ঢাকা, শনিবার ১৯, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:৩৯:৩৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ফিজিতে প্রতি ৫০ জন গর্ভবতী নারীর একজন এইচআইভিতে আক্রান্ত গ্রিন কার্ড পেতে নতুন নিয়ম জানালো ট্রাম্প প্রশাসন দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়ল প্রথমবার জাপানে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়াল সিএনএনসহ ৩ গণমাধ্যম নিষিদ্ধ করলেন ট্রাম্প সুনামগঞ্জে বাবার হাতে বিষপানে ৩ শিশুর প্রাণহানী পাবনায় শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, প্রধান অভিযুক্তের বাড়ি ভাঙচুর

ভাষা আন্দোলন: ভাষার জন্য নারীরাও নেমেছিল রাজপথে

রিফাত চৌধুরী | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০১:১১ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

ভাষার জন্য রাজপথে রক্ত ঝরেছিল। সেই রক্তের ইতিহাসে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের নাম আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কিন্তু এই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছিল নারীর হাতেও। কেউ মিছিলে হেঁটেছেন, কেউ সভা করেছেন, কেউ পুলিশের চোখ এড়িয়ে লিফলেট পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ আন্দোলনকারীদের জন্য অর্থ ও খাবার জুগিয়েছেন। কেউ আবার কারাবরণ করেছেন। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও অনেকে সন্তান, ভাই, স্বামী ও স্বজনদের আন্দোলনে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলন তাই শুধু ছাত্র-তরুণদের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল বাঙালির অস্তিত্ব ও মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আর সেই লড়াইয়ে নারীরাও ছিলেন সক্রিয় অংশীদার।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হলেও কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেয়। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদ গড়ে উঠতে থাকে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক কর্মী—সবার পাশাপাশি নারীসমাজও ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে সেই আন্দোলনে।

শুরুর দিকে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল সভা, সমাবেশ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন নারীরাও ঘরের নিরাপদ পরিসর ছেড়ে রাজপথে নামেন।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি। ঢাকার আকাশে তখন উত্তেজনা। ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে। সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু ছাত্রসমাজ সিদ্ধান্ত নেয়—বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন চলবেই।

২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রদের মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি চালায়। রাজপথে ঝরে পড়ে তরুণ প্রাণ। সেই রক্তাক্ত দিনটির অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। নারীদের মধ্যেও তৈরি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নারীরা প্রতিবাদে সংগঠিত হন। তাঁরা মিছিল ও সভায় অংশ নেন, আহতদের পাশে দাঁড়ান, আন্দোলনকারীদের সহায়তা করেন। অনেক নারী সরাসরি পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।

ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে নারীদের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম সুফিয়া কামাল। তিনি শুধু কবি ছিলেন না; ছিলেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ভাষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত ঘটনার পর তিনি প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন এবং নারীদের সংগঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তৎকালীন নারীসমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁরা সভা করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন, গান-কবিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মাতৃভাষার অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেছেন। সে সময় সরাসরি রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আজকের মতো স্বাভাবিক ছিল না। সামাজিক নানা বাধা, পারিবারিক রক্ষণশীলতা এবং নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার মধ্যেও তাঁদের এগিয়ে আসতে হয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল নারী সংগঠনগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। অনেক পরিবারে নারীরাই ছিলেন আন্দোলনের খবর পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে খবর, লিফলেট কিংবা আন্দোলনের কর্মসূচি পৌঁছে যেত তাঁদের হাত ধরে।

আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—আন্দোলনে নারীর ভূমিকা শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তখনকার সমাজে একজন তরুণ ছাত্রের মিছিলে যাওয়ার পেছনে তাঁর মা, বোন কিংবা স্ত্রী যে মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন, তারও একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। পুলিশি ধরপাকড়ের ভয়, গুলির আশঙ্কা, গ্রেপ্তারের আতঙ্ক—সবকিছুর মধ্যেও অনেক নারী তাঁদের স্বজনদের আন্দোলনে যেতে বাধা দেননি। বরং উৎসাহ দিয়েছেন।

ভাষা আন্দোলনের দিনগুলোতে অনেক বাড়িই হয়ে উঠেছিল আন্দোলনকারীদের আশ্রয়স্থল। খাবার, পানি, কাপড় কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছেন নারীরা। পুলিশের নজর এড়িয়ে আন্দোলনের খবর বা কাগজপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কাজেও তাঁরা যুক্ত ছিলেন।

এই অবদানগুলো ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার তালিকায় হয়তো আলাদা করে লেখা হয়নি। কিন্তু আন্দোলনের ভিত গড়ে উঠেছিল এমন অসংখ্য অদৃশ্য শ্রমের ওপর।

ভাষা আন্দোলনের নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শামসুন্নাহার মাহমুদ, লায়লা সামাদ, সুফিয়া কামালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নারী কর্মী ও সংগঠকদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁদের পাশাপাশি ছিলেন এমন অসংখ্য সাধারণ নারী, যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় নেই। কেউ ছিলেন ছাত্রী, কেউ শিক্ষক, কেউ গৃহিণী, কেউ সাংস্কৃতিক কর্মী। কিন্তু মাতৃভাষার প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান ছিল এক।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণ, শোকসভা, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনের চেতনা যে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শক্তিশালী করে এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করে, সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারায় নারীদের অংশগ্রহণও অব্যাহত থাকে।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে নারীর ভূমিকা তাই কেবল কয়েকটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এটি ছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক অংশগ্রহণ। শহরের শিক্ষিত নারী থেকে সাধারণ গৃহবধূ—বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারীরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

একজন মা তাঁর সন্তানকে মিছিলে যেতে দিয়েছেন। একজন বোন ভাইয়ের জন্য খাবার নিয়ে ছুটেছেন। একজন ছাত্রী পুলিশের ভয় উপেক্ষা করে মিছিলে হেঁটেছেন। একজন সাংস্কৃতিক কর্মী গান গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। একজন সংগঠক অন্য নারীদের নিয়ে সভা করেছেন। আর কেউ হয়তো নিজের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন আন্দোলনকারীদের জন্য।

এই ছোট ছোট ভূমিকা মিলেই তৈরি হয়েছিল একটি বড় ইতিহাস।

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্ত আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতিগুলোর একটি। কিন্তু সেই ইতিহাসকে পূর্ণ করতে হলে রাজপথে থাকা নারীদের পাশাপাশি ঘরের ভেতরে থাকা নারীদের ভূমিকাও মনে রাখতে হবে। কারণ ভাষা শুধু মিছিলে রক্ষা পায়নি; ভাষা রক্ষা পেয়েছিল মানুষের ঘরে, মায়ের মুখে, শিশুর উচ্চারণে এবং সেইসব নারীর সাহসে, যাঁরা মাতৃভাষার অধিকারকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ বলে মনে করেছিলেন।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা পৃথিবীতে পালিত হয়। বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে। সেই গৌরবের ইতিহাসে নারীরাও সমান অংশীদার।

তাই ভাষা আন্দোলনের গল্প বলতে গেলে শুধু শহীদদের নাম উচ্চারণ করলেই ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। বলতে হয় সেইসব নারীর কথাও—যাঁরা কখনো রাজপথে, কখনো সভায়, কখনো সংগঠনের কাজে, কখনো পর্দার আড়ালে থেকে মাতৃভাষার অধিকারের লড়াইকে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

তাঁদের অনেকের নাম আমরা জানি না। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসেও তাঁদের নীরব পদচিহ্ন রয়ে গেছে।

বাংলা ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল, সেই রক্তের ইতিহাসে নারীর সাহসও মিশে আছে।