ঢাকা, বুধবার ২৫, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৪:২৪:২৬ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
শিক্ষকের অভাবে পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যাহত ব্রুকের সেঞ্চুরিতে বিজয়ী হয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড বইমেলা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ঈদের ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু ৩ মার্চ ১০ মার্চ থেকে ১৪ উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ, মাসে ২,৫০০ টাকা ১০ হাজার শিক্ষার্থী পাবে ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা

শিশু-কিশোরদের মানস গড়ার পাঠশালা: ‘কিশোর লেখা’

অনন্যা অনু | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:০৮ এএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার

ছোটদের প্রিয় পত্রিকা কিশোর লেখার ‘ফারুক নওয়াজ সংখ্যা’র প্রচ্ছদ।

ছোটদের প্রিয় পত্রিকা কিশোর লেখার ‘ফারুক নওয়াজ সংখ্যা’র প্রচ্ছদ।

বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে যে কয়টি পত্রিকা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পাঠের আনন্দ দিয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ’কিশোর লেখা’। এটি শুধু একটি পত্রিকা নয়, বরং ছোটদের জন্য এক ধরনের সাহিত্যিক স্কুল—যেখানে গল্প, কবিতা, ছড়া, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও নৈতিকতার পাঠ একসঙ্গে শেখানো হয়।

একটি ঐতিহ্যের নাম: এ বছর কিশোর লেখা প্রকাশের ৪০ বছরে পা দিয়েছে। ১৯ ৮৬ সালে প্রকাশিত হয় এ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি। সে থেকে পথ চলতে চলতে এতটা পথ এসেছে এইপেত্রিকা।
‘কিশোর লেখা’ প্রকাশের শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল শিশু-কিশোরদের উপযোগী ও রুচিসম্মত লেখা তুলে ধরা। সহজ ভাষা, পরিচ্ছন্ন ভাবনা আর শিক্ষামূলক বিষয়বস্তুর কারণে এটি অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পত্রিকাটি পরিণত হয় একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে—যেখানে নতুন লেখকেরা যেমন সুযোগ পায়, তেমনি অভিজ্ঞ লেখকদের লেখাও নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

বিষয়ের বৈচিত্র্য: এই পত্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য। এতে পাওয়া যায়—

রূপকথা ও বাস্তবধর্মী গল্প

ছড়া ও কবিতা

বিজ্ঞান ও আবিষ্কারের কথা

মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসভিত্তিক লেখা

পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক ফিচার

নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের গল্প

এই বৈচিত্র্যের ফলে শিশুরা শুধু বিনোদনই পায় না, পাশাপাশি শেখে পৃথিবীকে জানার আগ্রহও তৈরি হয়।

ভাষা ও শৈলী: ‘কিশোর লেখা’র ভাষা সাধারণত সহজ, প্রাঞ্জল ও শুদ্ধ। এতে শিশুদের জন্য কঠিন শব্দ বা জটিল বাক্য পরিহার করা হয়। ফলে পাঠকেরা গল্প পড়তে গিয়ে ক্লান্ত হয় না, বরং ভাষার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। এই পত্রিকার লেখা অনেক শিশুকে প্রথমবারের মতো সাহিত্য পড়ার আনন্দ দিয়েছে—যা ভবিষ্যতে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্র: ‘কিশোর লেখা’ বহু লেখকের হাতেখড়ি পত্রিকা হিসেবে পরিচিত। অনেক প্রতিষ্ঠিত কবি ও গল্পকার এই পত্রিকায় লিখেই সাহিত্যজীবনের শুরু করেছিলেন। শিশু-কিশোরদের লেখা প্রকাশের সুযোগ থাকায় এটি এক ধরনের প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। স্কুলপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী নিজের লেখা ছাপা দেখে উৎসাহ পায়—লেখালেখিকে জীবনের অংশ বানাতে শেখে।

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা: এই পত্রিকার বড় অবদান হলো নৈতিক শিক্ষা। গল্পের ভেতর দিয়ে শেখানো হয়—

সততা

বন্ধুত্ব

পরিবারকে সম্মান

দেশপ্রেম

সহমর্মিতা

এগুলো সরাসরি উপদেশ আকারে না এসে গল্পের ভেতর দিয়ে আসে, ফলে শিশুদের মনে তা গভীরভাবে দাগ কাটে।

চিত্রাঙ্কন ও উপস্থাপনা: ‘কিশোর লেখা’র আরেকটি শক্ত দিক হলো এর চিত্রাঙ্কন ও অলংকরণ। রঙিন প্রচ্ছদ, গল্পের সঙ্গে মানানসই ছবি, ছড়ার পাশে আঁকা চরিত্র—সব মিলিয়ে এটি চোখের জন্যও আকর্ষণীয়। এতে শিশুদের পড়ার আগ্রহ বাড়ে। কিশোর লেখার নিয়মিতভাবে প্রচ্ছদ করেন দেশের প্রখ্যাত প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ।

ডিজিটাল যুগে গুরুত্ব: আজকের যুগে মোবাইল ও ইউটিউবের ভিড়ে শিশুদের বই বা পত্রিকার প্রতি আগ্রহ কমছে। তবু ‘কিশোর লেখা’র মতো পত্রিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিশুদের স্ক্রিনের বাইরে এনে কাগজের সঙ্গে পরিচয় করায়। এটি মনোযোগ ধরে রেখে পড়ার অভ্যাস তৈরি করে—যা ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া কঠিন।

সমাজ ও সংস্কৃতিতে ভূমিকা: এই পত্রিকা শুধু পাঠক তৈরি করেনি, একটি সংস্কৃতিও তৈরি করেছে। স্কুলের লাইব্রেরি, বাড়ির বুকশেলফ আর শিক্ষক-অভিভাবকের হাতে হাতে ‘কিশোর লেখা’ ঘুরেছে। এর মাধ্যমে শিশুরা দেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ: তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। মুদ্রণ ব্যয়, পাঠকসংখ্যা ধরে রাখা, ডিজিটাল প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে শিশু পত্রিকা চালানো কঠিন কাজ। তবু ‘কিশোর লেখা’র মতো পত্রিকাগুলো টিকে আছে পাঠকের ভালোবাসায়। ভবিষ্যতে অনলাইন সংস্করণ, অডিও গল্প বা ই-সংস্করণ চালু করলে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো আরও সহজ হবে।

শেষ কথা: ‘কিশোর লেখা’ কেবল একটি পত্রিকা নয়—এটি একটি প্রজন্ম তৈরির কারখানা। এখান থেকেই অনেকে শিখেছে পড়তে, ভাবতে, লিখতে। শিশুদের কল্পনাশক্তি, ভাষাজ্ঞান ও নৈতিক বোধ গঠনে এই পত্রিকার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আজও যখন কোনো শিশু হাতে নিয়ে বলে—“এই মাসের কিশোর লেখা এসেছে?” তখন বোঝা যায়, কাগজের পত্রিকার দিন এখনো শেষ হয়নি।