ঢাকা, শনিবার ০৭, মার্চ ২০২৬ ১২:৩১:৫৭ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ঢাকার বাতাসে দূষণ আজ কিছুটা কম রবিবার থেকে নতুন পদ্ধতিতে তেল বিক্রি ৮ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের ৬ রুটে বিমানের ফ্লাইট বাতিল ঈদযাত্রায় ট্রেনের ১৭ মার্চের টিকিট বিক্রি শুরু ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর গেলেন সেলিমা রহমান

বিউটি বোর্ডিং: স্মৃতির উঠোনে সাহিত্যের সুর

মানিক নূর | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৬:০২ পিএম, ৬ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার

বিউটি বোর্ডিং

বিউটি বোর্ডিং

ইতিহাস–ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং। সাহিত্যিক আড্ডা আর স্মৃতির উঠোনে এখনো ভেসে আসে অতীতের সুর। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে অবিরাম আড্ডা। সাহিত্য-শিল্পকলা-রাজনীতি-বিষয়ের কোনো কমতি নেই।

আজও পুরান ঢাকার সরু গলি, পুরনো দালান আর শত বছরের ইতিহাসের ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক অনন্য স্মৃতির ঠিকানা—স্মৃতির উঠোনে। ব্যস্ত বংশালের কোলাহলের মাঝেও এই বাড়িটিতে ঢুকলেই যেন হঠাৎ সময় ধীরে হাঁটতে শুরু করে। উঠোন ঘেরা পুরনো ভবনটি যেন এখনো ধরে রেখেছে বহু কবিতা, গল্প আর আড্ডার স্মৃতি।

একসময় এই বোর্ডিং ছিল ঢাকা শহরের সাহিত্যিকদের প্রাণের ঠিকানা। সন্ধ্যা নামলেই এখানে বসত আড্ডা—কেউ কবিতা পড়ছেন, কেউ গল্প শোনাচ্ছেন, কেউ আবার সমাজ–রাজনীতি নিয়ে তর্কে মেতে উঠছেন। সেইসব দিন এখন অতীত, কিন্তু বাড়িটির দেয়াল যেন এখনো সেই কথোপকথনের প্রতিধ্বনি বয়ে বেড়ায়।

জমিদারবাড়ি থেকে সাহিত্যিকদের আস্তানা:
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে এই বাড়িটি ছিল একটি জমিদার পরিবারের বাসভবন। পরে এটি বোর্ডিং হিসেবে চালু হয়। ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে কবি–সাহিত্যিকদের আড্ডাখানা।
বিশেষ করে ১৯৪০ ও ৫০–এর দশকে ঢাকা শহরের বহু তরুণ কবি, লেখক ও সাংবাদিক এখানে এসে সময় কাটাতেন।

কথিত আছে, বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিমান কণ্ঠ শামসুর রাহমান, প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেকেই কোনো না কোনো সময়ে এই বোর্ডিংয়ের আড্ডায় যুক্ত ছিলেন। সাহিত্য, রাজনীতি আর সংস্কৃতি নিয়ে রাত গভীর পর্যন্ত চলত আলোচনা।

উঠোনে বসত কবিতার আসর:
বিউটি বোর্ডিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ এর মাঝের উঠোন। চারপাশে ঘেরা বারান্দা আর পুরনো কাঠের দরজা–জানালার মধ্যে বসে চলত সাহিত্যচর্চা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এক সময় সন্ধ্যা নামলেই চায়ের কাপ আর সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে কবিতার আসর জমে উঠত।

বংশালের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আগে এখানে প্রায়ই কবি–সাহিত্যিকরা আসতেন। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি রাত পর্যন্ত আড্ডা চলত। তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি—এটা ছিল ইতিহাসের অংশ।”

রাজনীতি ও সংস্কৃতির স্মৃতিবাহী:
শুধু সাহিত্য নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির সঙ্গেও এই বোর্ডিংয়ের সম্পর্ক রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় অনেক ছাত্রনেতা ও তরুণ কর্মী এখানে এসে মিলিত হতেন বলে স্থানীয়রা জানান। ফলে বিউটি বোর্ডিং এক সময় হয়ে উঠেছিল চিন্তা ও চেতনার মিলনস্থল।

সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া চিত্র:
সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু বদলে গেছে। পুরনো ঢাকার বহু ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো এই বোর্ডিংও একসময় হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল। তবে সংস্কৃতিপ্রেমীদের উদ্যোগে এখন এটি সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। মাঝে মাঝে এখানে সাহিত্য আড্ডা, কবিতা পাঠ কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়।

বর্তমানে যারা এখানে আসেন, তারা শুধু একটি পুরনো বাড়ি দেখেন না—দেখেন এক টুকরো ইতিহাস, এক সময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র।

স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা এক ঠিকানা:
বংশালের ব্যস্ত সড়ক থেকে যখন কেউ প্রথমবার বিউটি বোর্ডিংয়ের দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে, তখন মনে হয় যেন অন্য এক জগতে এসে পড়েছে। পুরনো দেয়াল, সিঁড়ি আর উঠোন যেন নিঃশব্দে বলে যায় বহু দিনের গল্প।

ঢাকা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই হারিয়ে যাচ্ছে তার পুরনো স্মৃতি। কিন্তু বিউটি বোর্ডিং এখনো দাঁড়িয়ে আছে—পুরান ঢাকার ইতিহাস, সাহিত্য আর সংস্কৃতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে।