত নয়, বরং পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানের ‘সবকিছু নিয়ন্ত্রণে’ থাকার প্রচার ভেঙে পড়ে।

মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত:
এই অভিযানের পর পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। রাজধানীর মতো সুরক্ষিত এলাকাতেও গেরিলা হামলা সম্ভব—এই উপলব্ধি তাদের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ে সাহস ও প্রতিরোধের প্রেরণা।

ইতিহাসে স্থান:
‘অপারেশন ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ ছিল শহুরে গেরিলা যুদ্ধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সীমিত অস্ত্র, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং সাহসিকতার সমন্বয়ে পরিচালিত এই ‘হিট অ্যান্ড রান’ অভিযান প্রমাণ করে—সংগঠিত প্রতিরোধ থাকলে শক্তিশালী শত্রুকেও চ্যালেঞ্জ করা যায়।

এই অপারেশন শুধু একটি হামলা নয়—এটি ছিল এক বার্তা: বাংলাদেশে যুদ্ধ চলছে, এবং বাঙালি লড়ছে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত।