ঢাকা, সোমবার ১৬, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৪:৩৮:৫১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
রমজান মাসে স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ রমজান মাসে স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ চার দিনের ছুটি শেষে ঢাকামুখী মানুষ ৩৫–৪৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি বিএনপির মন্ত্রীদের শপথ পড়াবেন প্রেসিডেন্ট

কারখানায় সংগ্রাম: গার্মেন্টসকন্যাদের গল্প

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫০ এএম, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রবিবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

রাজধানীসহ দেশের বড় শিল্প নগরী, বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের গার্মেন্টস জোনে হাজার হাজার নারী প্রতিদিন ভোরে ঘুমের আগুন ভেঙে কাজে যায়। শ্রমিকদের পোশাক উৎপাদনের সেই মেশিনের গর্জন, কাটা, সেলাই—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে দেশের অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি। কিন্তু সেই শিল্পের ভেতর এক অন্য জগৎ আছে, যেখানে নারীরা লড়াই করছেন জীবন ও স্বাধীনতার জন্য।

গার্মেন্টস কারখানার হালকা আলো, কাটা কাপড়, সেলাই মেশিনের শব্দের মাঝেই তারা দাঁড়িয়ে থাকে, প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর সংগ্রাম। এই মেয়েরা শুধু গার্মেন্ট উৎপাদন করছে না, তারা এক সাথে পরিবারের দায়িত্ব বহন করছে, স্বপ্ন বুনছে এবং প্রতিদিনের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে।

দৈনন্দিন জীবন: শারমিন, বয়স ২১, নারায়ণগঞ্জ: “আমি ভোর ৫টায় ওঠি। ছোট্ট ঘর থেকে বের হয়ে রিকশা ধরে কারখানায় যাই। ৮ ঘণ্টা, কখনো ১০–১২ ঘণ্টা বসে সেলাই করতে হয়। পায়ে ব্যথা, চোখে ক্লান্তি—সব নিয়েই আমি কাজ করি। কিন্তু এই কাজ না করলে পরিবার চলে না।”

শারমিনের মতো হাজার হাজার নারী প্রতিদিন একই সংগ্রাম করেন। তারা প্রাত্যহিক আয়ের সঙ্গে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, পরিবারকে খাওয়ানো, ভাড়া দেয়া—সব কাজ সামলান।

মিমি, বয়স ১৯, গাজীপুর: “কারখানার ভেতরে আমাদের কণ্ঠ নেই। বসে বসে, মেশিনের শব্দে দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটে। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ি না। কারণ আমাদের স্বপ্ন আছে—ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা, নিজের বাড়ি বানানো, নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজানো।”

চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি: শারীরিক ও মানসিক চাপ, দীর্ঘ সময় বসে কাজ, পায়ের ব্যথা, চোখে ক্লান্তি। চাপের মধ্যে কাজ করার জন্য নারীরা প্রায়ই মানসিক চাপ অনুভব করেন।

স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: মেশিনে হাত কাটা, ধুলিকণা, পোশাকের রাসায়নিক ক্ষতি- এসব ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এছাড়াও কারখানার অগ্নি নিরাপত্তা অনেক সময় নেই।

নিম্ন মজুরি ও আর্থিক নির্ভরতা: শ্রমিকরা কম বেতনে কঠিন শ্রম করছে। অতিরিক্ত সময়ের কাজ বা ওভারটাইমে অতিরিক্ত চাপ।

সামাজিক ও পারিবারিক দায়বদ্ধতা: শিশুদের দেখাশোনা, পরিবারের জন্য দায়িত্ব। অনেক সময় রাতে ঘুমের অভাব, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ।

এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলার নাজমা বেগম (২৪) বলেন, “আমরা মেয়েরা জানি, আমাদের হাতের কাজই আমাদের স্বপ্নের চাবিকাঠি। আমরা স্বাবলম্বী হতে চাই। কারখানার মেশিনের শব্দ যতই চাপ দিক, আমাদের চোখে স্বপ্নের আলো জ্বলতে থাকে।”

তিনি বলেন, গারমেন্ট খাতে নারীরা শুধু অর্থ উপার্জন করছেন না, তারা পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করছেন।

শিল্প বিশ্লেষক তানভীর হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের রপ্তানি আয় মূলত গার্মেন্ট সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পে নারীরা মজবুত শ্রমিক শক্তি হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। তবে তাদের কল্যাণ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।”

সমাধান ও সুপারিশ: কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন করা জরুরী। নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। যথাযথ অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুবিধা: নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চোখের ও পায়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা জরুরী।

বেতন ও ওভারটাইম নীতি: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং ওভারটাইমের জন্য সঠিক মূল্য প্রদান করা দরকার।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: নারীদের জন্য কারিগরি ও শিক্ষা প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরী। সন্তানদের স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি করা দরকার।

সামাজিক সচেতনতা: গার্মেন্টস শ্রমিকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা।গার্মেন্টস শিল্পে নারীরা শুধু পোশাক তৈরি করছেন না, তারা দেশের অর্থনীতি, পরিবারের জীবন এবং স্বপ্নের ধারক। তাদের সংগ্রাম, সাহস এবং শ্রমই আজ দেশের পোশাক খাতকে শক্তিশালী করেছে।

শারমিন বলেন, “আমরা ক্লান্ত, আমরা ব্যথা পাই, কিন্তু আমরা হাল ছাড়ি না। আমাদের স্বপ্ন আমাদের শক্তি। আমরা চাই শুধু সম্মান, নিরাপত্তা এবং স্বাবলম্বিতা।”

এই নারীরা প্রতিদিন যে সংগ্রাম করছেন, তা কেবল কারখানার দেয়ালেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি সমাজের প্রতি আহ্বান, যে তাদের শ্রম ও জীবনকে মর্যাদা দিতে হবে।