ঢাকা, সোমবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০:৪১:৫৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেব তা ভাবিনি: সাদিয়া আয়মান ন্যাম ভবন থেকে এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু ইমরান খানের বোন আলিমা খান আটক এশিয়ান গেমস:সেমিফাইনালে ভারতের কাছে হারলো বাংলাদেশ

৫২ থেকে ৭১: আমরা কী অতীত ভুলে যাচ্ছি

জোসেফ সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:০৪ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রবিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে আমরা বলি—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। ২৬ মার্চ এলে স্বাধীনতার কথা বলি। ১৬ ডিসেম্বর এলে বিজয়ের পতাকা হাতে নিই। কিন্তু এই দিনগুলোর মাঝখানে যে দীর্ঘ পথ—যে পথের প্রতিটি বাঁকে ছিল প্রতিবাদ, রক্ত, কারাবরণ, নির্যাতন, স্বপ্ন আর আত্মত্যাগ—সেই পথের গল্প আমরা কতটা মনে রেখেছি?

১৯৫২ থেকে ১৯৭১—মাত্র উনিশ বছর। কিন্তু এই উনিশ বছরেই বদলে গিয়েছিল একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা, আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

ভাষার অধিকারের দাবিতে যে তরুণেরা রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের আন্দোলন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল সাংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে। ১৯৫২ তাই শুধু ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম বড় রাজনৈতিক উচ্চারণ।

ভাষা থেকে স্বাধিকারের পথে

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই ক্ষোভ রক্তাক্ত প্রতিবাদে রূপ নেয়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।

তাঁদের রক্তে শুধু বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি শক্তিশালী হয়নি; বাঙালির রাজনৈতিক আত্মসচেতনতাও গভীর হয়েছে।

এরপর এসেছে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। এসেছে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অধিকার হরণ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ষাটের দশকে ছয় দফা হয়ে উঠেছে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের প্রধান রাজনৈতিক দাবি। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার ভিত আরও নাড়িয়ে দেয়।

তারপর ১৯৭০-এর নির্বাচন।

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত সংঘাতের দিকে। ১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের গণহত্যা এবং এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

অর্থাৎ ১৯৭১ হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে আসেনি।

এর শেকড় ছিল ১৯৫২-এর মাটিতে।

ইতিহাস কি শুধু পরীক্ষার বিষয়?

সমস্যাটা এখানেই।

আমরা অনেক সময় ইতিহাসকে বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় আর পরীক্ষার কয়েকটি প্রশ্নে আটকে ফেলি। ২১ ফেব্রুয়ারি মানে শহীদ মিনার, ৭ মার্চ মানে ভাষণ, ২৬ মার্চ মানে স্বাধীনতা, ১৬ ডিসেম্বর মানে বিজয়—এভাবে কয়েকটি তারিখ মুখস্থ করলেই যেন ইতিহাস জানা হয়ে যায়।

কিন্তু ইতিহাস শুধু তারিখ নয়।

কেন মানুষ রাস্তায় নেমেছিল? কেন ভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছিল? কেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল? কেন স্বায়ত্তশাসনের দাবি উঠেছিল? কেন ১৯৭১ সালে মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখেছিল?

এই প্রশ্নগুলো না জানলে ইতিহাসের মূল শিক্ষা হারিয়ে যায়।

একজন তরুণ যদি জানে না কেন তার পূর্বপুরুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, তাহলে একুশে ফেব্রুয়ারি তার কাছে শুধু ফুল দেওয়ার একটি দিন হয়ে যেতে পারে। একজন তরুণ যদি না জানে স্বাধীনতার পেছনে কত মানুষের রক্ত, তাহলে ১৬ ডিসেম্বর তার কাছে শুধু ছুটির দিন হয়ে যেতে পারে।

ভুলে যাওয়ার আরেক নাম উদাসীনতা

ইতিহাস ভুলে যাওয়া সবসময় বই ছিঁড়ে ফেলার মতো দৃশ্যমান নয়। কখনো ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানে ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে যাওয়া।

যে আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, আমরা যদি অন্যায় দেখেও নীরব থাকি, তাহলে সেই ইতিহাসের কতটা আমরা ধারণ করছি?

যে মুক্তিযুদ্ধ মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নিয়েছিল, আমরা যদি মানুষের মর্যাদাকে অবহেলা করি, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কতটা আমাদের জীবনে আছে?

এ প্রশ্নগুলো কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এগুলো আত্মসমালোচনার প্রশ্ন।

নতুন প্রজন্মের সঙ্গে দূরত্ব

আজকের শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তাদের জন্ম হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। তারা যুদ্ধ দেখেনি, শরণার্থীশিবির দেখেনি, ২৫ মার্চের রাত দেখেনি, মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্র দেখেনি।

তাদের কাছে ১৯৫২ বা ১৯৭১ স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাস।

তাই শুধু ‘মনে রাখতে হবে’ বললে হবে না। ইতিহাসকে তাদের কাছে জীবন্ত করে তুলতে হবে।

একজন শহীদের মায়ের গল্প বলতে হবে। বলতে হবে সেই মেয়েটির কথা, যে যুদ্ধের সময় বাবাকে হারিয়েছিল। বলতে হবে গ্রামের সেই নারীর কথা, যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। বলতে হবে সেই কিশোরের কথা, যে যুদ্ধের সময় নিজের পরিবার হারিয়েও স্বাধীনতার স্বপ্ন ছাড়েনি।

ইতিহাস মানুষের গল্প হয়ে উঠলে শিশুরা তাকে ভালোবাসতে শেখে।

৫২-এর সঙ্গে ৭১-এর যোগসূত্র

আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ১৯৫২ ও ১৯৭১-এর মধ্যে সম্পর্ক।

ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি—সবকিছু ধীরে ধীরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করেছে।

তাই ১৯৫২-কে বাদ দিয়ে ১৯৭১কে পুরোপুরি বোঝা যায় না।

আবার ১৯৭১কে না বুঝলে ১৯৫২-এর আত্মত্যাগের পূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্যও বোঝা কঠিন।

দুটো একই ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইতিহাসের মালিকানা কার?

ইতিহাস কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একার সম্পত্তি নয়। ইতিহাস একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ব্যাখ্যার পার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু প্রামাণ্য ইতিহাস অনুসন্ধান, সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব সবার।

ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি রাজনৈতিক বিতর্কের ভয়ে ইতিহাসকে ভুলে যাওয়াও বিপজ্জনক।

কারণ যে জাতি নিজের অতীতকে জানে না, সে নিজের বর্তমানকে বোঝার ক্ষেত্রেও দুর্বল হয়ে পড়ে।

স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়

প্রতি বছর শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া দরকার। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রয়োজন ইতিহাস পড়া, জানা এবং প্রশ্ন করা।

একজন শিশু যেন জানতে পারে কেন তার স্কুলের সামনে শহীদ মিনার আছে।

একজন কিশোর যেন জানতে পারে কেন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

একজন তরুণ যেন জানতে পারে কেন ১৯৭১ সালে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে গিয়েছিল।

আর একজন নাগরিক যেন বুঝতে পারে—স্বাধীনতা শুধু একটি মানচিত্রের নাম নয়। স্বাধীনতা মানুষের মর্যাদা, অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকারও।

আমরা কি সত্যিই ভুলে যাচ্ছি?

হয়তো পুরোপুরি নয়।

এখনো একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। এখনো বিজয়ের দিনে জাতীয় পতাকা উড়ে। এখনো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বই লেখা হয়, গবেষণা হয়, নতুন প্রজন্মের অনেকেই ইতিহাস জানার চেষ্টা করে।

তবে আশঙ্কার জায়গাটি অন্যখানে—আমরা যেন আনুষ্ঠানিক স্মরণে আটকে না যাই।

শুধু দিবস পালন করে ইতিহাস বাঁচে না। ইতিহাস বাঁচে চর্চায়, গবেষণায়, প্রশ্নে, সত্য অনুসন্ধানে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

১৯৫২ আমাদের ভাষার মর্যাদা শিখিয়েছে।
১৯৬৯ আমাদের গণআন্দোলনের শক্তি দেখিয়েছে।
১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতার মূল্য বুঝিয়েছে।

এই ধারাবাহিকতা ভুলে গেলে আমরা শুধু কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনা ভুলব না; আমরা নিজেদের গড়ে ওঠার গল্পটিই ভুলে যাব।

তাই প্রশ্নটা হয়তো হওয়া উচিত—আমরা অতীত ভুলে যাচ্ছি কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, অতীত থেকে আমরা কী শিখছি?

কারণ একটি জাতি তার ইতিহাসকে শুধু স্মরণ করে না—ইতিহাস থেকে নিজের আগামীটাও তৈরি করে।

আর ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে দীর্ঘ পথ বাঙালি পেরিয়ে এসেছে, সেই পথের প্রতিটি রক্তাক্ত পদচিহ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়; এটি অর্জন করতে হয় সাহস, ত্যাগ ও মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা দিয়ে।