ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ৮:৪১:৫০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

বিশ্বকাপের একটি গান কীভাবে বৈশ্বিক ঘটনায় পরিণত হলো

খেলাধুলা ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০২:৫৮ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে পপ সংগীতের বিশ্বতারকা শাকিরার “ওয়াকা ওয়াকা”-র একটি দৃশ্য।

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে পপ সংগীতের বিশ্বতারকা শাকিরার “ওয়াকা ওয়াকা”-র একটি দৃশ্য।

ফিফা বিশ্বকাপ শুধু মাঠের নব্বই মিনিটের খেলা নয়; এটি বরাবরই একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা, যেখানে পরিচয়, বাণিজ্য এবং স্মৃতির এক অনন্য সংযোগ তৈরি হয়। এই বিস্তৃত পরিসরের মধ্যে সংগীতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এটি টুর্নামেন্টের আবহ তৈরি করে, সীমান্ত পেরিয়ে সেই আবেগ ছড়িয়ে দেয় এবং এমন এক শ্রুতিমধুর স্মৃতি রেখে যায়, যা অনেক সময় ম্যাচের ফলাফলকেও ছাপিয়ে যায়।

এটা সহজেই অনুমেয় যে, বিশ্বকাপের শুরুর দিকের গানগুলো ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক ও গম্ভীর প্রকৃতির। এগুলো বিশ্বজনীন জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য তৈরি হয়নি; বরং আয়োজক দেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতেই বেশি মনোযোগী ছিল। তবে ২০ শতকের শেষভাগে এসে ফিফা উপলব্ধি করে—একটি সুর অনেক দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা একটি ম্যাচের হাইলাইটও পারে না।
 
১৯৯০ সালে জিয়ান্না নান্নিনি ও এদোয়ার্দো বেন্নাতোর " উন-এস্তাতে ইতালিয়ানা" সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এতে একধরনের অপেরাধর্মী আবহ ছিল, যা ফুটবলকে কেবল খেলা নয়, বরং শিল্প ও কাব্যের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

এরপর ১৯৯৪ সালে “গ্লোরিল্যান্ড” ভিন্ন ধারা নিয়ে আসে ফুটবলের উন্মাদনায়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গসপেল সংগীতের প্রভাব দেখা যায়। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—বিশ্বকাপের গান কি আয়োজক দেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, নাকি বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হবে?
এই দ্বন্দ্বই পরবর্তী সময়ের গানগুলোর ধরন নির্ধারণ করে।

১৯৯৮ সালে রিকি মার্টিনের “লা কোপা ডে লা ভিডা” এক নতুন যুগের সূচনা করে। প্যারিসের ফাইনালে পরিবেশিত এই গানটি ল্যাটিন পপকে বিশ্বমঞ্চে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি শুধু একটি গান নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে ওঠে। এখান থেকেই বিশ্বকাপ গানের নতুন ফর্মুলা তৈরি হয়। যেখানে গুরুত্ব পায় বাণিজ্যিক সাফল্য, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধন।

২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে পপ সংগীতের বিশ্বতারকা শাকিরার “ওয়াকা ওয়াকা” সেই ফর্মুলাকে আরও নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। আফ্রিকান ব্যান্ড গোল্ডেন সাউন্ডসের “জাঙ্গলেওয়া” থেকে অনুপ্রাণিত এই গানটি স্থানীয় ছন্দ ও বৈশ্বিক পপ সংগীতের এক অনন্য সংমিশ্রণ। ভুভুজেলার শব্দ আর এই গানের সুর যেন একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে।

এছাড়া একই টুর্নামেন্টে ক’নানের “ওয়েভিং ফ্লাগ” ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। মূলত সংগ্রাম ও বাস্তুচ্যুতির গল্প থেকে উঠে আসা এই গানটি পরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হলেও এর আবেগী গভীরতা বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। এই সময় থেকেই দেখা যায়—একটি বিশ্বকাপে একাধিক গান সমান্তরালভাবে জনপ্রিয় হতে পারে।

পরবর্তী বছরগুলোতে বিশ্বকাপের গান আরও বেশি গ্লোবাল ও বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে। পিটবুল, জেনিফার লোপেজ ও ক্লাউডিয়া লেইত্তের “ উই আর ওয়ান” কিংবা নিকি জ্যাম, উইল স্মিথ ও এরা ইস্ত্রেফির " লিভ ইট আপ ”—সবগুলোতেই বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের একত্রিত করে বৃহত্তর দর্শক তৈরি করার কৌশল দেখা যায়। ডিজিটাল যুগে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের গুরুত্বও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে এই ধারায় আসে নতুন পরিবর্তন। একক অ্যান্থেমের বদলে একাধিক গানের সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ সাউন্ডট্র্যাক। “হায়া হায়া” এবং বিটিএস সদস্য জাংকুকের “ড্রিমার্স” এর মধ্যে অন্যতম। এই পদ্ধতি বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রোতাদের অন্তর্ভুক্ত করার একটি কৌশল হিসেবে কাজ করে।

তবে কোন গান দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা নির্ভর করে শুধু সুর বা জনপ্রিয়তার ওপর নয়—বরং স্মৃতির সঙ্গে তার সংযোগের ওপর। “ওয়াকা ওয়াকা” মানেই ভুভুজেলার শব্দ, “লা কোপা ডে লা ভিডা” মানেই নব্বইয়ের দশকের উচ্ছ্বাস, আর “উন-এস্তাতে ইতালিয়ানা” মনে করিয়ে দেয় এক অন্যরকম রোমান্টিক ফুটবল যুগ।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘মালিকানা’। এই গানগুলো শুধু শিল্পীদের নয়; দর্শকরাও এগুলোকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করে। স্টেডিয়ামে গাওয়া, স্থানীয় ভাষায় রিমিক্স করা কিংবা ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া—সবকিছু মিলিয়ে একটি গান হয়ে ওঠে সম্মিলিত অভিজ্ঞতার অংশ।

সম্ভবত এ কারণেই সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ অ্যান্থেমগুলোতে থাকে একধরনের খোলা ভাব। এগুলো নির্দিষ্ট কোনো বার্তা চাপিয়ে দেয় না; বরং একটি অনুভূতির জায়গা তৈরি করে, যেখানে লাখো মানুষের গল্প জায়গা পায়।

শেষ পর্যন্ত, একটি বিশ্বকাপ গানের সাফল্য মাপা হয় না শুধু ভিউ বা পুরস্কারে। বরং প্রশ্ন হলো—গানটি কি স্মৃতিতে বেঁচে থাকে? হঠাৎ কোনো মুহূর্তে কি তা ফিরে আসে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি কি আপনাকে বৃহত্তর কোনো কিছুর অংশ হওয়ার অনুভূতি দেয়?

সেরা গানগুলো সেই কাজটিই করে। এগুলো মনে করিয়ে দেয়—ফুটবল শুধু কৌশল বা পরিসংখ্যান নয়, এটি মূলত এক গভীর আবেগের নাম। আর সেই আবেগকে শ্রুতিমধুর করে তোলে একটি গান।