ঢাকা, রবিবার ২০, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৫৪:৫৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু ইমরান খানের বোন আলিমা খান আটক এশিয়ান গেমস:সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হারলো বাংলাদেশ আজ থেকে একাদশে ভর্তিযুদ্ধ শুরু, যেভাবে আবেদন করবেন সবাইকে কাঁদিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত অপ্রতিম এশিয়ান গেমস: সেমিফাইনালে মুখোমুখি বাংলাদেশ-ভারত

প্রশ্ন করলেই নিষিদ্ধ? ট্রাম্প ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:৫৩ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের আয়না। রাষ্ট্রক্ষমতা যত শক্তিশালীই হোক, তাকে প্রশ্ন করার অধিকার সংবাদমাধ্যমের আছে। আর সেই প্রশ্ন পছন্দ না হলেই যদি সাংবাদিকের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে বিষয়টি কেবল একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকে না—প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়েও।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ১৮ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর প্রশাসনের বিষয়ে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশের অভিযোগে সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে হোয়াইট হাউস থেকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আরও সংবাদমাধ্যম এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসতে পারে। তবে ঘোষণার সময় নিষেধাজ্ঞাটি কীভাবে কার্যকর হবে বা সংবাদমাধ্যমের কোন কোন ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হবে, তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি। ঘোষণার পরও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে কাজ করতে দেখা গেছে।

ট্রাম্পের অভিযোগ—এই সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর প্রশাসন নিয়ে ‘ফিকশন’ ও ‘মিথ্যা’ খবর প্রকাশ করছে। সাংবাদিকতার কোনো প্রতিবেদন ভুল হলে তার প্রতিবাদ করার অধিকার অবশ্যই একজন প্রেসিডেন্টের রয়েছে। ভুল তথ্য প্রকাশিত হলে সংশোধন দাবি করা যায়, তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তা খণ্ডন করা যায়, প্রয়োজনে আইনি পথও খোলা থাকে। কিন্তু একজন শাসক কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া’ বলে ঘোষণা করে তার সরকারি প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেবেন—এই পদ্ধতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

কারণ সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু সরকারের প্রশংসা করা নয়। বরং সরকারের সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা, অনিয়ম কিংবা বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও সাংবাদিকতার দায়িত্বের অংশ।

সংবাদমাধ্যম সরকারের মুখপাত্র নয়—জনগণের চোখ ও কান।

এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াইট হাউসের মতো রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সাংবাদিকদের কাজ করার সুযোগ মানে শুধু কয়েকজন সাংবাদিকের বিশেষ সুবিধা নয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রপতি ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্বাধীনভাবে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পায়। তাই কোনো সংবাদমাধ্যমকে শুধু তার সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের কারণে সরকারি পরিসর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ হলে তার প্রভাব সাংবাদিকের চেয়েও বড়—তা জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে স্পর্শ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও বিষয়টির সাংবিধানিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আইন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্টের অপছন্দের কভারেজের কারণে সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়ার উদ্যোগ প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এমন সংঘাত দেখা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে সিএনএনের সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টার হোয়াইট হাউসের প্রেস পাস প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁর প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করা হয়। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ক্ষমতার সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে—সরকারের সমালোচনা করার কারণে একজন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে কতটা শাস্তি দেওয়া যেতে পারে?

ট্রাম্প এবারও বলেছেন, আরও কিছু সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তিনি নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্টের মতো সংবাদপত্রকেও ‘ফেক নিউজ’ বলে সমালোচনা করেছেন।

এখানেই আশঙ্কার জায়গাটি আরও বড় হয়ে ওঠে।

আজ যদি একটি সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়, কাল আরেকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠতে পারে। আজ অভিযোগ ‘ভুয়া খবর’, কাল হতে পারে ‘পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ’; পরদিন হয়তো ‘রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবেদন’। অভিযোগের ভাষা বদলাতে পারে, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অপছন্দের সাংবাদিকতাকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা যদি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অবশ্য সংবাদমাধ্যমও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব তথ্য যাচাই করা, একাধিক সূত্র ব্যবহার করা, ভুল হলে সংশোধন করা এবং মতামত ও সংবাদকে আলাদা রাখা। কোনো সংবাদমাধ্যম মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করলে তার জবাবদিহি থাকা জরুরি। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহির প্রশ্ন আর সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশ্ন এক নয়।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য এখানেই—রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও দুটিই জনগণের কাছে জবাবদিহির কাঠামোর অংশ।

ট্রাম্পের এই ঘোষণার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই সিএনএন, এমএস নাও কিংবা পলিটিকোর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত অসন্তোষ নয়। প্রশ্ন হলো, সরকারের সমালোচনা করলে কি সাংবাদিকের সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার হারাতে হবে?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ধারণাই দুর্বল হয়ে যায়।

একজন প্রেসিডেন্ট সংবাদমাধ্যমকে অপছন্দ করতে পারেন। কোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন। কঠোর ভাষায় প্রতিবাদও করতে পারেন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সাংবাদিককে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করা এবং সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া—এই দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে।

গণতন্ত্রে প্রেসিডেন্টের শক্তি শুধু তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় নয়; তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সুযোগও গণতন্ত্রের শক্তি।

সংবাদমাধ্যম ভুল করতে পারে। সাংবাদিকেরও জবাবদিহি আছে। কিন্তু সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হলে জনগণের সামনে সরকারের জবাবদিহির জায়গাটিই সংকুচিত হয়।

হোয়াইট হাউস কারও ব্যক্তিগত বাড়ি নয়। সেটি রাষ্ট্রপতির সরকারি কার্যালয় এবং জনগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক। তাই সেখানে কোন সাংবাদিক ঢুকবেন আর কোন সাংবাদিক ঢুকবেন না—এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

ট্রাম্পের ঘোষণার আইনি পরিণতি কী হবে, তা আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি বিষয় স্পষ্ট—ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অধিকার যতদিন থাকবে, ততদিন গণতন্ত্রে নাগরিকের জানার অধিকারও বেঁচে থাকবে।

আর সংবাদমাধ্যমকে নীরব করে দিয়ে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের জানার অধিকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।