ঢাকা, শুক্রবার ৩০, জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৪৮:৫৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ক্রিকেট: বিশ্বকাপ নিশ্চিতের পর স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ আবারও ছাদখোলা বাসে চ্যাম্পিয়ন সাবিনারা জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের সহ-সভাপতি বাংলাদেশ বিয়ের ক্ষেত্রে যে ‘বাধ্যবাধকতা’ বিলুপ্ত করছে ফ্রান্স মানবাধিকার নিশ্চিতে প্রধান উপদেষ্টাকে অ্যামনেস্টির চিঠি ৫০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা আজ আজ সারাদিন গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়

অ্যামনেস্টির চিঠি: সতর্কবার্তা না কি সুযোগ

আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:২৮ পিএম, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার

আইরীন নিয়াজী মান্না

আইরীন নিয়াজী মান্না

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চিঠিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা, গ্রেপ্তার ও আটক প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই চিঠি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বার্তা নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নজরদারির বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার প্রশ্নটি বরাবরই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের যুক্তিতে অনেক সময় নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অ্যামনেস্টির এই চিঠি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে: রাষ্ট্র কি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নাগরিকের অধিকার খর্ব করছে?

আন্তর্জাতিক উদ্বেগের তাৎপর্য

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এমন একটি সংস্থা, যারা সাধারণত কূটনৈতিক ভাষায় কথা বললেও, তাদের পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব বহন করে। কোনো দেশের সরকারপ্রধান বা প্রধান উপদেষ্টাকে সরাসরি চিঠি দেওয়া মানে হচ্ছে—সেই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে তারা ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে দেখছে।

এ ধরনের চিঠি আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে। উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অবদান যতই প্রশংসিত হোক না কেন, মানবাধিকার ইস্যুতে নেতিবাচক বার্তা কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্যিক সুবিধা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার এখন আর গৌণ বিষয় নয়; বরং এটি একটি নীতিগত শর্তে পরিণত হয়েছে।

নিরাপত্তা বনাম অধিকার

রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই নিরাপত্তা যদি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে অর্জিত হয়, তবে সেটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গ্রেপ্তার, রিমান্ড, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা ডিজিটাল অপরাধের নামে মতপ্রকাশ দমন—এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে তা সহজেই অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে। অ্যামনেস্টির চিঠি মূলত সেই ঝুঁকির কথাই রাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

রাষ্ট্রের জন্য সুযোগ

এই চিঠিকে শুধু সমালোচনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সুযোগও বটে। সুযোগ—রাষ্ট্র তার মানবাধিকার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে, আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

মানবাধিকার নিশ্চিত করা মানে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যাওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি মজবুত হওয়া। বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ, নির্বিচার গ্রেপ্তার কিংবা মতপ্রকাশে বাধা—এসব রাষ্ট্রের শক্তি বাড়ায় না, বরং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়ায়।

প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অ্যামনেস্টির আহ্বান যদি আন্তরিকভাবে বিবেচিত হয়, তবে তা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার জন্য একটি দিকনির্দেশনা হতে পারে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন

বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেও এর ছাপ রয়েছে। বিরোধী মত দমন, সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা—এসব বিষয় মানবাধিকারের পরিবেশকে আরও সংকুচিত করে।

এই বাস্তবতায় মানবাধিকার রক্ষার দায় শুধু সরকারের নয়; রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ—সবারই দায়িত্ব রয়েছে। অ্যামনেস্টির চিঠি মূলত রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে এই সমন্বিত দায়বদ্ধতার কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

উপসংহার

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চিঠিকে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার প্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন নয়। কিন্তু মানবাধিকার কোনো বিদেশি ধারণা নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। তাই এই চিঠিকে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতায় নয়; বরং নাগরিকের আস্থায়। আর সেই আস্থা অর্জনের পথ মানবাধিকার রক্ষা করেই তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অ্যামনেস্টির চিঠি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তার পাশাপাশি একটি সম্ভাবনার জানালাও খুলে দিয়েছে—যদি রাষ্ট্র তা গ্রহণ করার মানসিকতা দেখায়।

আইরীন নিয়াজী মান্না: সম্পাদক-উইমেননিউজ২৪.কম