ঢাকা, সোমবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১:৩৩:০৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রী আজ নিউইয়র্ক যাচ্ছেন, ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেব তা ভাবিনি: সাদিয়া আয়মান ন্যাম ভবন থেকে এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু ইমরান খানের বোন আলিমা খান আটক এশিয়ান গেমস:সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হারলো বাংলাদেশ

বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণসুবিধা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

সালমা হক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১০:৫৯ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একসময় ব্যবসা মানেই যেন ছিল পুরুষের জগৎ। পরিবারের আয় বাড়াতে কিংবা নিজের পায়ে দাঁড়াতে নারীরা ছোটখাটো কাজ করলেও ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অনেকের জন্য কঠিন। কিন্তু সময় বদলেছে। ঘরে বসে খাবার তৈরি, পোশাক ও হস্তশিল্প, অনলাইন ব্যবসা, কৃষি, প্রযুক্তি, বিউটি ও সেবা খাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন নারীরা নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা গড়ে তুলছেন।

কেউ চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করছেন, কেউ চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হয়েছেন, আবার কেউ নিজের সৃজনশীলতাকে পেশায় রূপ দিয়েছেন। তবে উদ্যোগ নেওয়ার পর টিকে থাকা এবং ব্যবসাকে বড় করা এখনো অনেক নারীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি হলো অর্থের জোগান।

ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন পুঁজি। আর সেই পুঁজি সংগ্রহ করতে গিয়ে নারী উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ ব্যাংকঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের দিকে যেতে চান। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ঋণসুবিধা থাকলেও বাস্তবে সেই সুবিধা পাওয়ার পথ সবসময় সহজ নয়।

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে আসছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ কর্মসূচি, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা অর্থায়নের আওতায় বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে।

অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা ঋণপণ্য চালু করেছে। এসব ঋণের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু, চলতি মূলধন, যন্ত্রপাতি কেনা, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা স্থায়ী সম্পদ তৈরিতে অর্থায়নের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।

তবে কোন ব্যাংকে কী ধরনের ঋণ পাওয়া যাবে, সুদের হার কত, সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে, জামানত লাগবে কি না এবং পরিশোধের সময়সীমা কত—এসব শর্ত প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা। তাই ঋণ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বর্তমান শর্ত জানা জরুরি।

জামানত বড় বাধা

নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির পথে সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি জামানত।

অনেক নারী উদ্যোক্তার নিজের নামে জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো বড় সম্পদ থাকে না। পারিবারিক সম্পদের মালিকানা অনেক সময় স্বামী, বাবা কিংবা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যের নামে থাকে। ফলে ব্যবসা ভালো চললেও ব্যাংকঋণের জন্য প্রয়োজনীয় জামানত দেখাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন নারী উদ্যোক্তারা।

এখানে আরেকটি বাস্তবতা হলো, অনেক নারী ব্যবসা শুরু করেন খুব অল্প পুঁজি দিয়ে। তাঁদের ব্যবসার পরিমাণ ছোট হওয়ায় বড় ঋণের প্রয়োজন হয় না; কিন্তু ছোট ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াও যদি জটিল হয়, তাহলে তাঁরা শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের পরিবর্তে আত্মীয়স্বজন, সমিতি কিংবা অনানুষ্ঠানিক উৎসের ওপর নির্ভর করেন।

কাগজপত্র ও ব্যাংকিং জটিলতা

ঋণের জন্য আবেদন করতে গিয়ে অনেক নারী উদ্যোক্তাকে ব্যবসার নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব, আয়-ব্যয়ের হিসাব, করসংক্রান্ত কাগজপত্রসহ বিভিন্ন নথি দিতে হয়।

শহরের একজন শিক্ষিত উদ্যোক্তার জন্য এসব প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হলেও গ্রামের নারী উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব এবং ব্যাংকে সরাসরি গিয়ে আবেদন করার সংকোচ অনেক নারীকে পিছিয়ে দেয়।

এ কারণে শুধু ঋণের ব্যবস্থা করলেই হবে না, ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও সহজ, স্বচ্ছ ও উদ্যোক্তাবান্ধব করা জরুরি।

শুধু ঋণ নয়, দরকার প্রশিক্ষণ

একজন নারী উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করার জন্য টাকা দেওয়া হলো, কিন্তু বাজার সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই—এমন পরিস্থিতিতে ঋণই যথেষ্ট নয়।

ব্যবসার পরিকল্পনা তৈরি, হিসাবরক্ষণ, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বাজার বিশ্লেষণ, কর ব্যবস্থাপনা, অনলাইন বিপণন, প্যাকেজিং, গ্রাহকসেবা এবং ডিজিটাল লেনদেন—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরুর আগে এবং ব্যবসা পরিচালনার সময় নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে তাঁদের উদ্যোগ টেকসই হওয়ার সুযোগ বাড়ে।

অনলাইন ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-কমার্স নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। আগে একটি দোকান ভাড়া নেওয়া ছাড়া ব্যবসার সুযোগ সীমিত থাকলেও এখন ঘরে বসে পোশাক, খাবার, গয়না, হস্তশিল্প, চিত্রকর্ম কিংবা বিভিন্ন সেবা বিক্রি করা সম্ভব।

এর ফলে অনেক নারী অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন। কিন্তু অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রেও পণ্যের মান, ছবি ও উপস্থাপন, ডিজিটাল বিপণন, নিরাপদ পেমেন্ট, ডেলিভারি এবং ক্রেতার আস্থা অর্জনের মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

ঋণ দিয়ে এই উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার পাশাপাশি তাঁদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোও প্রয়োজন।

বাজার পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ

উৎপাদন করলেই ব্যবসা সফল হয় না। পণ্য বিক্রির জন্য বাজার প্রয়োজন।

অনেক নারী উদ্যোক্তা সুন্দর পণ্য তৈরি করেও বড় বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান না। মেলা, প্রদর্শনী, করপোরেট ক্রয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থা এবং অনলাইন বাজারে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে তাঁদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য স্থায়ী বা নিয়মিত বাজারব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।

পারিবারিক ও সামাজিক বাধা

অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের সামাজিক বাধার কথাও ভুলে গেলে চলবে না।

একজন নারী ব্যবসা করতে চাইলে অনেক সময় তাঁকে শুনতে হয়—‘এটা কি তোমার কাজ?’, ‘সংসার সামলাবে কে?’ কিংবা ‘ব্যবসা করে কতই বা আয় হবে?’

পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য সময় দেওয়া, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া, ব্যাংকে যাওয়া কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে অন্য এলাকায় যাতায়াত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে নারীর কাজকে সম্মান করার সামাজিক মানসিকতাও তৈরি করতে হবে।

ঋণের সঙ্গে চাই নিরাপদ পরিবেশ

নারী উদ্যোক্তার অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়। একজন নারী যখন নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেন, তখন তাঁর আয় বাড়ে, পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে অন্য নারীর জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, যাতায়াতের নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক লেনদেনে প্রতারণা থেকে সুরক্ষাও জরুরি।

বিশেষ করে অনলাইন ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ছোট উদ্যোগ থেকে বড় প্রতিষ্ঠানে

বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্র উদ্যোগ দিয়ে শুরু করেন। কেউ ঘরে বসে কাপড় তৈরি করেন, কেউ খাবার বিক্রি করেন, কেউ হাতে তৈরি পণ্য তৈরি করেন, কেউ আবার শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করেন।

এই ছোট উদ্যোগগুলোর মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে।

তাই নারী উদ্যোক্তাকে শুধু ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে হবে। তাঁর ব্যবসা বড় করার জন্য ধাপে ধাপে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার ও পরামর্শের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

শেষ কথা

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণসুবিধা বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঋণই শেষ কথা নয়। ঋণের সঙ্গে সহজ শর্ত, কম জটিলতা, প্রয়োজন অনুযায়ী জামানত ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বাজারের সুযোগ এবং ব্যবসা পরিচালনায় পরামর্শ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

একজন নারী উদ্যোক্তা যখন নিজের পায়ে দাঁড়ান, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, একটি অর্থনীতিও শক্তিশালী হয়। তাঁর আয় যেমন পরিবারের স্বচ্ছলতা বাড়ায়, তেমনি তাঁর উদ্যোগ অন্য মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পরবর্তী ধাপ তাই শুধু আরও বেশি নারীকে উদ্যোক্তা বানানো নয়; বরং যারা উদ্যোক্তা হয়েছেন, তাঁদের টিকে থাকার এবং বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

কারণ একজন নারী যখন নিজের হাতে নিজের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে পারেন, তখন তিনি শুধু নিজের জীবন বদলান না—পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতিতেও পরিবর্তনের দরজা খুলে দেন।