ঢাকা, বুধবার ১৪, অক্টোবর ২০২৬ ৪:২৯:২১ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই মারা গেলেন জিম্বাবুয়ের সাবেক ক্রিকেটার মিষ্টির শূন্য আসনে চোখ তাদের, কাকে বেছে নেবে বিএনপি? সচিবের দায়িত্বে ৩ নারী হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূত আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ, ক্ষোভ মুসলিমদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক লাখ ছাড়াল

পানছড়ির মাসিনু মারমার গল্পগাথা

নিজস্ব প্রতিবেদক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৯:৪৩ এএম, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

খাগড়াছড়ির পানছড়ির প্রত্যন্ত কংচাইরীপাড়া থেকে উঠে আসা মাসিনু মারমা। চার বোনের মধ্যে সবার ছোট। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার। এলাকায় ফুটবল খেলতেন বান্ধবীদের সঙ্গে। পারিবারিক অর্থ সংকটের কারণে এইচএসসি পাসের পরপরই জীবিকার তাগিদে যোগ দেন বাংলাদেশ আনসার বাহিনীতে। এরপর বদলে যায় তার খেলোয়াড়ি জীবনের গল্প। জুডো হয়ে উঠে তার আরাধ্য। নিজের জীবন-সংগ্রাম, খেলা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন মাসিনু মারমা।

প্রশ্ন: আপনার জুডো ক্যারিয়ারের শুরুটা কীভাবে?


মাসিনু মারমা: ছোটবেলায় আমার ফুটবল খেলার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল। এলাকার বান্ধবীদের সঙ্গে ফুটবল খেলতাম। আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ক্যহলাচাই চৌধুরী হাতে-কলমে ফুটবল খেলা শিখিয়েছেন। পরে আনসারের ফুটবল কোচ সুইহলামং মারমা আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে নিয়ে গিয়ে ফুটবল প্রশিক্ষণ দেন। এইচএসসি পাস করার পর পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে যোগ দিই আনসার বাহিনীতে। সেখানে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিলেও পরবর্তীতে কোচ মোহাম্মদ জানে আলমের পৃষ্ঠপোষকতায় আগ্রহ তৈরি হয় জুডোর প্রতি। ধীরে ধীরে জুডো খেলায় মনোযোগী হই। পাশাপাশি রেসলিং ও কারাতেও চর্চা করেছি।

 
প্রশ্ন: প্রথমবার জুডোর পোশাক পরে ম্যাটে নামার অনুভূতিটা কেমন ছিল?

মাসিনু: শুরুতে অনেক নতুন মনে হয়েছিল। ধীরে ধীরে অনুশীলনের মাধ্যমে জুডোর প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা তৈরি হয়। এরপর যত সময় গেছে, ততই খেলাটায় মগ্ন হয়ে পড়েছি।

 

প্রশ্ন: একজন পেশাদার জুডোকা হিসেবে আপনার দৈনিক অনুশীলন ও প্রস্তুতি কেমন?

মাসিনু: খেলোয়াড় হিসেবে নিয়মিত অনুশীলন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জুডোতে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য ভালো মানের কোচ ও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দেশের বাইরে গিয়ে আরও ভালো প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করি আমি।

 
প্রশ্ন: জুডোর মতো খেলায় ভালো করার জন্য আর কী কী প্রয়োজন?

মাসিনু: খেলোয়াড়দের জন্য ডায়েট ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজের শরীরকে ফিট রাখতে খাবার ও জীবনযাপনে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে প্রতিযোগিতার আগে ওজন ঠিক রাখা ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকাও জরুরি।

 
প্রশ্ন: জুডোতে আপনার প্রিয় কৌশল বা টেকনিক কোনটি?

মাসিনু: জুডোতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল রয়েছে। প্রতিপক্ষ ও পরিস্থিতি বুঝে কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। তবে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য নিয়মিত অনুশীলন ও সঠিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

 
প্রশ্ন: শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলে আপনার কৌশল কী থাকে?

মাসিনু: প্রতিপক্ষকে বুঝে খেলতে হয়। তাদের শক্তি, দুর্বলতা ও খেলার ধরন বুঝে কৌশল ঠিক করতে হয়। এজন্য অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রশ্ন: আপনার জুডো ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?

মাসিনু: ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খেলাধুলার ক্যাটাগরিতে রাষ্ট্রপতি পদক অর্জন করেছি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে এটি আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এর বাইরে ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জুডো ক্যারিয়ারে আমার প্রায় ২১টি পদক রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি জাতীয় পর্যায়ের। জাপান দূতাবাস আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দুটি পদক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি পদক অর্জন করেছি। মোট ১০টি স্বর্ণ, ৬টি রৌপ্য ও ৩টি ব্রোঞ্জ পদক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছি। আর রেসলিংয়ে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় পর্যায়ে ২০টি স্বর্ণপদক পেয়েছি। ২০২৫ সালে খাগড়াছড়ি বলী সংগঠনের আয়োজনে মহিলা বিভাগে হয়েছি চ্যাম্পিয়ন।

প্রশ্ন: চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন ছিল?

মাসিনু: একজন নারী হিসেবে চাকরি, খেলাধুলা ও পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। এইচএসসি পাসের পর আনসার বাহিনীতে যোগ দিই। চাকরির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছি। এরপর উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্যাল এডুকেশন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।

 
প্রশ্ন : খেলোয়াড়ের পাশাপাশি জুডো রেফারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই অভিজ্ঞতা কেমন?

মাসিনু : খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে খেলার পাশাপাশি রেফারি হিসেবে খেলা পরিচালনা করার অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ কামাল দ্বিতীয় বাংলাদেশ যুব গেমস-২০২৩-এ মহিলা জুডো রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। পরে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় গেমস-২০২৬-এও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে মহিলা জুডো রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে খেলার নিয়ম ও কৌশল গভীরভাবে বোঝার সুযোগ হয়েছে।

 

প্রশ্ন : বর্তমানে জুডোতে আপনার অবস্থান কী?

মাসিনু : বর্তমানে আমার ব্ল্যাক বেল্ট দ্বিতীয় ড্যান রয়েছে। সম্প্রতি তৃতীয় ড্যানের পরীক্ষাও দিয়েছি। আশা করছি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পেশাগতভাবে ব্ল্যাক বেল্ট তৃতীয় ড্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করব।

 
প্রশ্ন: খেলাধুলার পাশাপাশি আর কী স্বপ্ন দেখেন?

মাসিনু: আমি ভবিষ্যতে একজন ভালো কোচ হতে চাই। যারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খেলাধুলায় আসতে চায়, তাদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে এগিয়ে নিতে চাই। আমি নিজেও অনেকের সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এখানে এসেছি। তাই ভবিষ্যতে নতুন খেলোয়াড় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চাই।

প্রশ্ন: এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

মাসিনু: দেশের বাইরে গিয়ে কয়েকটি দেশে জুডো খেলেছি। আমাদের আরও বেশি প্রশিক্ষণ দরকার এবং আন্তর্জাতিক মানের কৌশল রপ্ত করা প্রয়োজন। ভালো পারফরম্যান্স করতে হলে ভালো মানের কোচ, উন্নত প্রশিক্ষণ ও দেশের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ অবশ্যই দরকার।

প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশে জুডো ও রেসলিংয়ের পরিস্থিতি কেমন?

মাসিনু: জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি, বিকেএসপি ও উত্তরা ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয়। মোটামুটি সব প্লাটফর্ম থেকেই সাফল্য আসছে। তৃণমূল পর্যায়েও প্রতিভা অন্বেষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জুডোসহ বিভিন্ন মার্শাল আর্টের প্রতিভা খুঁজে বের করার কাজ হচ্ছে। এটি নতুনদের খেলাধুলায় আসার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

প্রশ্ন: নতুন যারা জুডো বা রেসলিংকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মাসিনু: খেলাধুলায় শর্টকাট কোনো রাস্তা নেই। কঠোর পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়া যাবে না। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে এবং প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে আরও ভালো করার চেষ্টা করতে হবে।

 
প্রশ্ন: প্রত্যন্ত এলাকার একজন হিসেবে মেয়েদের জন্য কোনো বার্তা দিতে চান?

মাসিনু: প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছি বলে স্বপ্ন ছোট হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। সুযোগ পেলে মেয়েরাও অনেক দূর যেতে পারে। পরিশ্রম করতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং বাধা এলেও থেমে যাওয়া যাবে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা পেলে যেকোনো মেয়ে, এমনকি পাহাড়ের মেয়েরাও দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য বয়ে আনতে পারবে।