ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৮:৪১:৩৭ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর নীরব বিপ্লব, নেই স্বীকৃতি

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৩:৩৮ পিএম, ৩ এপ্রিল ২০২৬ শুক্রবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের উঠোনে নরম কুয়াশা। এক নারী হাতে ধান ভেজানোর ঝাঁপি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটি, রান্নাঘরে অর্ধেক প্রস্তুত সকালের খাবার—সবকিছু ফেলে তিনি ছুটছেন মাঠের দিকে।

এই দৃশ্যটি বাংলাদেশের অগণিত গ্রামের প্রতিদিনের গল্প। এই গল্পের নায়িকা—একজন কৃষাণী, যিনি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অদৃশ্য ভিত্তি। 

বাংলাদেশের কৃষি খাত শুধু অর্থনীতির নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তারও প্রধান ভিত্তি। এই খাতের নেপথ্যে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন কোটি কোটি নারী। মাঠে ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন—সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের অবদান এখনো অনেকাংশেই অস্বীকৃত ও অদৃশ্য রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিতে নারীর এই অবদানই গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে।

অদৃশ্য শ্রম, দৃশ্যমান ফলন

বাংলাদেশের কৃষি খাতের প্রতিটি স্তরে নারীর স্পর্শ। ধানের চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা, শুকানো, সংরক্ষণ—সবখানেই তাদের নিপুণতা।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— এই বিশাল অবদান অনেক সময় হিসাবের খাতায় ধরা পড়ে না।

একজন কৃষাণী বলছিলেন— “আমরা কাজ করি সারাদিন, কিন্তু আমাদের কাজটা কাজ হিসেবেই ধরা হয় না।”

বাংলাদেশে কৃষিকাজের প্রায় প্রতিটি ধাপেই নারীর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।

বীজতলা তৈরি
রোপণ ও আগাছা পরিষ্কার
ফসল কাটাই
শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ

গবেষণা বলছে, নারীরা কৃষিতে শ্রমঘন কাজগুলোতে সবচেয়ে বেশি যুক্ত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন ।

এছাড়া মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন, গবাদিপশু লালন—এসব ক্ষেত্রেও নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সংখ্যার ভেতরের গল্প

পরিসংখ্যান বলছে—দেশের নারী শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অনুমান করা হয়, গ্রামীণ নারীদের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে নিয়োজিত। 

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—দেশের নারী শ্রমশক্তির বড় অংশই কৃষির সঙ্গে যুক্ত, প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী শ্রমশক্তি কৃষিখাতে কাজ করে, অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লেবার ফোর্স সার্ভে (২০২৩) অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী নারীদের মোট কর্মসংস্থানের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। এর বিপরীতে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণের হার ১৮ দশমিক ৮২ শতাংশ (বাংলাদেশ স্ট্যাটিসটিক্যাল ইয়াবুক, ২০২৪)। অর্থাৎ মাঠপর্যায়ের কৃষিতে এখন পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাধিক্য স্পষ্ট। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, নারীরা এখন আর কেবল শ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী কাজ, যেমন মাড়াই, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনেও তাঁরা অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করছেন। প্রকৃতপক্ষে নারীশ্রম ছাড়া কৃষকের ঘরে ফসলের যথাযথ সংরক্ষণ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আজ প্রায় অসম্ভব।

এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বিশ্ব গড়ের চেয়েও বেশি ।

কিন্তু এই সংখ্যা শুধু উপস্থিতি জানায়, মূল গল্পটা লুকিয়ে আছে তাদের পরিশ্রমে, সংগ্রামে আর বঞ্চনায়। 

কৃষি খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৪ শতাংশ অবদান রাখে । এই খাতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে—

খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে
পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে
গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে

ঘর আর মাঠ—দুই যুদ্ধ একসঙ্গে

পুরুষ কৃষকের দিনের শুরু হয় মাঠে, কিন্তু নারীর দিন শুরু হয় ঘর থেকে— রান্না, সন্তানের যত্ন, পানি আনা—সব শেষ করে তিনি মাঠে যান।

অর্থাৎ, একই দিনে তারা দুটি যুদ্ধ লড়েন— ঘরের ভেতর, আর মাঠের ভেতর তবুও তাদের পরিচয় অনেক সময় “সহযোগী” হিসেবেই থেকে যায়।

তবে এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও নারীর শ্রমের বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।

অনেক নারী মজুরি পান না
তাদের কাজ জাতীয় হিসাবেও প্রতিফলিত হয় না
পুরুষের তুলনায় মজুরি বৈষম্য বিদ্যমান

গবেষণা বলছে, নারীরা সমপরিমাণ কাজ করলেও তাদের অবদান প্রায়ই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় না

শুধু শ্রমিক নয়, এখন উদ্যোক্তাও

সময় বদলাচ্ছে। অনেক নারী এখন শুধু কৃষিশ্রমিক নন—তারা উদ্যোক্তা।

বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ
হাঁস-মুরগি পালন. দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন, স্থানীয় বাজারে বিক্রি

এই ছোট ছোট উদ্যোগই বদলে দিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

এক নারী উদ্যোক্তা বললেন— “আগে শুধু কাজ করতাম, এখন নিজের আয় আছে। নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারি।”

তবুও রয়ে গেছে বৈষম্য

অবদান যত বড়ই হোক, নারীরা এখনো নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে— জমির মালিকানায় পিছিয়ে, ব্যাংক ঋণ পেতে বাধা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, বাজারে সরাসরি প্রবেশে সমস্যা।

সবচেয়ে বড় কথা— তাদের কাজের মূল্য অনেক সময়ই কম করে দেখা হয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ নারীর এই ভূমিকা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে— খাদ্য উৎপাদন বাড়ে, পরিবারের পুষ্টি উন্নত হয়, দারিদ্র্য কমে ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

অর্থাৎ, নারীর শক্তি মানেই কৃষির শক্তি।

স্বীকৃতি না দিলে এগোনো কঠিন

কৃষিতে নারীর এই অবদানকে টেকসই করতে হলে— তাদের কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে, জমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে হবে, নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

শেষ দৃশ্য

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মাঠ থেকে ফিরে সেই নারী আবার রান্নাঘরে। তার হাতে লেগে আছে মাটির গন্ধ, ঘামে ভেজা পরিশ্রম— কিন্তু সেই হাতেই তৈরি হয় দেশের খাদ্যভাণ্ডার। তবুও ইতিহাসের পাতায় তার নাম থাকে না।

শেষ কথা

বাংলাদেশের কৃষি শুধু ফসলের গল্প নয়— এটি নারীর নীরব সংগ্রাম, অদৃশ্য শ্রম আর অদম্য শক্তির গল্প। এই শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।