ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩, জুলাই ২০২৬ ৭:১৭:৩০ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জামায়াত এমপির ভিডিওকাণ্ড: তদন্ত দাবি তাসনিম জারার সবজির দামে সেঞ্চুরি, কাঁচা মরিচের কেজি ২৪০ টাকা ছাড়াল তিস্তার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ছুঁই ছুঁই তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ সংগ্রহের নির্দেশ রাহুল-প্রিয়াঙ্কা আটকের ২ ঘণ্টা পর মুক্ত গৌরনদীতে আবাসিক মাদ্রাসা ভবনে ঝুলছিল ছাত্রীর লাশ

রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র: প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর: আজও শুরু হয়নি কার্যক্রম

আপডেট: ০৮:১৬ এএম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৩ সোমবার

OLYMPUS DIGITAL CAMERAরংপুর করেসপন্ডেন্ট, উইমেননিউজ২৪.কম রংপুর : সমাজ পরিবর্তনে পুরুষের রক্তচক্ষু শাসিত শত বাধা পেরিয়ে যে মহীয়সী রংপুরের অজপাড়াগাঁ পায়রাবন্দ থেকে জ্বেলেছিলেন নারীশিক্ষার আলো, সমাজের অনাচার-কুসংস্কার দূর করে জগৎখ্যাত  হয়েছিলেন, তাঁর সেই স্বপ্ন-স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও তা এখন ধ্বংসের শেষ সোপানে দাঁড়িয়ে আছে। এমন কি যে বাড়িটিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সংরক্ষণের অভাবে তার শেষ চিহ্নটিও আজ বিপন্ন। রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার বাড়ির গা ঘেষে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি এখন তালাবদ্ধ। ২০০১ সালের ১ জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রাবন্দকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম পাদপীঠ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ১২ বছরেও এ স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে পায়রাবন্দবাসী। মিঠাপুকুর তথা রংপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রাবন্দে ৩ একর ১৫ শতক জমির ওপর বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২০০১ সালের ১ জুলাই উদ্বোধন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্মৃতি কেন্দ্রটি বাংলা একাডেমির কাছে হস্তান্তর করে। স্মৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো বেগম রোকেয়ার জীবন কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তাঁর গ্রন্থাবলীর অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং স্থানীয় যুবক-যুবতীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান। স্মৃতিকেন্দ্রের সুবিধাগুলো হলো একটি মানসম্পন্ন রেস্টহাউস, একটি অডিটরিয়াম, একটি সেমিনার কক্ষ, একটি লাইব্রেরী, একটি গবেষণাগার, একটি সংগ্রহশালা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নামাজঘর ও স্টাফ কোয়ার্টার। এ ছাড়াও মূল ভবনের পিতলের তৈরি বেগম রোকেয়ার একটি ভাস্কর্য। এসময় বাংলা একাডেমী একজন উপ-পরিচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণীর ১৩ জন কর্মচারি নিয়োগ দেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ ৯ বছর যাবত তারা বেতনভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। একই সালে ১৭ মার্চ অলিখিতভাবে স্মৃতিকেন্দ্রটি বিকেএমই’র শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমোতি প্রদান করা হয়। শুরু হয় পোশাক শ্রমিক তৈরির প্রশিক্ষণ। স্মৃতিকেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে সেখানে পোশাক শ্রমিক তৈরির প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং বিকেএমইকে উচ্ছেদ করার জন্য হিউম্যান রাইট্স এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ এবং পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রমিক তৈরির কারখানা বন্ধের আদেশ দিলে  জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ২০১২ সালের ১ মে বিকেএমইকে উচ্ছেদ করে। শ্রমিক তৈরির কারখানা বন্ধ হলেও স্মৃতিকেন্দ্রের মূল কর্মকান্ড শুরু করা হয়নি আজও। রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র ক্যাম্পাশে ঢোকার পথে একটি জীর্ণ-ভাঙ্গা সাইন বোর্ড ঝুলছে। তাতে লেখা ‘বেগম রোকেয়ার বাড়ি’।সরু ভাঙ্গা পথ ধরে এগিয়ে গেলে সামনে বাম দিকে রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। তারপর একটু সামনেই বেগম রোকেয়ার পৈত্রিকা বাড়িটির ভগ্নাবশেষ চোখে পড়বে। হাতের ডান দিকে রয়েছে রোকেয়া সাখাওয়াত

 বালিকা বিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া মহিলা কলেজসহ আরও দুয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিবর্ণ। যেন ধুকে ধুকে চলছে। রাস্তাজুড়ে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে খড় ও ময়লার স্তুপ। আর ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের বিশাল অবকাঠামো বর্তমানে ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। কার্যক্রম না থাকায় স্মৃতি কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দারোয়ানসহ কোনো কর্মচারিকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অযত্ন-অবহেলায় স্মৃতিকেন্দ্রের দরজা-জানালা, বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের কলাপসবল গেটে জং ধরে গেছে। অধিকাংশ জানালার গ্লাস ভেঙ্গে গেছে। ঘরগুলোর ভেতরে ঝুল আর ময়লার স্তুপ জমেছে। দরজার তালাগুলোতে মরিচা পরে গেছে। কেন্দ্রটির ভেতরের দিকের পুকুর পাড় বাইরের ছেলেদের আড্ডা আর তাস খেলার স্থানে পরিণত হয়েছে। স্মৃতি কেন্দ্রকে পেছনে ফেলে কয়েক কদম গেলেই বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক বাড়িটি। বর্তমানে বাড়িটিকে লোহার বেস্টনি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। একটি বড় লোহার গেট রয়েছে। তা তালাবদ্ধ থাকে। কেউ গেলে রহিমা নামক ষাট উর্দ্ধো একজন নারী পরিচয় জেনে নিয়ে তালা খুলে দেন। পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্ব পদে থেকে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেই দেশে বেগম রোকেয়ার জন্মভূমিতে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতি কেন্দ্রটি চালু না হওয়ায় লজ্জাবোধ করছি। পায়রাবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি চালু না হওয়ার নেপথ্যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। রংপুর জেলা সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন রাঙ্গা বলেন, বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র নির্মাণের সময়ও মহীয়সী রোকেয়া যে ঘরে জন্মেছিলেন, সেই আঁতুড়ঘরের শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের মতো সামান্য একটি প্রাচীর বিদ্যমান ছিল। ওই প্রাচীরটিই হতে পারত একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু সেটিও আজ আর নেই। ওই স্থানটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রোকেয়ার পরিবারের ছিল একটি পারিবারিক মসজিদ। বিদ্যালয়ের সামনে এখনো সেই প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদের ভগ্নাবশেষ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেটিরও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। এদিকে বেগম রোকেয়া ফোরামের সহসভাপতি কথা সাহিত্যিক এম এ বাশার অভিযোগ করে জানান, প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক হলেও তার আমলারা একেবারেই আন্তরিক নয়। স্মৃতি কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিলো বেগম রোকেয়াকে নিয়ে দেশী বিদেশীরা পায়রাবন্দে আসবেন এবং তাকে নিয়ে গবেষণা করবেন এজন্য। সেই সাথে নারী জাতির উন্নয়নে বিশেষ করে অবহেলিত নারীদের জন্য কেন্দ্রটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু কিছুই হলো না। প্রতিষ্ঠার পর এটি ছিলো সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের অধিনে। বাংলা একাডেমি এটি দেখভাল করতো। কিন্তু কতিপয় আমলার কারণে এই স্মৃতি কেন্দ্রটি মহিলা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধিনে দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দ্দেশই পারে বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকে আবারো জাগিয়ে তুলতে। বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি আবারো খুলে দেয়া হবে সেই সাথে সকল সমস্যার সমাধাণ করে এটি আবারো তার কর্মকান্ড শুরু করবে এমনটাই দাবি করেছেন এ অঞ্চলের সকল স্তরের মানুষ। এ ব্যাপারে বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ক্ষোভের সাথে বলেন, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে অনেক খেলা হয়েছে আর নয়। হয় স্মৃতি কেন্দ্রটি খুলে দেয়া হোক না হয় এটি পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হোক।