ঢাকা, বুধবার ১৪, অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৫৯:৫৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সরকারি স্কুলে ভর্তি, আসছে নতুন নীতিমালা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছুরি দিয়ে হামলার চেষ্টার অভিযোগ বিলিয়ন ডলারের উত্থানেও পিছিয়ে নারী ফুটবলাররা ভারতে গঙ্গায় নৌকাডুবি, শিশুসহ নিহত ১১ ফারজানা রুপার পক্ষে মামলা লড়তে দুই ব্রিটিশ আইনজীবীর আবেদন

বাংলা ছড়ার হাজার বছরের ইতিহাস: অতীত ও বর্তমান

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১১ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

ভূমিকা: বাংলা ছড়া বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক প্রাণবন্ত অংশ। মায়ের কোলের শিশুকে ঘুম পাড়ানো, উঠানে শিশুদের খেলাধুলা, বর্ষার দিনে বৃষ্টির শব্দ, কৃষকের মাঠ, নদীর ঢেউ, গ্রামীণ জীবনের হাসি-কান্না কিংবা সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ—জীবনের নানা অনুষঙ্গ বাংলা ছড়ার বিষয় হয়ে উঠেছে। ছড়া কখনো মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা লোকঐতিহ্য, কখনো শিশুসাহিত্যের অপরিহার্য শাখা, আবার কখনো সমাজ ও রাজনীতির সমালোচনামূলক ভাষা।

বাংলা ছড়ার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। একটি হলো লোকছড়ার দীর্ঘ মৌখিক ঐতিহ্য, যার সুনির্দিষ্ট সূচনাকাল নির্ধারণ করা কঠিন। অন্যটি হলো লিখিত ও মুদ্রিত ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস, যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় গ্রন্থ, সাময়িকপত্র ও গবেষণার মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব। ফলে বাংলা ছড়ার হাজার বছরের ঐতিহ্য বলতে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাকে বোঝানো যুক্তিসংগত; কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত প্রতিটি ছড়ার বয়স হাজার বছর, এমন দাবি করার ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

এই প্রবন্ধে বাংলা ছড়ার ইতিহাসকে প্রাচীন লোকঐতিহ্য থেকে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের নিজস্ব বিকাশ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, বিশিষ্ট ছড়াকারদের অবদান এবং বর্তমান সময়ের সম্ভাবনা ও সংকট বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলা ছড়ার আদিম উৎস ও মৌখিক ঐতিহ্য: বাংলা ছড়ার উৎস সন্ধান করতে গেলে প্রথমেই ফিরে যেতে হয় মানুষের মৌখিক সংস্কৃতির কাছে। লিখিত সাহিত্যের বিস্তার ঘটার বহু আগে থেকেই মানুষ ছন্দময় বাক্য, সুর, পুনরাবৃত্তি ও ধ্বনির সাহায্যে অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। শিশুদের সঙ্গে কথা বলা, ঘুম পাড়ানো, খেলাধুলা, কৃষিকাজ, ঋতুপরিবর্তন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এমন বহু রচনা কালক্রমে লোকছড়ার রূপ পেয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

এসব ছড়ার অধিকাংশের রচয়িতার নাম জানা যায় না। একজনের মুখে শোনা ছড়া অন্যজনের মুখে পরিবর্তিত হয়েছে; একটি অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলে গিয়ে নতুন রূপ পেয়েছে। এভাবে লোকছড়া কোনো একক লেখকের সম্পত্তি না থেকে সমষ্টিগত সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

বাংলার লোকজীবনে প্রচলিত ছড়ার বিষয়বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। কোনো ছড়ায় চাঁদ, সূর্য, বৃষ্টি ও পাখি; কোনো ছড়ায় কৃষিকাজ, খাদ্য, আত্মীয়তা ও পারিবারিক সম্পর্ক; আবার কোনো ছড়ায় সামাজিক বৈষম্য, কৌতুক কিংবা মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।

লোকছড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তার স্মরণযোগ্যতা। ছোট বাক্য, সহজ শব্দ, পুনরাবৃত্তি, অন্ত্যমিল এবং উচ্চারণের স্বাভাবিক গতি একে মুখে মুখে প্রচারের উপযোগী করেছে। কিন্তু লোকছড়াকে কেবল শিশুর বিনোদন হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যায় না। এর মধ্যে মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক ও অতীতের জীবনযাত্রার চিহ্নও সংরক্ষিত রয়েছে।

বাংলা ভাষার প্রাচীনতম সাহিত্যিক নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদের কথা এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আসে। চর্যাপদ আনুমানিক দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের গানের সংকলন। এর ভাষা, ছন্দ ও লোকজ অনুষঙ্গ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীন বিকাশ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে চর্যাপদকে সরাসরি বাংলা ছড়ার সংকলন বলা যায় না। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরবর্তী লোকছড়ার সম্পর্ক অনুসন্ধান করতে হলে তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্য গবেষণা প্রয়োজন।

অতএব, বাংলা ছড়ার ইতিহাসের সূচনা নির্দিষ্ট কোনো সাল দিয়ে চিহ্নিত করার চেয়ে এর মৌখিক ঐতিহ্য, ভাষাগত বিবর্তন এবং সামাজিক ব্যবহারের ধারাবাহিকতা বোঝা অধিক যুক্তিযুক্ত।

লোকছড়ায় সমাজ ও ইতিহাসের প্রতিফলন: লোকছড়া একটি সমাজের সাংস্কৃতিক স্মৃতির বাহক। এর মধ্যে যেমন আনন্দ ও কল্পনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাস্তব জীবন থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞতা। কোনো ছড়ায় কৃষকের জীবন, কোনো ছড়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি, কোনো ছড়ায় পারিবারিক কর্তৃত্ব, আবার কোনো ছড়ায় শাসক কিংবা সামাজিক বৈষম্যের প্রতি মানুষের মনোভাব প্রকাশ পেতে পারে।

লোকছড়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, তা অনেক সময় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে সংরক্ষণ করে—যে অভিজ্ঞতা প্রথাগত ইতিহাসের বইয়ে সব সময় জায়গা পায় না।

তবে লোকছড়াকে ইতিহাসের সরাসরি দলিল হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। মুখে মুখে প্রচারের ফলে শব্দ ও ঘটনা পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো ছড়ার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সম্পর্ক স্থাপিত হলেও সেই সম্পর্কের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। ছড়ার পাঠ, অঞ্চল, প্রচলনের সময়, সংশ্লিষ্ট দলিল এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতি একত্রে বিশ্লেষণ করলে অধিক নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব।

লোকছড়ার এই পরিবর্তনশীলতাই তার প্রাণ। লিখিত সাহিত্য সাধারণত নির্দিষ্ট পাঠে সংরক্ষিত হয়; কিন্তু লোকছড়া বিভিন্ন মানুষের কণ্ঠে নতুন রূপ পায়। ফলে একই ছড়ার একাধিক আঞ্চলিক সংস্করণ থাকতে পারে। গবেষণার ক্ষেত্রে এই পাঠভেদ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উনিশ শতক: লোকছড়া সংগ্রহ ও মুদ্রিত সংরক্ষণ: বাংলা ছড়ার ইতিহাসে উনিশ শতক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময় আধুনিক বাংলা মুদ্রণ, শিশুপাঠ্য বই, সাময়িকপত্র ও সাহিত্যচর্চার বিস্তারের ফলে দীর্ঘদিন ধরে মুখে মুখে প্রচলিত ছড়া সংগ্রহ ও প্রকাশের উদ্যোগ বাড়ে।

যোগীন্দ্রনাথ সরকার এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর হাসি ও খেলা প্রকাশিত হয় ১৮৯১ সালে। পরে খুকুমণির ছড়া প্রকাশিত হয় ১৮৯৯ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা-য় প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, খুকুমণির ছড়া-তে প্রায় ৮০০ লোকছড়া সংকলিত হয়েছিল। 

এই সংকলনের গুরুত্ব শুধু ছড়া সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে মৌখিক ঐতিহ্যের বহু উপাদান মুদ্রিত রূপে সংরক্ষিত হওয়ার সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে পাঠক, লেখক ও গবেষকেরা এসব ছড়াকে ভিত্তি করে বাংলা ছড়ার ভাষা, ছন্দ ও লোকজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করতে পারেন।

তবে মুদ্রিত সংকলনের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। মৌখিক ঐতিহ্যে প্রচলিত একটি ছড়ার একাধিক পাঠ থাকতে পারে, অথচ বইয়ে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট পাঠ ছাপা হয়। তাই মুদ্রিত সংস্করণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই যে ছড়ার একমাত্র বা আদি রূপ, তা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এই পর্যায়ে বাংলা ছড়া লোকঐতিহ্যের পাশাপাশি সচেতন সাহিত্যচর্চারও অংশ হয়ে ওঠে। ছড়ার ভাষা, গঠন, হাস্যরস ও কল্পনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর মধ্য দিয়েই আধুনিক বাংলা ছড়ার বিকাশের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়।

আধুনিক বাংলা ছড়ার বিকাশ: যোগীন্দ্রনাথ থেকে সুকুমার রায়: উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা ছড়ার শিল্পরূপে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। লোকছড়া সংগ্রহের পাশাপাশি মৌলিক ছড়া রচনার প্রবণতা বাড়ে। শিশুদের জন্য সাময়িকপত্র প্রকাশ, নতুন লেখকের আবির্ভাব এবং শিশুসাহিত্যের বিস্তার এ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদিত মুকুল (১৮৯৫), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত সন্দেশ (১৯১৩) এবং সুধীরচন্দ্র সরকার সম্পাদিত মৌচাক (১৯২০) শিশু-কিশোরদের সাহিত্যচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করে।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের হিজিবিজি (১৯১৬) আধুনিক বাংলা ছড়ার বিকাশে উল্লেখযোগ্য। উদ্ভট কল্পনা, হাস্যরস, চিত্রধর্মী প্রকাশ এবং শব্দের বিচিত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ছড়া নতুন শিল্পরূপ পেতে থাকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশু (১৯০৩), শিশু ভোলানাথ (১৯২২) এবং পরবর্তী সময়ে খাপছাড়া বাংলা ছড়ার কাব্যিক সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে। শিশুর কল্পনা, প্রকৃতি, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও ভাষার সংগীতধর্মিতা তাঁর ছড়াচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দচর্চাও বাংলা কবিতা ও ছড়ার ধ্বনিগত সম্ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সব রচনাকে ছড়া বলা যায় না; তবে শব্দের ধ্বনি, মাত্রা ও ছন্দের কারুকাজ নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলা ছন্দসাহিত্যের পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে।

এই ধারার সবচেয়ে স্বতন্ত্র প্রতিভাদের একজন সুকুমার রায়। তাঁর আবোল তাবোল (১৯২৩) বাংলা ছড়ায় উদ্ভট কল্পনা, শব্দের খেলা, অপ্রত্যাশিত যুক্তি, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসকে এক অসাধারণ শিল্পরূপ দেয়। শিশুরা তাঁর ছড়ায় পায় আনন্দ ও বিস্ময়; প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক খুঁজে পান সামাজিক অসংগতি ও প্রচলিত যুক্তিবোধের প্রতি সূক্ষ্ম প্রশ্ন।

সুকুমার রায়ের অবদান প্রমাণ করে, ছড়া কেবল সরল ভাষায় লেখা ছোট পদ্য নয়। যথাযথ শিল্পকৌশলে এটি হতে পারে ভাষার সৃজনশীল পরীক্ষা, কল্পনার স্বাধীন ক্ষেত্র এবং সমাজকে নতুনভাবে দেখার মাধ্যম।

১৯৪৭-পূর্ব পূর্ব বাংলার ছড়ার ঐতিহ্য: বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯৪৭ সালের আগের পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলা ভাষার লোকসাহিত্য, পালাগান, ধাঁধা, প্রবাদ, লোকগান ও ছড়ার চর্চা ছিল। এসব ঐতিহ্য কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না; বৃহত্তর বঙ্গীয় সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবেই বিকশিত হয়েছিল।

গ্রামীণ জনপদে শিশুদের খেলার ছড়া, নারীদের মুখে প্রচলিত ছড়া, কৃষিজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছন্দময় উচ্চারণ এবং সামাজিক অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক লোকরচনা এই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অঞ্চলভেদে শব্দ, উচ্চারণ ও বিষয়বস্তুর পার্থক্য থাকলেও বাংলা ভাষার মৌখিক সংস্কৃতি এদের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র তৈরি করেছে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পূর্ব বাংলার সাহিত্যিক পরিচয়কে পরবর্তী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। তখন পূর্ব বাংলা বৃহত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ ছিল। কিন্তু এই অঞ্চলের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি, লোকজ অভিজ্ঞতা, নদীমাতৃক পরিবেশ এবং গ্রামীণ জীবন বাংলা ছড়ার সামগ্রিক ঐতিহ্যকে বিশেষ বৈচিত্র্য দিয়েছে।

এই সময়ের ইতিহাস অনুসন্ধানে একটি বড় কাজ হলো পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ছড়া সংগ্রহের পুরোনো সংকলনগুলো শনাক্ত করা, সেগুলোর প্রকাশকাল ও সংগ্রহস্থল যাচাই করা এবং বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঠভেদ নথিভুক্ত করা। নির্দিষ্ট দলিল ছাড়া কোনো ছড়াকে কেবল তার বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার নির্দিষ্ট সময়ের রচনা বলে চিহ্নিত করা উচিত নয়।

দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার সাহিত্য ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের বিকাশের পটভূমি তৈরি করে।

দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন, বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় চেতনার ইতিহাসে একটি নির্ণায়ক ঘটনা। ভাষার অধিকার রক্ষার সংগ্রাম সাহিত্য, গান, কবিতা, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন তাৎপর্য দেয়। ছড়াও এই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিবেশের অংশ হয়ে ওঠে।

তবে ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা সব রচনাকে ছড়া বলা যায় না। একইভাবে, ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়ে ছড়ার নির্দিষ্ট ভূমিকা প্রমাণ করতে হলে সমকালীন পত্রিকা, সংকলন, স্মৃতিচারণ ও আন্দোলনের সাংস্কৃতিক দলিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রামাণ্য পাঠ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ছড়াকে আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্লোগান বা প্রত্যক্ষ দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

ছড়ার সামাজিক শক্তি অবশ্য এ সময়ের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অল্প কথায় বক্তব্য প্রকাশ, সহজে মুখস্থ হওয়া এবং সমবেতভাবে উচ্চারণের সুবিধার কারণে ছড়া ও ছন্দময় রচনা জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর হতে পারে। ভাষা, অধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক পরিবেশে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর তাৎপর্য ছিল।

পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। এভাবে ছড়ার ইতিহাস বৃহত্তর বাঙালি সাংস্কৃতিক জাগরণের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ছড়া: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে পরিবর্তন করে। স্বাধীনতার পর সাহিত্যচর্চায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শহীদের আত্মত্যাগ, স্বাধীনতার স্বপ্ন, যুদ্ধোত্তর সংকট এবং নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যও এই নতুন বাস্তবতার বাইরে ছিল না। দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছড়ার বিষয়বৈচিত্র্যকে প্রসারিত করে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকটও আধুনিক ছড়ায় গুরুত্ব পেতে থাকে।

স্বাধীনতার পর শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশনা, সংবাদপত্রের ছোটদের পাতা, সাহিত্যসংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ছড়ার পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

এখানে একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ছড়া, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা কবিতা এবং ছন্দময় রাজনৈতিক স্লোগান এক সাহিত্যরূপ নয়। এদের মধ্যে বিষয়গত সম্পর্ক থাকলেও শিল্পরূপ ও ঐতিহাসিক ব্যবহার আলাদা করে বিচার করা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের ছড়ার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার জন্য সমকালীন সংবাদপত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান-সংক্রান্ত দলিল, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রকাশনা এবং যুদ্ধোত্তর ছড়া-সংকলন অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। এতে কোন রচনা কখন প্রকাশিত হয়েছে, কোনটি মৌখিকভাবে প্রচলিত ছিল এবং কোনটি পরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—তা স্পষ্ট করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের আধুনিক ছড়াকার ও তাঁদের অবদান: বাংলাদেশের আধুনিক ছড়াসাহিত্য বহু লেখকের সম্মিলিত অবদানে বিকশিত হয়েছে। তাঁদের রচনায় লোকজ ঐতিহ্য, শিশুমন, সামাজিক ব্যঙ্গ, রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রকৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং নাগরিক জীবনের নানা অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে।

ফয়েজ আহমদ: বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে প্রতিবাদী ও ব্যঙ্গাত্মক ধারার আলোচনায় ফয়েজ আহমদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক-সামাজিক সচেতনতার অভিজ্ঞতা ছড়ার বৃহত্তর পরিসর বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নির্দিষ্ট ছড়াগ্রন্থ ও রচনাকে কালানুক্রমে বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের প্রতিবাদী ছড়ার বিকাশ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

সুকুমার বড়ুয়া: বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে সহজবোধ্য ভাষা, হাস্যরস, পরিচিত জীবনের অনুষঙ্গ এবং ছন্দের সাবলীল ব্যবহারের জন্য তিনি সুপরিচিত। তাঁর রচনায় গ্রাম-শহর, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন জীবনের নানা বিষয় উঠে এসেছে। ঠুসঠাস, পাগলা ঘোড়া, লেজ আবিষ্কার, নদীর খেলা ও ভিজে বেড়াল তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এসব বই এবং বাংলাদেশের জীবন ও ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর ছড়ার সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

রফিকুল হক দাদুভাই: বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্য ও শিশু-কিশোর সংগঠনের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছড়ার পাশাপাশি সম্পাদনা ও সংগঠক হিসেবে অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দৈনিক পূর্বদেশের ছোটদের পাতা ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং ১৯৭৪ সালে ‘চাঁদের হাট’ শিশু-কিশোর সংগঠন প্রতিষ্ঠা শিশু-কিশোরদের সাহিত্যচর্চায় নতুন পরিবেশ তৈরি করে। বর্গী এলো দেশে ও পান্তাভাতে ঘি তাঁর পরিচিত ছড়াগ্রন্থ। 

ফারুক নওয়াজ: বাংলাদেশের সমকালীন ছড়াসাহিত্যে ফারুক নওয়াজের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনার বিষয়বৈচিত্র্য, ভাষার ব্যবহার, হাস্যরস, শিশুমন ও সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রকাশ একেকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাঁর ছড়াগ্রন্থের প্রথম সংস্করণ, প্রকাশকাল এবং নির্বাচিত রচনার পাঠভিত্তিক তুলনা বাংলাদেশের আধুনিক ছড়ার বিবর্তন বুঝতে সাহায্য করবে।

আমীরুল ইসলাম, লুৎফর রহমান রিটন: বাংলাদেশের আধুনিক শিশুসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও ছড়াকারদের আলোচনায় তাঁদের নাম উল্লেখযোগ্য। শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁদের দীর্ঘ সাহিত্যচর্চা, ছড়া ও অন্যান্য রচনার বৈচিত্র্য এবং সম্পাদনা-প্রকাশনার সঙ্গে সম্পর্কিত অবদান পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁদের রচনার কালানুক্রমিক তালিকা ও প্রথম প্রকাশের তথ্য সংকলন করলে বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যে তাঁদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যাবে।

এই ছড়াকারদের অবদান মূল্যায়নে কেবল জনপ্রিয়তা বা পরিচিতির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। তাঁদের রচনার শিল্পমান, ভাষার নিজস্বতা, ছন্দের ব্যবহার, বিষয়বৈচিত্র্য, শিশুপাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সময়ের সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশের ক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।

পত্রিকা, সম্পাদনা ও ছড়াকার তৈরির পরিবেশ: বাংলা ছড়াসাহিত্যের বিকাশে সাময়িকপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত শিশু-কিশোরদের পত্রিকা নতুন ছড়াকার তৈরি, নতুন রচনা প্রকাশ এবং পাঠক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর সংবাদপত্রের ছোটদের পাতা, শিশু-কিশোরদের সাময়িকী এবং বিভিন্ন সাহিত্যসংগঠনের কার্যক্রম ছড়ার চর্চাকে প্রসারিত করে। ‘চাঁদের হাট’-এর মতো উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই যে, তা কেবল লেখা প্রকাশ করেনি; শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ এবং নতুন লেখকদের বিকাশের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। দাদুভাইয়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ-প্রতিবেদনগুলোতে এই সাংগঠনিক ভূমিকার বিবরণ পাওয়া যায়। 

ছোটদের পত্রিকার সম্পাদকদের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি মানসম্পন্ন ছড়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল অন্ত্যমিল কিংবা মজার বিষয় দেখলেই চলে না। ভাষার স্বাভাবিকতা, ছন্দের যথার্থতা, কল্পনার নতুনত্ব, বক্তব্যের উপযোগিতা এবং শিশুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে রচনার সম্পর্ক বিচার করতে হয়।

সম্পাদকের যত্নে অনেক নবীন লেখক পরিণত ছড়াকার হয়ে উঠতে পারেন। অন্যদিকে, দুর্বল রচনা বারবার প্রকাশিত হলে পাঠকের রুচি ও ছড়ার মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই শিশু-কিশোর পত্রিকার সাহিত্যিক দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়া নয়; ভালো লেখা চিনতে শেখানো এবং নতুন সৃজনশীলতার জন্য জায়গা তৈরি করাও এর অংশ।

আধুনিক বাংলা ছড়ার শিল্পরীতি ও বিষয়বৈচিত্র্য: আধুনিক বাংলা ছড়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিষয় ও শিল্পরীতির বৈচিত্র্য। লোকছড়ার পরিচিত উপাদান—প্রকৃতি, পশুপাখি, চাঁদ, বৃষ্টি, গ্রামীণ জীবন—আজও ছড়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আধুনিক ছড়াকাররা এসবের পাশাপাশি শহরের জীবন, যানজট, বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, পরিবেশদূষণ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের মানসিক অনুভূতিকেও ছড়ায় নিয়ে এসেছেন।

ছড়ার শিল্পমান নির্ধারণে ছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্ত্যমিলই একমাত্র মানদণ্ড নয়। শব্দের ধ্বনি, বাক্যের গতি, পুনরাবৃত্তি, চিত্রকল্প, বক্তব্য এবং ভাষার স্বাভাবিকতা একত্রে ছড়ার শিল্পরূপ তৈরি করে।

শিশুদের জন্য ছড়া লেখার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। শিশুরা ছোট বাক্য ও পরিচিত শব্দ পছন্দ করলেও তাদের কল্পনার পরিসর সীমিত নয়। বরং ভালো শিশুছড়া শিশুকে এমন একটি দৃশ্য, প্রশ্ন বা অনুভূতির সামনে দাঁড় করায়, যা তার চিন্তাকে প্রসারিত করে।

একইভাবে, প্রতিবাদী ছড়ার শক্তি শুধু কঠোর বক্তব্যে নয়; তার ব্যঙ্গের সূক্ষ্মতা, শব্দের যথার্থতা এবং শিল্পিত প্রকাশেও নিহিত। স্লোগান ও সাহিত্যিক ছড়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্লোগানের প্রধান কাজ দ্রুত বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া; সাহিত্যিক ছড়ার ক্ষেত্রে বক্তব্যের পাশাপাশি ভাষা ও শিল্পরূপের স্থায়ী মূল্যও জরুরি।

একবিংশ শতাব্দী: ডিজিটাল মাধ্যম ও নতুন পাঠক: বর্তমান সময়ে বাংলা ছড়া বই ও সাময়িকপত্রের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সাহিত্যপত্র, ভিডিও, আবৃত্তি এবং অ্যানিমেশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে নতুন পাঠক ও শ্রোতা তৈরির সুযোগ বেড়েছে। প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারগুলোর শিশুদের কাছেও বাংলা ছড়া পৌঁছে দেওয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

ডিজিটাল মাধ্যম ছড়ার সঙ্গে ছবি, সুর, কণ্ঠ ও চলমান দৃশ্য যুক্ত করার সুযোগ দেয়। শিশুরা একই ছড়া পড়তে, শুনতে ও দেখতে পারে। বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও এ ধরনের উপস্থাপনা সহায়ক হতে পারে।

তবে ডিজিটাল জনপ্রিয়তা ও সাহিত্যিক মান এক বিষয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি ছড়া সাময়িকভাবে আলোচিত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যিক মূল্য অর্জন করবে কি না, তা নির্ভর করে রচনার নিজস্বতার ওপর। কেবল ছন্দ মেলানো, পরিচিত শব্দ ব্যবহার কিংবা তাৎক্ষণিক হাস্যরস তৈরি করাই ভালো ছড়ার নিশ্চয়তা নয়।

আরেকটি সংকট হলো, শিশুদের জন্য নতুন বিষয় নির্বাচনে অনীহা। পুরোনো ছড়ার পুনরাবৃত্তি, পরিচিত কল্পনার সীমাবদ্ধ ব্যবহার এবং অতিরিক্ত উপদেশধর্মিতা ছড়াকে একঘেয়ে করে তুলতে পারে। অথচ আজকের শিশুর জীবন বহু নতুন অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। পরিবেশ, প্রযুক্তি, বন্ধুত্ব, একাকিত্ব, বিদ্যালয়ের চাপ, নগরজীবন, প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা এবং প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নও ছড়ার বিষয় হতে পারে।

সমকালীন বিষয়কে ছড়ায় আনার অর্থ শিশুর ওপর বড়দের বক্তব্য চাপিয়ে দেওয়া নয়। শিশুর নিজের অভিজ্ঞতা, কৌতূহল, আনন্দ, ভয়, প্রশ্ন ও কল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে লিখলেই ছড়া জীবন্ত হয়ে উঠবে।

বাংলা ছড়াসাহিত্যের সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয়: বাংলা ছড়ার ইতিহাস ও বর্তমান পর্যালোচনা করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমত, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকছড়া পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। বয়স্ক মানুষের স্মৃতি থেকে ছড়া সংগ্রহ, স্থানীয় উচ্চারণে শব্দ ও সুর ধারণ, সংগ্রহের স্থান ও প্রেক্ষাপট নথিভুক্ত করা এবং একই ছড়ার বিভিন্ন পাঠ সংরক্ষণ করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বাংলা ছড়ার নির্ভরযোগ্য গ্রন্থপঞ্জি তৈরি করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ছড়াগ্রন্থের প্রথম প্রকাশের সাল, প্রকাশক, সংস্করণ, সূচি এবং লেখকের পরিচয় যাচাই করে একটি গবেষণাভিত্তিক তালিকা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এতে বাংলা ছড়ার ইতিহাস নিয়ে ভুল তথ্য ও অনির্ভরযোগ্য দাবি কমবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ছড়াসাহিত্যের ইতিহাসকে শুধু কয়েকজন বিখ্যাত ছড়াকারের জীবনকাহিনিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। পত্রিকা, সম্পাদক, প্রকাশক, পাঠক, সাহিত্যসংগঠন এবং আঞ্চলিক লোকঐতিহ্য—সবকিছুর অবদান একত্রে বিবেচনা করতে হবে।

চতুর্থত, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ছড়া নিয়ে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। সমকালীন সংবাদপত্র, সাংস্কৃতিক সংগঠনের দলিল, স্মৃতিচারণ, প্রকাশিত সংকলন এবং মৌখিক ইতিহাস থেকে রচনাগুলো সংগ্রহ করে প্রকাশকাল ও প্রেক্ষাপট যাচাই করা যেতে পারে।

পঞ্চমত, শিশুসাহিত্যের প্রকাশনায় ছড়ার মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবীন ছড়াকারদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সম্পাদনা, পাঠ-আলোচনা ও ছন্দচর্চার সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিশুদেরও নিজেদের ছড়া লেখার এবং অন্যের লেখা নিয়ে আলোচনা করার পরিবেশ দিতে হবে।

সবশেষে, ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়া সংরক্ষণ ও প্রচারের জন্য নির্ভরযোগ্য উন্মুক্ত সংগ্রহশালা তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে লেখকের নাম, প্রকাশকাল, গ্রন্থসূত্র, অঞ্চল, পাঠভেদ এবং প্রয়োজনে আবৃত্তির রেকর্ড সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ছড়ার ঐতিহ্য আরও সহজলভ্য হবে।

উপসংহার: বাংলা ছড়ার ইতিহাস শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় ছড়ার ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি, শিশুমন ও সামাজিক অভিজ্ঞতার দীর্ঘ ইতিহাস। মৌখিক ঐতিহ্যের অনির্দিষ্ট সূচনা থেকে মুদ্রিত সংকলন, আধুনিক শিশুসাহিত্য, সামাজিক ব্যঙ্গ, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং ডিজিটাল প্রকাশনা—সব মিলিয়ে বাংলা ছড়া একটি বহমান সাহিত্যধারা।

যোগীন্দ্রনাথ সরকারের লোকছড়া সংগ্রহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়াচর্চা, সুকুমার রায়ের উদ্ভট কল্পনা এবং বাংলাদেশের ছড়াকারদের বহুমাত্রিক সাহিত্যকর্ম এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার শিশু-কিশোর পত্রিকা ও সাহিত্যসংগঠন নতুন লেখক তৈরি এবং ছড়ার পাঠক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বাংলা ছড়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নতুন সৃষ্টির সমন্বয়ের ওপর। পুরোনো ছড়ার পাঠ ও প্রেক্ষাপট সংরক্ষণ করতে হবে, পাশাপাশি আজকের শিশুর অভিজ্ঞতা ও কল্পনাকে সাহিত্যিক মর্যাদা দিতে হবে। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শিল্পের প্রতি নিষ্ঠা—দুটিই এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।

ছড়ার পঙ্‌ক্তি ছোট হতে পারে, কিন্তু তার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য ছোট নয়। একটি ছড়া শিশুর ভাষা শেখাতে পারে, একটি ছড়া মানুষের স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখতে পারে, আবার একটি ছড়া সমাজকে নিজের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখাতে পারে।

বাংলা ছড়ার হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য এখানেই—এটি অতীতের স্মৃতি বহন করে, বর্তমানের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্পনার জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়।

আইরীন নিয়াজী মান্না, শিশুসাহিত্যিক ও সাংবাদিক। সম্পাদক-কিশোর লেখা, উইমেননিউজ২৪.কম

তথ্যসূত্র: 
সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, Bengali Folk Rhymes: An Introduction, Asian Folklore Studies, খণ্ড ৫২, সংখ্যা ১, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৪৩–১৬০। বাংলা লোকছড়ার মৌখিক ঐতিহ্য, পরিবর্তনশীলতা ও সামাজিক ভূমিকা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। 

সঞ্জয় সরকার, An Annotated “Chhaṛa-Punthi”: Nursery Rhymes from Bengal, Asian Folklore Studies, খণ্ড ৫৬, সংখ্যা ১, ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ৭৯–১০৮। বাংলার শিশুছড়ার পাঠ, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ বিষয়ে গবেষণা। 

সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, রবীন্দ্রনাথের ‘খাপছাড়া’ বিষয়ক গবেষণা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য পত্রিকা। বাংলা ছড়ার আধুনিক বিকাশে যোগীন্দ্রনাথ সরকার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুকুমার রায়ের ভূমিকা বিষয়ে আলোচনা। 

অসিত মণ্ডল, A Search for History Beneath the Surface of Folk Rhymes, ত্রিসঙ্গম আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা, ২০২৫। লোকছড়ায় সামাজিক ও আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতিফলন বিষয়ে গবেষণা। 

যোগীন্দ্রনাথ সরকার, খুকুমণির ছড়া, ১৮৯৯। বাংলা লোকছড়া সংগ্রহ ও মুদ্রিত সংরক্ষণের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গ্রন্থ।