ঢাকা, বুধবার ০৫, আগস্ট ২০২০ ১৮:৫৬:০৯ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
হাওড়ে ঘুরতে গিয়ে নৌকাডুবি, দুই শিশুসহ নিহত ১৭ দেশে আরো ৩৩ মৃত্যু, শনাক্ত ২,৬৫৪ ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে সিনহার বোনের মামলা যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ১ হাজার ৩০২ জনের মৃত্যু শেখ কামালের ৭১তম জন্মবার্ষিকী আজ লেবাননে বিস্ফোরণে নিহত ৭৮, আহত চার হাজার বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ১ কোটি ৮৭ লাখ, মৃত্যু ৭ লাখ ছাড়ালো

শুভ জন্মদিন নারী দিবসের প্রবক্তা কমরেড ক্লারা জেটকিন

অনলাইন ডেস্ক | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৮:২৮ পিএম, ৫ জুলাই ২০২০ রবিবার

শুভ জন্মদিন নারী দিবসের প্রবক্তা কমরেড ক্লারা জেটকিন

শুভ জন্মদিন নারী দিবসের প্রবক্তা কমরেড ক্লারা জেটকিন

শুভ জন্মদিন কমরেড ক্লারা জেটকিন। শ্রেণি সংগ্রামের লড়াইয়ে নারী নেতৃত্বের এক অসাধারণ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কমরেড ক্লারা। ১৮৫৭ সালের আজকের দিনে অর্থাৎ ৫ জুলাই জার্মানির ছোট গ্রাম সাক্সসনায় তার জন্ম। বাবা গটফ্রেড আইজেনার ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ প্রোটেসস্ট্যান চার্চ সংগঠক। তিনি একজন দক্ষ বেহালা বাদকও ছিলেন। মা জোসেকিন ভেইটালে আইজেনার ছিলে সুশিক্ষিত প্রগতিশীল নারী।

ক্লারা জেটকিন, শ্রেণি সংগ্রামের লড়াইয়ে নারী নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্তের নাম। এই মহীয়সীর নেতৃত্বেই সংগঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ৮ মার্চকে নারী দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করেন তিনি। ক্লারা জেটকিন ছিলেন জার্মান জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং ‘নারী অধিকার’ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী।

পারিবারকি এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ক্লারা বেড়ে উঠেন। বাবার সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি মায়ের পুঁথি চর্চা তার মনোগজতে এক উন্নত ক্ষেত্র তৈরি করে। স্কুল কলেজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি পাঠ করেছেন যে সব বই তার মধ্যে রয়েছে বায়রন, ডিকেন্স, সেক্সপিয়র, শিলার, গ্যাটে, হোমারসহ আরও অনেকে।

শৈশবে জেটকিন শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করলেও, অচিরেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন। ১৮৭৪ সালের দিকে তার সাথে বিশেষ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল জার্মানির নারী আন্দোলন এবং শ্রম-আন্দোলনের সাথে জড়িত সংগঠনগুলোর।

নারীদের মাঝে ব্যাপকভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ক্লারা ১৮৭৮ সালে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলে যোগ দেন। এই দলটি গড়ে ওঠার এক ইতিহাস আছে। ১৮৭৫ সালে দুটি দল একত্রিত হয়ে এই দলটি গড়ে উঠে। দল দুটি ছিল ফের্দিনান্দ লাসালে গঠিত সাধারণ জার্মান শ্রমিক সংগঠন (General German Workers’ Association ADAV) এবং আগস্ট বেবেল ও ভিলহেল্ম লাইবনেখত গঠিত জার্মানির সমাজগণতান্ত্রিক শ্রমিক দল (Social Democratic Workers’ Party of Germany SDAP)।

পরে ১৮৯০ সালে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলের আধুনিক সংস্করণ তৈরি হয়েছিল। নতুন নামকরণ হয়েছিল জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল (Social Democratic Party of Germany-SPD)।

১৮৭৮ সালে বিসমার্ক জার্মানিতে সমাজতন্ত্র-বিরোধী জরুরি আইন এবং সমাজতান্ত্রিক কাজকর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জেটকিন ১৮৮২ সালে জুরিখ চলে যান। পরে সেখান থেকে প্যারিসে নির্বাসনে যান। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সেই জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন ক্লারা।

তিনি রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা মার্কসবাদী বিপ্লবী এবং তার অন্যতম বন্ধু ওসিপ জেটকিনকে (১৮৫০ - ১৮৮৯) বিয়ে করেন। তাদের প্রথম সন্তান ম্যাক্সিম জেটকিন ১৮৮৩ সালে জন্ম নেয়। দ্বিতীয় বা ছোট সন্তান কোনস্টাইনটিন ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়।

ক্লারা পারিবারিক জীবনের অনেক অভাব-অভিযোগ রোগ-ব্যাধি  ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে মোকাবিলা করেছেন। একদিকে সংসার অন্যদিকে দেশ ও জাতির মুক্তি আন্দোলন। উভয় ক্ষেত্রেই তার দায়িত্ববোধ সমান্তরাল পর্যায়ে চালিয়ে গেছেন।

১৮৮৯ সালে দীর্ঘদিন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত তার স্বামী ওসিপ জেটকিন মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৯০ সালে পার্টির নতুন নাম হয় সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জার্মান। স্বামীর মৃত্যুর শোক উপেক্ষা করে তিনি পার্টির কাজে এগিয়ে আসেন।

এ সময়ে সহযোদ্ধা হিসেবে যাদের কাছে পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে রোজা লুক্সেমবার্গ অন্যতম। ক্লারা ও রোজার মিলিত কর্মকাণ্ড নারী আন্দোলন ও শ্রমজীবী জনতার মুক্তি আন্দোলনকে আরও বেগবান, সুদূর প্রসারী ও সমগ্র দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এছাড়াও প্যারিসে অবস্থানকালে আরও দুই মহান ব্যক্তিত্বকে কাছে পান তিনি। এরা হলেন কার্ল মার্কসের কন্যা লরা ও তার স্বামী পল গ্রাফার।

বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিশীল চর্চার মধ্য দিয়েও সমাজের ভেতর যে একটা সংস্কৃতিগত প্রগতিশীল রূপান্তর আনা যেতে পারে সে ব্যাপারেও ক্লারা জেটকিন বেশ সচেতন প্রয়াস নিয়েছিলেন। ১৮৯১ সালে তার সম্পাদনায় ‘ইকুয়েলিটি’ বা ‘সমতা’ নামে নারীদের জন্যে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকার মাধ্যমেই ক্লারা নারীদের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য অধিকারের লড়াইগুলোর নানা বিশ্লেষণ ও সমাজে তার প্রভাবে সুফলগুলো প্রচার করতে থাকেন।

এই পত্রিকা সমগ্র জার্মানসহ সারা বিশ্বের নারীদের এক সমাজতান্ত্রিক সমতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে একত্রিত ও অনুপ্রাণিত করতে থাকে। অধিকারের জন্য লড়াই করার প্রেরণা হয়ে উঠেছিল পত্রিকাটি। ক্লারার ছোট ছেলে কোনস্টাইনটেন ‘সমতা’ পত্রিকা প্রকাশে মাকে সহযোগিতা করেন। ক্লারা জেটকিন ১৮৯১ হতে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এ পত্রিকার সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯০৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দলের নারী বিষয়ক বিভাগ ‘Women's Office’ প্রতিষ্ঠিত হলে, তিনি এই বিভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। নারী ভোটাধিকারের লড়াইও তখন সমান তালেই চলছিল তার নেতৃত্বে। এই সকল সংগ্রামী কাজের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে অনেক বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ১৯০৭ সালেই আয়োজন করা হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। পরে ১৯১০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কোপেনহেগেন শহরে। এই সভায় ১৭টি দেশের শতাধিক নারী প্রতিনিধি যোগ দেন। এই সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক দলের নারী-কার্যালয়ের (Women's Office) নেত্রী হিসাবে তিনি যোগদান করেন। এই সম্মেলনেই ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস করার প্রস্তাব পেশ করেন। কংগ্রেস ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রস্তাবে তিনি বলেন, প্রতি বছর একই দিনে প্রত্যেকটি দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করতে হবে। একই সাথে তিনি নিজেও ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেন। এরপর থেকেই বিশ্বব্যাপী ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে।

জেন্ডার বিভাজন তৈরির জন্য নয়, নারীদের যে সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে সেটিকেই তুলে ধরে এবং প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। আর সে লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির সাথে নারীর মুক্তিও যে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত সেই বার্তা ও সংগ্রামকে ছড়িয়ে দিতে আজীবন লড়েছেন সুদৃঢ়ভাবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো আন্দোলন করা যাবে না বলে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় তিনি তার প্রতিবাদ করেন। ১৯১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেন তিনি।

১৯১৬ সালে স্পার্টাকাসপন্থী লিগের তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯১৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD ভেঙে Independent Social Democratic Party of Germany বা সংক্ষেপে USPD গঠিত হলে এটিরও তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি বা Communist Party of Germany বা সংক্ষেপে KPD প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রাইখস্ট্যাগে ( Reichstag) এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের সদস্য ছিলেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য পদে ছিলেন।

এসবের ভিতরেই ১৯২৫ সালে জার্মান বাম সংগঠন Rote Hilfe বা ‘লাল সাহায্য’-এর সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে প্রবীণ সদস্য হিসাবে রাইখস্ট্যাগের চেয়ার-ওম্যান পদে ছিলেন ক্লারা।

১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব জার্মান গঠিত হলে তিনি তার সাথে যুক্ত হন। ১৯২০ সালে তিনি কমরেড লেনিনের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ছিলো - The Women's Question।  নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে নারীর ভূমিকা ও তার শ্রেণি সংগ্রাম এবং নারীমুক্তি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করেন। উত্তরও পেয়েছেন যথাযথ।

১৯৩২ সালে যখন তিনি রাইখস্ট্যাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঠিক সে সময় এডলফ হিটলার ক্ষমতায় এলে এই পার্টি নিষিদ্ধ হয়। এরপর তিনি ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যান। ১৯৩৩ সালের ২০ জুন ক্লারা জেটকিন মস্কোতে মৃত্যুবরণ করেন। মস্কোর ক্রেমলিনে তাকে সমাহিত করা হয়।