ঢাকা, বৃহস্পতিবার ০৪, জুন ২০২৬ ১২:০২:৪৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
সেই বৃদ্ধার ছেলে যুগ্মসচিব আনিসুরকে প্রত্যাহার মিরপুরের বৃদ্ধার মৃত্যু: তদন্ত কমিটি চেয়ে রিট তৃণমূলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা হামে প্রাণ গেল আরো ৭ শিশুর, মোট মৃত্যু ৬০০ ছাড়ালো সাগরিকার শেষ সময়ের গোলে সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ এক মামলায় জামিন পেলেন দীপু মনি, ছয়টিতে রুল

চার্চ বা মসজিদ- ইসরায়েলি ধ্বংস থেকে বাদ যাচ্ছে না কিছুই

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:৪১ এএম, ২১ এপ্রিল ২০২৬ মঙ্গলবার

ছবি: সংগ্রহিত।

ছবি: সংগ্রহিত।

দক্ষিণ লেবাননের দেবাল গ্রামে ইসরায়েলি সেনাদের যিশু খ্রিস্টের একটি মূর্তি ভাঙচুর করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনাটি তীব্র নিন্দার ঝড় তুলেছে এবং যুদ্ধের সময় ধর্মীয় স্থানগুলোতে হামলার বিষয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি জোরালো করেছে।

এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; দক্ষিণ লেবানন থেকে শুরু করে গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীর পর্যন্ত ইসরায়েল কীভাবে খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গির্জা, মসজিদ এবং মাজারগুলো ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার ওপর আলোকপাত করেছে 'দ্য নিউ আরব'।

দক্ষিণ লেবানন: মাজার, গির্জা এবং মসজিদ

দক্ষিণ লেবাননে মূর্তির এই ঘটনাটি কোনো একক ঘটনা ছিল না। হিজবুল্লাহর সাথে ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ধর্মীয় স্থানগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা ও ঘটনারই এটি একটি অংশ।২০২৬ সালের এপ্রিলে দেবাল গ্রামের একটি ছোট খ্রিস্টান মাজারের ক্রুশিফিক্স (ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তি) ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিলেন।

এর কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের নভেম্বরের স্থল অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনী শামা গ্রামে অবস্থিত 'মাকাম শামউন আল-সাফা' মাজারটি ধ্বংস করে দেয়। এই স্থানটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে দীর্ঘকাল ধরে পবিত্র এবং সেন্ট পিটারের সাথে সম্পর্কিত বলে বিবেচিত।

এছাড়াও সীমান্ত গ্রাম মহাইবিবে একটি প্রাচীন মাজার এবং সংলগ্ন মসজিদ মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়াসহ অন্যান্য ধর্মীয় স্থানও আক্রান্ত হয়েছে। 

স্থানীয় ধর্মযাজকদের মতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি বিমান হামলায় দারদঘায়ার 'সেন্ট জর্জ মেলকাইট ক্যাথলিক চার্চ' ধ্বংস হয়ে যায়।সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় এই হামলার শিকার হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে খ্রিস্টান এবং মুসলিম উভয় ধর্মীয় উপাসনালয়ই রয়েছে।

গাজা: বোমাবর্ষণে গির্জা ও মসজিদ

গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা অনেক বেশি ব্যাপক। বেসামরিক এলাকার বিস্তীর্ণ ধ্বংসলীলার অংশ হিসেবে ধর্মীয় অবকাঠামোগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।যুদ্ধের সময় এই ভূখণ্ডের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টান স্থাপনা আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বিশ্বের প্রাচীনতম গির্জাগুলোর একটি 'চার্চ অব সেন্ট পরফিরিয়াস'-এ ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামলা চালানো হয়। গির্জা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, চত্বরের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া বেসামরিক নাগরিকরা এই হামলায় নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী গির্জা কমপ্লেক্সের মধ্যে একটি প্রধান ধর্মীয় ভবন ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে ভেতরে থাকা বেশ কয়েকজন বেসামরিক লোক প্রাণ হারান।

গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জা 'হলি ফ্যামিলি চার্চ'-ও যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই গির্জা চত্বরটি বারবার বাস্তুচ্যুত বেসামরিক নাগরিকদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর কাছেই অবস্থিত সেন্ট পরফিরিয়াস মঠ এবং পার্শ্ববর্তী ধর্মীয় ভবনগুলোতে চলমান যুদ্ধের মধ্যে একাধিকবার বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

গির্জার পাশাপাশি, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গাজা জুড়ে প্রায় ৭৯ শতাংশ মসজিদ ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযানে ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পশ্চিম তীর: হামলা এবং দায়মুক্তি

অধিকৃত পশ্চিম তীরে এই রূপটি ভিন্ন কিন্তু ক্রমবর্ধমানভাবে দৃশ্যমান। খ্রিস্টান নেতারা গির্জা, পাদ্রী এবং ধর্মীয় সম্পত্তি লক্ষ্য করে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।খ্রিস্টান-প্রধান শহর তাইবেহ-তে বসতি স্থাপনকারীরা একটি খ্রিস্টান কবরস্থান এবং একটি ৫ম শতাব্দীর গির্জার কাছে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় গির্জার ঊর্ধ্বতন নেতারা বিরল এক যৌথ সফর করেন।

গ্রিক অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্ক থিওফিলো তৃতীয় এই ঘটনাগুলোকে স্থানীয় সম্প্রদায় এবং তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের জন্য একটি "সরাসরি এবং ইচ্ছাকৃত হুমকি" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েলি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে তদন্তের দাবি জানান।

অন্যান্য চার্চ নেতারা আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যে, এই ধরনের হামলা একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। পাদ্রীদের মতে, খ্রিস্টের সময় থেকে ফিলিস্তিনে বসবাসকারী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতা "সুসংগঠিত" এবং এর লক্ষ্য হলো তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করা।

ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ক পিয়েরবাতিস্তা পিজাবাল্লা সতর্ক করেছেন যে, পশ্চিম তীরের কিছু অংশে অধিকারের বদলে শক্তির আইনই এখন "একমাত্র আইন" হিসেবে কার্যকর। গির্জার কর্মকর্তারা একে 'বিচারহীনতা বা দায়মুক্তির পরিবেশ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গির্জায় হামলার পাশাপাশি পশ্চিম তীরে মসজিদে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং অপবিত্র করা এখন প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

আইনি সুরক্ষা এবং বিতর্কিত যৌক্তিকতা

১৯৫৪ সালের সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষা সংক্রান্ত হেগ কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধিসহ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে ধর্মীয় স্থানগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। সামরিক বাধ্যবাধকতা ছাড়া এগুলো লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।ইসরায়েল প্রায়ই বেসামরিক এলাকায় হামলার সপক্ষে যুক্তি দেয় যে, হিজবুল্লাহ এবং হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ধর্মীয় স্থানের কাছাকাছি বা ভেতরে অবস্থান করে কার্যক্রম চালায়। তবে, এই নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছিল এমন কোনো সর্বজনীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পর্যবেক্ষণে থাকা একটি ধারা

লেবানন, গাজা এবং পশ্চিম তীর জুড়ে ধর্মীয় স্থানগুলোর সাথে জড়িত এই ঘটনাগুলো যুদ্ধের সময় ক্রমেই পুঞ্জীভূত হয়েছে। এটি ধর্মীয় নেতা, মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ের মাজার থেকে শুরু করে গাজা ও পশ্চিম তীরের গির্জা ও মসজিদ পর্যন্ত—খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য স্থানগুলো ইসরায়েল কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস বা অবমাননা করা হয়েছে।

এটি আধুনিক যুদ্ধে পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা নিয়ে জরুরি প্রশ্ন উত্থাপন করার পাশাপাশি ইসরায়েলি রাষ্ট্র এবং ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদী ও আধিপত্যবাদী চরিত্রকেও বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।