ঢাকা, শুক্রবার ০৬, মার্চ ২০২৬ ৪:৪২:৫৮ এএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে স্বাধীনতা পুরস্কার দেশে ফিরলেন দুবাইয়ে আটকে পড়া ১৮৯ বাংলাদেশি টানা ৭ দিনের ছুটিতে যাচ্ছে দেশ, ১৬ মার্চ শুরু রাজধানী ঢাকার আকাশ আজ মেঘলা থাকতে পারে ঈদযাত্রায় ট্রেনের তৃতীয় দিনের টিকিট বিক্রি শুরু

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ০৭:১৪ পিএম, ৫ মার্চ ২০২৬ বৃহস্পতিবার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

শিশুরা একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের মনোজগত, কল্পনা, মূল্যবোধ ও মানবিক বোধ গঠনে সাহিত্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুসাহিত্য শুধু বিনোদন দেয় না, বরং শিশুদের কল্পনাশক্তি, নৈতিকতা, ভাষাবোধ ও মানবিকতা বিকাশে সহায়তা করে। বাংলাদেশে শিশুসাহিত্যের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর বিষয়বস্তু, ধরণ ও উপস্থাপনায়ও এসেছে নানা পরিবর্তন। তাই বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যকে বোঝার জন্য এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—এই তিনটি পর্যায় বিশ্লেষণ করা জরুরি।

শিশুসাহিত্যের অতীত

বাংলা শিশুসাহিত্যের শিকড় অনেক পুরোনো। লোককথা, রূপকথা, ছড়া, ধাঁধা ও উপকথা ছিল প্রাচীন বাংলার শিশুদের বিনোদন ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। গ্রামীণ পরিবেশে দাদি-নানিদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্পগুলোই ছিল শিশুদের প্রথম সাহিত্যচর্চা। “ঠাকুরমার ঝুলি”, “গোপাল ভাঁড়ের গল্প”, বিভিন্ন রূপকথা ও লোকগাথা শিশুদের কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করত।

উনিশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণের সময় শিশুসাহিত্য নতুন রূপ পায়। এই সময়ে সাহিত্যিকরা শিশুদের জন্য আলাদা করে সাহিত্য রচনা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশুদের জন্য অসংখ্য ছড়া, কবিতা ও গল্প লিখেছেন। তার “সহজ পাঠ” শিশুদের ভাষা শেখার এক অনন্য গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত।

একই সময়ে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও সুকুমার রায় বাংলা শিশুসাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। উপেন্দ্রকিশোরের “টুনটুনির বই” কিংবা সুকুমার রায়ের “আবোল-তাবোল” শিশুদের কল্পনার জগৎকে আনন্দ ও রসিকতায় ভরিয়ে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার আগে ও পরে শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান এবং হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ। তাদের রচনায় শিশুদের জন্য সহজ ভাষা, মানবিকতা ও কল্পনার সমন্বয় দেখা যায়।

বর্তমান সময়ের শিশুসাহিত্য

বর্তমানে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় হয়েছে। গল্প, উপন্যাস, ছড়া, বিজ্ঞানভিত্তিক বই, কিশোর অ্যাডভেঞ্চার, কমিকস—সব ধরনের বই এখন শিশুদের জন্য প্রকাশিত হচ্ছে। বইমেলা ও বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ সিরিজ প্রকাশ করছে।

এই সময়ে অনেক লেখক শিশুসাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন মুহম্মদ জাফর ইকবাল শিশু-কিশোরদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি ও অ্যাডভেঞ্চার গল্প লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার লেখায় বিজ্ঞান, কল্পনা ও মানবিকতার এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়।

একই সঙ্গে পত্রিকা ও সাময়িকীতেও শিশুদের জন্য বিশেষ বিভাগ রয়েছে। বিভিন্ন শিশু-কিশোর পত্রিকা শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেখানে গল্প, ছড়া, কুইজ, বিজ্ঞানচর্চা, আঁকাআঁকি ও শিক্ষামূলক নানা বিষয় প্রকাশিত হয়।

তবে বর্তমান সময়ে শিশুসাহিত্যের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার, মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অনেক শিশু বই পড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে বইয়ের সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক আগের মতো শক্তিশালী নয়।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। নতুন প্রজন্মের অনেক লেখক শিশুদের জন্য নতুন ধাঁচের গল্প লিখছেন। বিজ্ঞান, পরিবেশ, ইতিহাস, প্রযুক্তি, মহাকাশ—এসব বিষয় নিয়ে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় বই তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তিও শিশুসাহিত্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ই-বুক, অডিওবুক, অ্যানিমেশনভিত্তিক গল্প কিংবা ইন্টারঅ্যাকটিভ বই শিশুদের কাছে সাহিত্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

এছাড়া শিশুদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে স্কুল, পরিবার ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পরিবারে বইয়ের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে পাঠাগার, বইমেলা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক। লোককথা ও রূপকথা থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনি—সবকিছু মিলিয়ে এটি ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে। অতীতের ঐতিহ্য, বর্তমানের বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা—এই তিনের সমন্বয়ে বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

শিশুদের জন্য ভালো সাহিত্য মানে শুধু আনন্দ নয়, এটি তাদের মনন ও মানবিকতা গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাই শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, মানবিক ও সৃজনশীল সমাজ গড়ে তোলার পথ তৈরি করা।