ঢাকা, শনিবার ০৭, নভেম্বর ২০২৬ ১২:০৪:১৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা আজ ৭ নভেম্বর: ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ মুক্তি পেলেন কিউবার সাংবাদিক ইয়োয়ানি সানচেজ রমজানের আগেই বাড়ছে ছোলার দাম, কাটছে না সয়াবিন তেলের সংকট মার্কিন ফার্স্ট লেডিকে ইউক্রেনের বেসামরিক সম্মাননা প্রদান ফের গ্রেফতার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেত্রী উর্মি পুরো ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

প্রতিবাদ প্রতিরোধে আজো প্রাসঙ্গিক নজরুল

উইমেননিউজ২৪ ডেস্কঃ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৫০ এএম, ৭ নভেম্বর ২০২৬ শনিবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুর্দান্ত সাহসিকতার সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কালে বাংলার নিপীড়িত-নির্যাতিত জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলার কাজটি করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান ছিল একেবারেই স্বতন্ত্র। দ্রোহ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার প্রশ্নে নজরুল ছিলেন চূড়ান্তভাবে আপসহীন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলার মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর কবিতা ও গান বারবার নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে এসেছে। দীর্ঘ মুক্তির লড়াইয়ে নজরুল যেন বারবার হাজির হয়েছেন প্রেরণার বাতিঘর হয়ে।

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলের কলম ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত পত্রিকা ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার সাহস জুগিয়েছিল। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উচ্চারণ করেন এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি স্বাধীনতার কথা বলা ছিল দুঃসাহসিক রাজনৈতিক অবস্থান। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারেও তিনি প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ হতে দেননি।

নজরুলের দ্রোহ কোনো আরোপিত বিষয় নয়, তা নিপীড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি নয়, একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, অর্থনৈতিক শোষণ ও মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের দ্রোহ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশে যখন নানা ধারায় আন্দোলন চলছিল, তখন নজরুল তাঁর সাহিত্যকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বানে পরিণত করেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার যে দুর্দম ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, তা পরাধীন মানুষের মনে নতুন সাহস সঞ্চার করে।

‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়োল্লাস’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র মতো সৃষ্টিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, শৃঙ্খল ভাঙা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ গান বন্দিত্ব ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার তাঁর লেখাকে বিপজ্জনক ভেবে তাঁর রচনা বাজেয়াপ্ত করে। তাঁকে কারাবন্দি করে। কিন্তু দমন-পীড়ন তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নজরুলের প্রেরণা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। দীর্ঘ রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রামের পর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এই সংগ্রামে নজরুলের স্বাধীনতাকামী চেতনা, বিদ্রোহী উচ্চারণ এবং সাম্য ও মানবিকতার বাণী নতুন তাৎপর্য লাভ করে। তাঁর গান ও কবিতা বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে আহ্বান নজরুলের সৃষ্টিতে রয়েছে, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের চেতনা

স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বারবার সামনে এসেছে। আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন ক্রমে বিস্তৃত হয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই সংগ্রামে প্রতিবাদী কবিতা, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা এ ধরনের স্বৈরাচারবিরোধী সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, শৃঙ্খল ভাঙা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সাহস তিনি তাঁর সৃষ্টিতে প্রকাশ করেছেন, তা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এই ঐতিহাসিক পরিণতি আবারও দেখিয়ে দেয়, মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। নজরুলের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সেই প্রতিবাদী চেতনাকে ব্যাখ্যা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভিত্তি।