মা—শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই ও মানবিক সংগ্রামের মহাকাব্য
আইরীন নিয়াজী মান্না | উইমেননিউজ২৪প্রকাশিত : ০৯:৩৬ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার
ফাইল ছবি।
রুশ বিপ্লবের অগ্রসর সুর ও মানবিক আবেগের সংহতি- ‘মা’। মা—এই এক কথায় শুধু একটি উপন্যাস নাম নয়, এটি এক জীবন্ত আন্দোলনের চিত্র যা নিঃসন্দেহে পথ খুলে দিয়েছে আধুনিক সমাজতান্ত্রিক উপন্যাসের ধারা।
১৯০৬ সালে রাশিয়ান নাট্য-নীতিক ও সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি লিখেছিলেন উপন্যাস Mother—যা পরবর্তীতে বিশ্ব সাহিত্যে এক প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়। এই গ্রন্থ কেবল একটি পরিবার বা নারীর গল্প নয়; এটি একটি সমাজের জাগরণ, একটি শ্রেণীর আত্মা ও এক বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসকে আবেগময় দৃষ্টিতে উপস্থাপন করে।
সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মা–র পটভূমি রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণীর দমন, শোষণ ও জাগরণের সেই সময়—যখন জারিকৃত স্বৈরশাসন ও নিষ্ঠুর শিল্পপতি শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা প্রতিরোধ শুরু করে। ১৯০০-এর দশকের শুরুর রাশিয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন ও বিপ্লবী চিন্তার আবেশ দিয়ে ফুলে ফোটে। শুরুর দিকে শ্রমিকদের দৈনন্দিন সংগ্রাম ছিল ক্ষুধা, ঘাম, শ্রমঘন্টা ও মানবিক মৌলিক অধিকার—এতসব যন্ত্রণার মধ্যেই জন্ম নেয় মানবিক ও রাজনৈতিক চেতনার এক নতুন ধারা।
মা–র নায়ক নাকি বিপ্লবী নেতা বা অত্যাশ্চর্য ক্ষমতায় বসা কৌতুহলী কোনো বৈজ্ঞানিক—না, এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র পেরোনা মা পলিনা। তিনি কোন নির্মম সমাজতান্ত্রিক বক্তা নন; বরং এক সাধারণ গৃহিণী—যিনি প্রথমে তার সন্তানের দিকে তাকিয়ে, তারপর অসম সমাজের দিকে তাকাতে শিখেন।
পটভূমির শক্তি: সাধারণ মানুষ, অসাধারণ সংগ্রাম
গোর্কির পটভূমি আসলে শ্রমিক আবাস, কাঁটা-ঝোপের মত শীতল কারখানা কোলে বসবাসরত কঠিন ব্যবস্থাপনার লড়াই। বিপ্লবী নেতা কাজ করার মাঠেই—স্তূপে শ্রমিক, গালভেন্টা করা কারখানা ইত্যাদি—এদের বাস্তব জীবনের দিকে গোর্কি বারবার পাঠককে টেনে নিয়ে যান। মা তে সেই বাস্তবতা নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে—যেখানে অস্তিত্বের সংগ্রাম আর সমষ্টির প্রত্যাশার টানাপোড়েন মানুষের হৃদয়ের কাঁধে ভিত্তি গড়ে।
গোর্কি এমন এক সমাজচিত্র উপস্থাপন করেন যেখানে রাজনৈতিক বিপ্লব মানবিক বিপ্লবের সঙ্গে সমান।
“একটি হৃৎপিণ্ড যা পূর্বে শুধুই মা হিসেবে নীরবে দৌড়াত, আজ সে আত্মার ভেতর বিরামহীন প্রশ্ন জাগায়—এটা কি সত্য? কি ঠিক? কি ন্যায্য?”
এই প্রশ্নটি মা–কে একটি রাজনৈতিক রূপকথা (political allegory)–তে পরিণত করে।
চরিত্রিক নির্মাণ ও মানবিক গভীরতা
মা–র চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে মানবিক বিবৃতি ও সামাজিক শতাব্দীর প্রতিনিধিত্ব। পলিনা, যিনি প্রথমে নিঃসন্দেহে জীবনের ব্যস্ততায় আবদ্ধ—বিশেষ করে তার পুত্র পাভেলের ভালোবাসা ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায়—ধীরে ধীরে সমাজের দারিদ্র্য, নির্যাতন ও শোষণকে উপলব্দি করতে থাকেন। এই প্রক্রিয়া কোন ঝটপট অবচেতন পরিবর্তন নয়; এটি এক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, যা শেষে তাকে ব্যাক্তিগত থেকে সামষ্টিক সংগ্রামে নিয়ে যায়।
পলিনার ভেতরে জাগ্রত প্রতিরোধের বীজই মূলত মা উপন্যাসের প্রাণ। এই জাগরণ আমাদের দেখায়—কীভাবে একজন সাধারণ নারী তার ভেতরকার ব্যক্তিগত মায়া ও সামাজিক দায়বোধের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলে নতুন এক সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠে।
ভাষা ও শৈল্পিক মূল্যায়ন
গোর্কির ভাষা সরল কিন্তু তা গভীর। তিনি কোনও অলঙ্কার বা ভারী রূপক ব্যবহার করেন না—তার ভাষা বাস্তব মানুষের মৌখিকতায় সমানুপাতে সিঁড়ি চড়ে ওঠে, যেন প্রত্যক্ষ জীবনের শব্দ মুদ্রিত হচ্ছে পাতায় পাতায়।
এখানে কোনও উচ্চশব্দে বক্তৃতা নয়; বরং এক অভিজ্ঞ মানুষের বিবৃতি—যা পাঠকের মনকে প্রজাতন্ত্রের ঘূর্ণায়িত শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করে।
তার সংলাপগুলি জীবন্ত—সেটি যেমন শ্রমিক গ্রুপের নীরব বোঝাপড়া, তেমনি পলিনার নিজের অন্তর্মুখী বাক্য। এই ভাষা পাঠককে বিচার করে না, পাঠককে সঙ্গে নিয়ে চলতে শেখায়।
রাজনৈতিক পটভূমি ও নৈতিক সমালোচনা
মা–কে শুধু একটি নারীর জীবনকথা হিসাবে দেখা ভুল; এটি এক সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস। এই উপন্যাসে শোষিত শ্রমিকদের সংগ্রাম, শোষণকারীর দমন, ও বিপ্লবী চিন্তার উদ্রেক—এসব মিলিয়ে গোরকি এমন এক নৈতিক ভূমিকায় দাঁড়ান যিনি বলছেন—
“যদি দমন থাকে, মানুষের প্রতিরোধও থাকবে।”
এখানে বিপ্লব কোন দূরের ধারণা নয়; এটি দমিত মানুষের ঘাঁটিতে পৌঁছে থাকা মানুষের বাস্তব সংগ্রাম।
বিশ্বসাহিত্যে মা–র স্থান
পশ্চিম ও পূর্বের সমকালের সমালোচকরা মা–কে কখনও রাজনৈতিক উপন্যাস, কখনও সামাজিক বিশ্লেষণ, আবার কখনও মানবিক চেতনার কবিতা হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এই উপন্যাসটিকে রুশ সাহিত্যের একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে ধরা হয়—যেখানে ব্যক্তিগত মানবিকতার আদানপ্রদান সমাজের বৃহৎ গল্পের আহতকণ্ঠের সঙ্গে মিলিত হয়।
সমালোচক জে. কেউইডসন লিখেছেন,
“মা–তে গোর্কি শুধুমাত্র একটি বিপ্লবের গল্প বলেননি—তিনি একটি মানবিক বিপ্লবের অন্তর্নিহিত গঠন বর্ণনা করেছেন।”
এটাই মা–র নিখুঁত সাহিত্যিক মান।
উপসংহার
মা শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়—এটি এক আন্দোলনের আত্মকথা, এক সমাজচেতনার অন্বেষা।
পলিনা শুধু একজন চরিত্র নয়; তিনি একটি প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি—যে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, অর্থহীনতার বিপরীতে অর্থ সন্ধানে বাধাদিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ উপন্যাস আমাদের শেখায়—মানুষ যদি নিজের দৈনন্দিন জীবনের ব্যথা, স্পৃহা ও আশা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, যদি সে ব্যক্তিগত সীমা পার হয়ে সমাজের প্রতি দৃষ্টি রাখে—তবে সাহিত্য কখনো ব্যর্থ হয় না।
মা তাই একটি দক্ষ শিল্পী বা বিপ্লবী কবিতার সৃষ্টি নয়; এটি মানুষের লাভ-হানি, তাদের আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক মর্যাদার ওপর লেখা এক অমোচনীয় পাঠ।
- মা—শ্রমিক শ্রেণীর লড়াই ও মানবিক সংগ্রামের মহাকাব্য
- দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্থিতিশীল, তবুও ঝুঁকি কাটেনি
- হাসির আড়ালে সময়ের ভার—ববিতার একুশে পদকের দিন
- দ্বিতীয় দিনে বইমেলায় ভিড় নেই, কাজ চলছে স্টলে স্টলে
- ধানমন্ডিতে ঝটিকা মিছিল, মহিলা আ. লীগের সাত নেতাকর্মী গ্রেফতার
- জলাভূমির লাজুক বাসিন্দা আমাদের ডাহুক পাখি
- ছুটির দিনে জমজমাট রাজধানীর ঈদের বাজার
- ইফতারে কলা খাওয়ার উপকারিতা জানলে অবাক হবেন
- ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে দুই মাস নদীতে মাছ ধরা নিষেধ
- রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে ফের ভূমিকম্প অনুভূত
- একুশে বইমেলা: ছুটির দিনে জমার প্রত্যাশা
- তাপমাত্রা নিয়ে ৫ দিনের পূর্বাভাসে যা জানাল আবহাওয়া অফিস
- রমজানে লেবু-শসায় আগুন, ইফতারসামগ্রীর বাজারে চাপ
- নারিন্দায় মধ্যরাতে ভয়াবহ এসি বিস্ফোরণ: একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ
- মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী
- এবার অভিনয়ে সাদিয়ার পোষা বিড়াল, আসছে ওয়েব ফিল্ম ‘মিউ’
- শিল্পসাহিত্য চর্চা রাজনীতিকরণ সভ্য সমাজের পরিচয় না: প্রধানমন্ত্রী
- টিউলিপ সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করতে রেড নোটিশের নির্দেশ
- ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ফের ভূমিকম্প, কিসের সংকেত?
- একুশে বইমেলা শুরু আজ, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
- ঢাবি মেট্রো স্টেশন ২ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে যে কারণে
- মাদারীপুরে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, স্বামী আটক
- পাঁচ মামলায় সাবেক মেয়র আইভী রহমানের জামিন
- তরুণদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
- ছুটির দিনে জমজমাট রাজধানীর ঈদের বাজার
- ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ফের ভূমিকম্প, রিখটার স্কেলে ৪.৬
- মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী
- রমজানে লেবু-শসায় আগুন, ইফতারসামগ্রীর বাজারে চাপ
- গুণীজনদের হাতে একুশে পদক তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী
- রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ: অগ্রগতি, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ পথচলা







