ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৯, জানুয়ারি ২০২৬ ৭:০৮:০৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সারা দেশে অবাধে শিকার ও বিক্রি হচ্ছে শীতের পাখি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ নিবন্ধন নারী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ দফা সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ ইরানের পরিস্থিতি খারাপ হলে কঠোর হবে তুরস্ক

নারীর মুক্তি কীসে?

সজীব সরকার

প্রকাশিত : ০৫:৪২ এএম, ১২ নভেম্বর ২০১৩ মঙ্গলবার

সজীব সরকার

সজীব সরকার

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম একটি ভাবনা হলো নারীর মুক্তির ভাবনা৷ নারীবাদী আন্দোলন শুরুর পর গত কয়েক দশকে ‘নারীর মুক্তি’ এখনকার অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে৷ কিন্তু নারীর মুক্তি আসলে কীসের মুক্তি? কে দেবে এ মুক্তি? কীভাবে বা কীসে মিলবে এ মুক্তি? – এসব প্রশ্নের উত্তর আজও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন৷

একাডেমিশিয়ানদের দৃষ্টিভঙ্গির সমাজতত্ত্ব বিশেস্নষণ করলে দেখা যাবে, নারীর মুক্তি বলতে এখানে মূলত নারীকে পুরুষের অধীনতা থেকে বের করে নিয়ে আসার ওপর জোর হয়৷ অ্যাকাডেমিক তত্ত্ব ও মাঠ পর্যায়ে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বলে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব ৰেত্রে নারীকে স্বাধীনতা দিতে হবে; এসব ক্ষেত্রে নারীর ভাবনাকে পুরম্নষের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেয়া যাবে না৷ অর্থনীতি, রাজনীতি, শিৰাসহ নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে পুরম্নষের কোনো অযাচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বা প্রভাব থাকবে না৷ কিন্তু এমনটি নিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে যা যা দরকার তা হলো নিজের মন ও শরীরের ওপর নারীর পরিপূর্ণ অধিককারের স্বীকৃতি; বিশেষ করে বাংলাদেশে নারীরা পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র তো দূরে থাক – নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে পর্যন্ত নিজেদের মতামত বা পছন্দ প্রকাশ করতে পারে না৷ এমন একটি অবস্থায় বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নারীর মুক্তির কথা না ভেবে আগে বরং নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে তার পছন্দ-অপছন্দ তথা অধিকার প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করা বেশি জরম্নরি৷

আমাদের দেশের মেয়েদের জীবন একান্তই পুরুষ-নির্ভর; এই ‘পুরুষ’ চরিত্রেরা কখনো তার বাবা, কখনো ভাই, কখনো প্রেমিক বা স্বামী এবং কখনো তার ছেলে (সন্তান) হিসেবে নারীদের জীবনের সবকিছু নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে৷ কী খাবে আর কী খাবে না, কী পরবে কী পরবে না, কোথায় যাবে আর কোথায় যাবে না, ঘর থেকে বেরোবে কি বেরোবে না – এই ধরনের যাবতীয় ছোট-খাট কিন্তু জরুরি বিষয়গুলো সবসময় পুরুষেরা নির্ধারণ করে দেয়৷ এমনকি নারীর সারা জীবনের সবচেয়ে গুরম্নত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোও – যেমন: কাকে বিয়ে করবে আর কাকে করবে না – এটিতেও নারীর কথা বলার কোনো সুযোগ নেই৷ সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, একটি সন্তান একজন নারীকেই তার শরীরে ধারণ করতে হয় অথচ এখানেও নারীর কোনো মত প্রকাশের সুযোগ থাকে না – সন্তান কখন নেবে বা নেবে না কিংবা কয়টি নেবে বা আদৌ নেবে কিনা৷ অর্থাত্‍ একজন নারীর তার নিজের ওপরই কোনো অধিকার নেই : না মনের ওপর আর না দেহের ওপর!

এই যেখানে বাস্তবতা, সেখানে ‘নারীর মুক্তি’ কথাটির একটি মানানসই ব্যাখ্যা আগে দাঁড় করানো দরকার৷ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এর সর্বজনীন একটি ব্যাখ্যা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু বিদ্যমান সমাজ-বাস্তবতার নিরীখে প্রতিটি সমাজে নারীর মুক্তির বাস্তবসম্মত অর্থ আগে তৈরি ও তা বাসত্মবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে৷ এ জন্য একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের পরই কেবল আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে৷ আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীর সব দেশে নারীদের পিছিয়ে থাকা বা এগিয়ে যাওয়ার চিত্র বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রত্যাশার ধরন এক ও অভিন্ন নয়৷ তাই বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের বিপরীতে স্থানিক পর্যালোচনা ও এর পরই কেবল আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিজেদের তুলনা করাই যুক্তিযুক্ত হবে৷ না হলে হিতের বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না৷

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর মুক্তি বলতে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র – সব পর্যায়ে নারীর মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ ও অধিকারের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার৷ আর এসব বিষয়ে কাঙ্গিত পরিবর্তন আনতে হলে সমাজ কিংবা দেশ বদলানোর মতো ভারি কাজ কাঁধে তুলে নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই; এজন্যে শুধু নিজের মনোভাবের পরিবর্তন দরকার৷ প্রতিটি ব্যক্তি যদি শুধু নিজেকে নারী-পুরুষ ইস্যুতে মার্জিত, ভারসাম্যপূর্ণ, সহনশীল, সহানুভূতিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও যৌক্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে আর সংঘবদ্ধ সমাজ বিপ্লবের মতো কষ্টসাধ্য কর্মবিপ্লবের কোনো প্রয়োজন পড়ে না৷ অনেকের মধ্যেই জেন্ডার ইস্যুতে ইতিবাচক ও সহনশীল মনোভাব তৈরি ও প্রকাশের চেষ্টা রয়েছে, কিন্তু কর্মকান্ডের প্রতিফলন দেখা যায় খুব কমই৷ এর একটি বড় কারণ হতে পারে, জেন্ডার ইস্যু মানুষের মনোজগতে একটি একাডেমিক বিষয় হিসেবে চিত্রিত হয়ে গেছে৷ এই ইস্যুতে আন্দোলন-বিপ্লবের ধরন এজন্যে অনেকটাই দায়ী৷ আর এই ইস্যুতে কথা বলার চরিত্রে তাই প্রথাগত পুঁথিগত বিদ্যা-শিক্ষার ওপর নিশ্চিত নির্ভার হয়ে বসে থাকলে এ অবস্থার কোনো পরিবর্তন সত্যিকার অর্থে হবে না আর হলেও তা টেকসই হবে না৷ তাই সামষ্টিক আকারে শুধু পুস্তক-নির্ভর কর্মপরিকল্পনা ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি পরিবারে প্রতিটি সদস্যের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করা জরুরি যে, জেন্ডার-ভারসাম্য বা জেন্ডার-সমতা মানে পুরুষ-বিদ্বেষ কিংবা পুরুষ-বিরোধিতা নয়৷ জেন্ডার ইস্যু শুধু নারীর কোনো বিষয় নয় – নারী-পুরুষ উভয়েই এর আলোচ্য ও বিবেচ্য৷ আর এর সঙ্গে প্রথাগত সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধেরও কোনো বিরোধ নেই৷ এই বোধ জাগ্রত করা গেলে প্রতিটি ব্যক্তিই এই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে এবং শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখা বা সভা-সেমিনারে বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সত্যিকার অর্থেই এই সমতা অর্জনে আন্তরিক হয়ে উঠবে৷ এতে আর জেন্ডার-সেনসিটিভ হতে গিয়ে কেউ পুরুষ-বিদ্বেষীও হয়ে উঠবে না আর সামাজিক বা ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী মনে করে কেউ জেন্ডার-সমতার পক্ষে আন্দোলনের পথে বাধাও হয়ে দাঁড়াবে না৷

অর্থাত্‍ নারীর মুক্তি নিশ্চিত করতে আন্দোলন করার আগে আসলে নারীর মুক্তির ‘মানে’টুকু নির্ভুলভাবে বোঝা এবং কীসে মিলবে সেই মুক্তি – সেই লক্ষে নির্ভুল ও উপযুক্ত কর্মপন্থা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি৷

লেখক: সজীব সরকার; স্টেট ইউনির্ভাসিটি অব বাংলাদেশ-এর জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক এবং গবেষক৷

mail : [email protected]