ঢাকা, শনিবার ০৪, জুলাই ২০২৬ ০:২৮:০৯ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
মেসিদের সামনে রূপকথার কেপ ভার্দে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর প্রাণহানী নারী উন্নয়নে সরকার দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে: পানিসম্পদমন্ত্রী ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২৫৯৫ এফডিসিতে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে শিল্পী সমিতির নির্বাচন

রাজধানীর পাখিরা: কংক্রিটের নগরীতে ডানা মেলে জীবনের গান

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৩০ পিএম, ৩ জুলাই ২০২৬ শুক্রবার

রাজধানীর পাখিরা: কংক্রিটের নগরীতেও ডানা মেলে জীবনের গান

রাজধানীর পাখিরা: কংক্রিটের নগরীতেও ডানা মেলে জীবনের গান

ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে ঢাকা। কোথাও কাকের কর্কশ ডাক, কোথাও চড়ুইয়ের কিচিরমিচির, আবার কোথাও দোয়েলের সুরেলা গান। ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের শব্দ শুরু হওয়ার আগেই রাজধানীর আকাশ-বাতাস যেন ভরে ওঠে পাখিদের কণ্ঠে। অথচ কয়েক দশক আগের ঢাকার সঙ্গে আজকের ঢাকার পার্থক্য অনেক। গাছ কমেছে, পুকুর-জলাভূমি ভরাট হয়েছে, খোলা মাঠ হারিয়ে গেছে। ফলে পাখিদের জীবনও হয়ে উঠেছে কঠিন।

প্রকৃতিবিদদের মতে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে সারা বছর এবং মৌসুমি মিলিয়ে ১৫০টিরও বেশি প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। এর মধ্যে অনেকেই স্থায়ী বাসিন্দা, আবার শীত মৌসুমে উত্তর এশিয়া, সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে। এসব পাখি রাজধানীর লেক, জলাভূমি, পার্ক ও সবুজ এলাকায় কয়েক মাস অবস্থান করে আবার ফিরে যায়।

কোন কোন পাখি দেখা যায়?

ঢাকা শহরের পরিবেশ ও প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো এখানকার পাখিরা। কংক্রিটের এই শহরেও নানা প্রতিকূলতার মাঝে ১৬২ প্রজাতির পাখি টিকে আছে। তবে সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় অনেক পাখিই হুমকির মুখে রয়েছে।

ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত পাখির মধ্যে রয়েছে কাক, চড়ুই, শালিক, দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘু, কোকিল, ফিঙে, টিয়া, মাছরাঙা, বাবুই, কাঠঠোকরা, চিল, বাজ, পেঁচা, কবুতর, বক, পানকৌড়ি, ডাহুক, জলমুরগি, কানিবক, গাংশালিক, ভিমরাজ, মৌটুসি, সবুজ মৌমাছিখেকো, ধূসর বক, রাতচরা বক, সাদা বক, লালঘুঘু, তিলা ঘুঘু, কালো ফিঙে, সাদা-বুক মাছরাঙা, ছোট মাছরাঙা এবং আরও অনেক প্রজাতি।

শীতকালে হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক, গুলশান-বনানী লেক, তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকা, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান এবং রাজধানীর আশপাশের জলাভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস, গাংচিল, পানকৌড়ি, বক ও অন্যান্য পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে।

কোথায় বেশি দেখা যায়?

রাজধানীর কয়েকটি এলাকা এখনো পাখিদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয়।

রমনা পার্ক
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (মিরপুর)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
হাতিরঝিল
ধানমন্ডি লেক
গুলশান ও বনানী লেক
সংসদ ভবন এলাকা
পূর্বাচল ও শহরতলির জলাভূমি

এসব এলাকায় ভোর ও বিকেলে সবচেয়ে বেশি পাখি দেখা যায়।

যে পাখিগুলো কমে যাচ্ছে

এক সময় ঢাকার আকাশে অসংখ্য শকুন উড়তে দেখা যেত। আজ সেই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা এখন খুব কম চোখে পড়ে। চড়ুইয়ের সংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে। অনেক এলাকায় দোয়েল ও ঘুঘুর উপস্থিতিও হ্রাস পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় গাছ কেটে ফেলা, পুরোনো বাড়ি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ, জলাভূমি ভরাট, অতিরিক্ত আলোকদূষণ, শব্দদূষণ এবং কীটনাশকের ব্যবহার পাখিদের জীবনকে সংকটে ফেলছে।

কেন পাখি গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই মনে করেন, পাখি শুধু সৌন্দর্যের জন্য। কিন্তু বাস্তবে তারা পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী।

চড়ুই, বুলবুলি ও ফিঙে প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল ও গাছপালাকে রক্ষা করে। মৌটুসি ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে। বিভিন্ন ফলখেকো পাখি বীজ ছড়িয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সহায়তা করে। চিল ও শকুন মৃত প্রাণী খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে ভূমিকা রাখে।

প্রকৃতিবিদদের মতে, কোনো শহরে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই সেই শহরের পরিবেশগত ভারসাম্যে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সাধারণ মানুষের চোখে

রমনার নিয়মিত দর্শনার্থী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে এখানে হাঁটতে আসি। আগে শীতকালে অনেক বেশি পাখি দেখতাম। এখনো আছে, কিন্তু আগের মতো নয়।"

ধানমন্ডির বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, "আমার ছেলে সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চড়ুই আর শালিক দেখে। কিন্তু আমাদের আশপাশে গাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো পাখি আর আসে না।"

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, "আমরা অনেকেই পাখি দেখার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছি। অথচ শহরের প্রকৃতি রক্ষার জন্য পাখি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"

বিশেষজ্ঞদের মত

ইনাম আল হক বলেন, "পাখি একটি শহরের পরিবেশগত স্বাস্থ্যের অন্যতম সূচক। শহরে যত বেশি দেশীয় গাছ থাকবে, তত বেশি পাখি টিকে থাকবে। উন্নয়নের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্ব দিতে হবে।"

শরীফ খান বলেন, "শুধু পার্ক তৈরি করলেই হবে না। দেশীয় ফলজ ও বনজ গাছ লাগাতে হবে। পাখির খাদ্য, নিরাপদ বাসা এবং প্রজননের পরিবেশ নিশ্চিত না করলে অনেক পরিচিত প্রজাতিও একসময় হারিয়ে যেতে পারে।"

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব-এর সদস্যদের মতে, রাজধানীতে নিয়মিত পাখি গণনা, জলাভূমি সংরক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রকৃতি শিক্ষা এবং পাখি শিকার বন্ধে কঠোর নজরদারি সময়ের দাবি।

কী করছে সরকার?

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বন বিভাগ বিভিন্ন সময়ে নগর বনায়ন, দেশীয় বৃক্ষরোপণ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে হবে। রাজধানীর প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

আমাদের করণীয়

পাখি রক্ষায় শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে।

বারান্দা বা ছাদে দেশীয় গাছ লাগানো, অকারণে গাছ না কাটা, পাখির বাসা নষ্ট না করা, শিকার ও অবৈধ বেচাকেনা বন্ধ করা, জলাশয় রক্ষা করা এবং শিশুদের প্রকৃতির প্রতি আগ্রহী করে তোলা—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ রাজধানীর পাখিদের জন্য বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

পাখি বাঁচলে শহরও বাঁচবে

ঢাকার উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি পাখির গান কেড়ে নেয়, গাছের ডাল খালি করে দেয়, লেকগুলোকে নীরব করে ফেলে—তবে সেই উন্নয়ন কখনো পূর্ণতা পাবে না।

একটি শহরের প্রাণ শুধু তার সুউচ্চ ভবনে নয়, ভোরের কাকের ডাক, চড়ুইয়ের কিচিরমিচির, দোয়েলের সুর আর আকাশে ভেসে বেড়ানো চিলের ডানায়ও লুকিয়ে থাকে। রাজধানীর পাখিদের রক্ষা করা মানে শুধু কয়েকটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; বরং একটি জীবন্ত, সুস্থ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা।

হয়তো একদিন আমাদের সন্তানরা আবার ভোরবেলা জানালা খুলে বলবে—"দেখো, কত পাখি!" সেই দিনটির জন্য আজ থেকেই পাখিদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।