ঢাকা, মঙ্গলবার ০৩, মার্চ ২০২৬ ৪:৫৫:৪২ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় আহত খামেনির স্ত্রীও মারা গেলেন ঈদযাত্রায় ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু আজ সকাল থেকে বাংলাদেশের ‘মিশন অস্ট্রেলিয়া’ শুরু আজ সন্ধ্যায় একুশে বইমেলা: পঞ্চম দিনেও ফাঁকা, হতাশ বিক্রেতারা মধ্যপ্রাচ্য হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, আহত ৭

জলাভূমিতে ফিরছে খঞ্জনা পাখি, বাড়ছে প্রকৃতির রঙ

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১৬ এএম, ৩ মার্চ ২০২৬ মঙ্গলবার

খঞ্জনা পাখি

খঞ্জনা পাখি

শীতের শেষভাগ ও বসন্তের শুরুতেই দেশের বিভিন্ন জলাভূমি, ধানক্ষেত আর নদীর ধারে আবার চোখে পড়তে শুরু করেছে খঞ্জনা পাখি। লম্বা লেজ নেড়ে নেড়ে হেঁটে চলা এই ছোট্ট পাখিটি প্রকৃতিতে যেন বাড়তি প্রাণ যোগ করছে। পাখিপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে খঞ্জনা মানেই পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর জীববৈচিত্র্যের প্রতীক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের খাল-বিল, পুকুরপাড়, ধানখেত ও নদীতীরে দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে খঞ্জনা পাখি। কখনো মাটিতে ছোট ছোট পোকা খুঁজে নেয়, কখনো ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বসে কাছের ঝোপঝাড়ে।

খঞ্জনা নানা নামে পরিচিত যেমন, খঞ্জন, সাদা খঞ্জন, ধলা খঞ্জন, মোহক, ধোবিন, লেজ নাড়া। স্ত্রী পাখিদের খঞ্জনিকা বলা হয়। এর ইংরেজী নাম Wagtail আর genus Motacilla। এরা লম্বা লেজবিশিষ্ট চড়ুই আকারে পাখি। দৈর্ঘে প্রায় ১৮-১৯ সে.মি.। এদের বাইরের বাইরের পালক সাদা।মাথার উপরের দিকে কালো, পিঠ ছাই বর্ণ ,চোখ, ঠোঁট, পা এবং গলার নিচ থেকে বুকের দিকটা অনেকটা ইউ শেপের মত করে কালো, মুখ এবং বুকের নিচের বাকি অংশ সাদা ও লেজ কালো। 

এরা বীজ, পোকামাকর, ক্ষুদ্র শামুক, কেচোঁ ইত্যাদি খায়। এসব পাখি দ্রুত হাঁটে ও দৌড়ায় আর শিকার ধরতে ছুটে চলে। এরা কাক-শালক প্রভৃতি পাখির মত সোজাসুজি উড়তে পারেনা ঢেউ এর মত উচুনিচু হয়ে উড়ে বেড়ায়। 

খঞ্জনা সর্বক্ষণ লেজ নাড়ে আর কিচ কিচ করে ডাকে। নদীনালার কাছে ও আর্দ্র তৃণভূমির কাছে এরা বসবাস করে। এরা ঘাস, শিকড় দিয়ে বাসা বানায় আর তাতে চুল-পালকের আস্তর থাকে। এদের প্রজনন সময়- মে-জুলাই মাস। ডিম পাড়ে ৪/৬ টি, রং হলুদ দাগসহ নীলচে সাদা বা বাদামী। 

সারা পৃথিবীতে খঞ্জনার প্রজাতি সংখ্যা ১২ টি, বাংলাদেশে ৬টি প্রজাতি দেখা যায় তার মধ্যে ১টি স্থায়ী আর বাকিরা পরিযায়ী। বাংলাদেশে যাদের দেখা যায় এরা হলো-পাকরা খঞ্জন, বন খঞ্জন, সাদা খঞ্জন, ধলা খঞ্জন, হলুদ খঞ্জন ও মোহক। 

পরিবেশের সংকেতবাহক

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খঞ্জনা পাখির উপস্থিতি পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এরা মূলত পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। ফলে যেখানে খঞ্জনা দেখা যায়, সেখানে সাধারণত পানি ও মাটির দূষণ তুলনামূলক কম থাকে।

ঢাকার বাইরে এক জলাভূমিতে পাখি পর্যবেক্ষণ করতে আসা একজন প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, “আগে নিয়মিত খঞ্জনা দেখতাম। মাঝখানে কমে গিয়েছিল। এবার আবার চোখে পড়ছে, এটা ভালো লক্ষণ।”

বসন্তে বাড়ে আনাগোনা

প্রকৃতিবিদদের মতে, শীত শেষে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে খঞ্জনা পাখির আনাগোনা বাড়ে। এ সময় মাঠে পোকামাকড়ের সংখ্যাও বাড়ে, যা তাদের খাদ্য জোগায়। ফলে ধানক্ষেত ও পানির ধারে বেশি দেখা যায় এদের।

মানুষের আগ্রহ বাড়ছে

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খঞ্জনা পাখির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক তরুণ প্রকৃতিপ্রেমী ক্যামেরা হাতে মাঠে-ঘাটে ছুটছেন এই পাখির ছবি তুলতে।
আলোকচিত্রী রাজা আহসান বলেন, “খঞ্জনার লেজ নেড়ে হাঁটার ভঙ্গিটা খুব আকর্ষণীয়। সহজে ধরা পড়ে না, কিন্তু ধৈর্য ধরে তাকালে দারুণ দৃশ্য দেখা যায়।”

হুমকিতে আবাসস্থল

তবে খঞ্জনা পাখির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলাভূমি ভরাট, কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নির্বিচারে গাছপালা কাটা। এসব কারণে তাদের খাদ্য ও আশ্রয়স্থল কমে যাচ্ছে।

পরিবেশকর্মী আবদুল মান্নান বলেন, “খঞ্জনা পাখি টিকিয়ে রাখতে হলে জলাভূমি রক্ষা করতে হবে। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারও কমাতে হবে।”

প্রকৃতির ছোট দূত

খঞ্জনা পাখি আকারে ছোট হলেও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা বড়। পোকামাকড় খেয়ে ফসলের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে, আবার তার উপস্থিতি জানান দেয় পরিবেশের সুস্থতার কথা।

সব মিলিয়ে, জলাভূমি আর মাঠঘাটে খঞ্জনা পাখির ফিরে আসা প্রকৃতির জন্য এক শুভসংবাদ। এই ছোট্ট পাখিটির টিকে থাকা মানেই আমাদের চারপাশের প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি—এটাই আশার কথা।

লেখক: পাখি পর্যবেক্ষক, আহবায়ক-বাংলাদেশ বার্ড ওয়াচার সোসাইটি