ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১২, মার্চ ২০২৬ ১৯:৩৯:৪৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
খালেদা জিয়াসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব মতিঝিলে ইফতার বাজার, অফিস শেষে ক্রেতার ভিড়ে মুখরিত মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে ১১০০-র বেশি শিশু হতাহত: ইউনিসেফ সংসদ অধিবেশনে ইউনূস–জুবায়দা-জাইমাসহ অংশ নিলেন যারা দুই দফা বৃদ্ধি পর স্বর্ণের দাম কমল, ২ লাখ ৬৭ হাজার ১০৬ টাকা শপথ নিলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশে আবারও সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হলো: প্রধানমন্ত্রী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু

নাগরিক সাংবাদিকতা: ধারণা, প্রয়োজন ও সম্ভাবনা

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৫:৪০ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সংবাদ পরিবেশনের জগতে এক বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের দায়িত্ব ছিল মূলত পেশাদার সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের হাতে। কিন্তু ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের কারণে এখন সাধারণ মানুষও খবর সংগ্রহ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় নাগরিক সাংবাদিকতা।

নাগরিক সাংবাদিকতা কী

নাগরিক সাংবাদিকতা (Citizen Journalism) বলতে বোঝায়—সাধারণ মানুষ বা নাগরিকদের মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য প্রদান, ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এখানে সংবাদ তৈরির কাজে পেশাদার সাংবাদিক নন, বরং সাধারণ মানুষই প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো ঘটনা ঘটার সময় সেখানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি যদি মোবাইলে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন বা কোনো সংবাদমাধ্যমে পাঠান, তাহলে সেটিই নাগরিক সাংবাদিকতার একটি উদাহরণ।

নাগরিক সাংবাদিকতার সংজ্ঞা

নাগরিক সাংবাদিকতা সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ভিন্নভাবে সংজ্ঞা দিয়েছেন। সাধারণভাবে বলা যায়—

“নাগরিক সাংবাদিকতা হলো এমন এক ধরনের সাংবাদিকতাকে যেখানে সাধারণ মানুষ তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।”

আরও একটি প্রচলিত সংজ্ঞা হলো—
“যখন সাধারণ নাগরিক কোনো ঘটনা সম্পর্কে তথ্য, ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে তা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন, তখন তাকে নাগরিক সাংবাদিকতা বলা হয়।”

নাগরিক সাংবাদিকতার উৎপত্তি

নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণা পুরোপুরি নতুন নয়। অতীতে অনেক সময় সাধারণ মানুষ সংবাদমাধ্যমকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতেন। তবে আধুনিক অর্থে নাগরিক সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে মূলত ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পর।

২০০০ সালের পর স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ফলে সাধারণ মানুষ সহজেই তথ্য প্রকাশ করতে পারছেন। ফলে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একটি নতুন ধারা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে বড় কোনো দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাজনৈতিক ঘটনার সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও ভিডিও প্রথমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

নাগরিক সাংবাদিকতার প্রয়োজন কেন

নাগরিক সাংবাদিকতা আজকের বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।

১. দ্রুত তথ্যপ্রাপ্তি
কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত মানুষই প্রথম তথ্য দিতে পারেন। ফলে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

২. প্রত্যন্ত এলাকার খবর পাওয়া
অনেক সময় দূরবর্তী বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি কম থাকে। তখন সেখানকার সাধারণ মানুষ তথ্য দিলে সেই এলাকার খবরও সামনে আসে।

৩. গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
নাগরিক সাংবাদিকতা মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ বাড়ায়। এতে সমাজের নানা সমস্যা ও বাস্তবতা সহজে তুলে ধরা সম্ভব হয়।

৪. ক্ষমতার জবাবদিহিতা
সাধারণ মানুষ যখন কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন, তখন তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং জবাবদিহিতা তৈরি হয়।

নাগরিক সাংবাদিকতার বৈশিষ্ট্য

নাগরিক সাংবাদিকতার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—

এটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণমূলক সাংবাদিকতা

তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে

মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল

অনেক সময় ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়

এটি পেশাদার সাংবাদিকতার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে

নাগরিক সাংবাদিকতার উদাহরণ

বিশ্বের বিভিন্ন বড় ঘটনার সময় নাগরিক সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা গেছে। দুর্ঘটনা, বন্যা, ভূমিকম্প, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা সামাজিক কোনো অনিয়মের ঘটনা অনেক সময় প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাগরিক সাংবাদিকতার ব্যবহার বেড়েছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ ট্রাফিক সমস্যা, পরিবেশ দূষণ, রাস্তার ভাঙন, দুর্নীতি বা সামাজিক অন্যায়ের ঘটনা ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। পরে তা মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়।

নাগরিক সাংবাদিকতার সুবিধা

নাগরিক সাংবাদিকতার বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।

দ্রুত সংবাদ পাওয়া যায়

সমাজের নানা সমস্যা সহজে প্রকাশ পায়

সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ বাড়ে

গণতান্ত্রিক পরিবেশ শক্তিশালী হয়

সংবাদমাধ্যম নতুন তথ্যসূত্র পায়

নাগরিক সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা

তবে নাগরিক সাংবাদিকতার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

তথ্যের সত্যতা
সব সময় নাগরিকদের দেওয়া তথ্য যাচাই করা হয় না। ফলে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

পেশাগত মানের অভাব
পেশাদার সাংবাদিকদের মতো প্রশিক্ষণ না থাকায় অনেক সময় তথ্য উপস্থাপনায় ভুল হতে পারে।

গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য ছড়ানোর কারণে কখনও কখনও গুজবও ছড়িয়ে পড়ে।

নাগরিক সাংবাদিকতা ও মূলধারার সাংবাদিকতা

নাগরিক সাংবাদিকতা মূলধারার সাংবাদিকতার বিকল্প নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পেশাদার সাংবাদিকরা নাগরিকদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে তা সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করতে পারেন। এতে সংবাদ আরও সমৃদ্ধ হয়।

বর্তমানে অনেক সংবাদমাধ্যমই নাগরিকদের পাঠানো ছবি, ভিডিও বা তথ্য গ্রহণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছে।

নাগরিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করা হয়। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার মানুষকে তথ্যের উৎসে পরিণত করেছে। ভবিষ্যতে এই ধারা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তবে এর জন্য প্রয়োজন তথ্য যাচাই, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীলতা। নাগরিকদের সচেতনভাবে তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমকেও তা যাচাই করে প্রকাশ করতে হবে।

উপসংহার

নাগরিক সাংবাদিকতা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। এটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠকে আরও শক্তিশালী করে এবং সমাজের নানা ঘটনা দ্রুত সামনে নিয়ে আসে। তবে এর ইতিবাচক দিক বজায় রাখতে হলে দায়িত্বশীল ব্যবহার ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে নাগরিক সাংবাদিকতা গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী ও গণমুখী করে তুলতে পারে।

আইরীন নিয়াজী মান্না: সিনিয়র সাংবাদিক। সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম।