ঢাকা, শনিবার ২৯, আগস্ট ২০২৬ ১২:১৮:৪৪ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন আইরিন খান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫০ কিলোমিটার যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা নেপাল-চীনে বন্যায় নিহত বেড়ে ৫৮৪, নিখোঁজ ২৫০০ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানিতে ডুবে ৫ শিশুর মৃত্যু নেপালে বন্যা: মৃত্যু বেড়ে ৫৭৯, নিখোঁজ প্রায় ২ হাজার নেপালের বন্যা: হিমালয় যখন সতর্কবার্তা দেয় নিষেধাজ্ঞা শেষে ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবন

তীর-ধনুক হাতে ইতিহাস গড়া মাটিল্ডা হাওয়েল

অনু সরকার | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:১১ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০২৬ শুক্রবার

তীরন্দাজ মাটিল্ডা ‘লিডা’ হাওয়েল।

তীরন্দাজ মাটিল্ডা ‘লিডা’ হাওয়েল।

পুরুষের খেলা হিসেবে বিবেচিত তীরন্দাজিতে উনিশ শতকের শেষভাগে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন এক মার্কিন নারী। ১৯০৪ সালের অলিম্পিকে তাঁর অসাধারণ সাফল্য তাঁকে পরিণত করে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় নারী তীরন্দাজে। তিনি মাটিল্ডা ‘লিডা’ হাওয়েল।
তীর হাতে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। চোখ স্থির লক্ষ্যবস্তুর দিকে। ধনুকের ছিলা টানটান। চারপাশের কোলাহল যেন তাঁর কাছে নেই। মুহূর্তের মধ্যে ছুটে গেল তীর—সোজা লক্ষ্যভেদ করে।
উনিশ শতকের শেষভাগে একজন নারীর এমন দৃশ্য কল্পনা করাই ছিল অনেকের কাছে অস্বাভাবিক। অথচ সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী তীরন্দাজ পুরুষপ্রধান ক্রীড়াজগতে নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছিলেন আলাদা জায়গা।
তিনি মাটিল্ডা ‘লিডা’ হাওয়েল—যাঁকে ক্রীড়া ইতিহাসে সাধারণত Matilda Howell নামে উল্লেখ করা হয়।
১৯০৪ সালের সেন্ট লুইস অলিম্পিক তাঁর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। ওই আসরে তিনি শুধু নিজের প্রতিভার পরিচয়ই দেননি, নারী তীরন্দাজির ইতিহাসেও রেখে গেছেন স্থায়ী ছাপ।

তীরন্দাজির প্রতি ভালোবাসা
মাটিল্ডা হাওয়েলের জন্ম ২৮ আগস্ট ১৮৫৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসে।
ছোটবেলা থেকেই তীরন্দাজির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে তীরন্দাজি ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত ক্রীড়ায় পরিণত হচ্ছিল। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজে তীরন্দাজির চর্চা জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।
তবে নারীদের জন্য খেলাধুলার সুযোগ ছিল সীমিত। তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে সামাজিক নানা ধারণা ছিল। ফলে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নারীদের অংশগ্রহণকে তখনও স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হতো না।
হাওয়েল সেই মানসিকতার বিরুদ্ধে নিজের দক্ষতা দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন।

শুধু শখের খেলোয়াড় ছিলেন না
হাওয়েলের তীরন্দাজি ছিল নিছক বিনোদন নয়। তিনি নিয়মিত অনুশীলন করতেন এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন।
তাঁর সাফল্য ক্রমে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পরিচিত নারী তীরন্দাজে পরিণত করে।
তখনকার তীরন্দাজি আজকের অলিম্পিক তীরন্দাজির মতো ছিল না। ব্যবহৃত হতো ভিন্ন ধরনের ধনুক ও প্রতিযোগিতার নিয়মও ছিল আলাদা। Columbia round-সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতায় তীরন্দাজদের দক্ষতা যাচাই করা হতো।
এই পরিবেশেই হাওয়েল নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।

১৯০৪—জীবনের শ্রেষ্ঠ বছর
১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় আধুনিক অলিম্পিক গেমস।
এই অলিম্পিক ছিল নানা দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। ইউরোপের বাইরে অনুষ্ঠিত প্রথম দিকের অলিম্পিকগুলোর একটি ছিল এটি। একই সঙ্গে নারীদের অংশগ্রহণও আগের তুলনায় বাড়ছিল।
তীরন্দাজিতে নারীদের জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ ছিল।
আর সেই সুযোগকে অসাধারণভাবে কাজে লাগান মাটিল্ডা হাওয়েল।

তিনটি স্বর্ণপদক!
১৯০৪ সালের অলিম্পিকে হাওয়েল তিনটি স্বর্ণপদক জেতেন।
নারীদের তীরন্দাজির বিভিন্ন ইভেন্টে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে ওই অলিম্পিকের অন্যতম সফল নারী ক্রীড়াবিদে পরিণত করে।
তিনি Double Columbia round, Double National round এবং Team archery প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জেতেন।
অর্থাৎ ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলগত প্রতিযোগিতাতেও তিনি সফল ছিলেন।
এখানেই তাঁর কৃতিত্বের বিশেষত্ব।
একজন নারী হিসেবে শুধু অংশগ্রহণ করাই তখন বড় অর্জন ছিল। আর হাওয়েল সেই অংশগ্রহণকে রূপ দিয়েছিলেন স্বর্ণজয়ে।

এক অলিম্পিকেই তিন স্বর্ণ
আজকের দিনে একজন ক্রীড়াবিদ এক অলিম্পিকে তিনটি স্বর্ণপদক জিতলে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু ১৯০৪ সালের অলিম্পিকের অনেক রেকর্ড ও কৃতিত্ব পরবর্তী সময়ে যথেষ্ট আলোচনার বাইরে চলে যায়।
মাটিল্ডা হাওয়েলের তিন স্বর্ণপদকও তার মধ্যে একটি।
তাঁর সাফল্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি এমন একটি সময়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, যখন নারীদের ক্রীড়াক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত।

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য এক দৃষ্টান্ত
মাটিল্ডা হাওয়েলের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু তাঁর জেতা পদকের সংখ্যায় নয়।
তিনি এমন সময়ে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশ নিয়েছিলেন, যখন নারীদের খেলাধুলাকে অনেক ক্ষেত্রেই শারীরিক ও সামাজিকভাবে অনুপযুক্ত বলে মনে করা হতো।
নারীর শরীর নিয়ে নানা সামাজিক বিধিনিষেধ ছিল। মেয়েদের জন্য ‘ভদ্র’ বিনোদন কী হবে, সেটিও সমাজ ঠিক করে দিত।
তীরন্দাজি অবশ্য নারীদের জন্য কিছুটা গ্রহণযোগ্য ক্রীড়া হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করে স্বর্ণপদক জেতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।
হাওয়েল সেই সীমা অতিক্রম করেছিলেন।

তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিল ধারাবাহিক অনুশীলন
তীরন্দাজি এমন একটি খেলা যেখানে শুধু শক্তি থাকলেই হয় না। প্রয়োজন চোখ ও হাতের নিখুঁত সমন্বয়, মনোযোগ, ধৈর্য এবং মানসিক স্থিরতা।
একটি তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার অর্থ পুরো প্রতিযোগিতার ফল বদলে যেতে পারে।
হাওয়েল এই সূক্ষ্ম দক্ষতাগুলো আয়ত্ত করেছিলেন।
তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, নারীরাও দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের ক্রীড়াবিদ হতে পারেন।
অলিম্পিকের বাইরেও সাফল্য
অলিম্পিকের স্বর্ণপদকই হাওয়েলের একমাত্র অর্জন ছিল না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তীরন্দাজি প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন এবং জাতীয় পর্যায়েও সাফল্য অর্জন করেন।
তাঁর সময়ের তীরন্দাজি সংগঠন ও প্রতিযোগিতাগুলো আজকের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সুসংগঠিত ছিল না। তারপরও তিনি নিজের প্রজন্মের অন্যতম সেরা নারী তীরন্দাজ হিসেবে পরিচিতি পান।

ইতিহাসে তাঁর অবস্থান
মাটিল্ডা হাওয়েলের নাম আজকের অনেক ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে হয়তো খুব পরিচিত নয়।
কিন্তু অলিম্পিকের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, নারী ক্রীড়াবিদদের পথ তৈরিতে উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুর দিকের খেলোয়াড়দের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাওয়েল তাঁদেরই একজন।
তিনি দেখিয়েছিলেন, নারীর জন্য ক্রীড়াক্ষেত্রে শুধু দর্শকের আসন নয়—প্রতিযোগিতার মাঠও হতে পারে।
আর সেখানে নারী শুধু অংশগ্রহণই করবে না, পুরুষের সঙ্গে সমান মর্যাদায় নিজের দক্ষতার প্রমাণও দিতে পারবে।

১৯৩০ সালে অবসান জীবনের
দীর্ঘ জীবন শেষে মাটিল্ডা হাওয়েল ১৯৩০ সালের ২০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর অলিম্পিক কৃতিত্ব ইতিহাসে থেকে যায়।
১৯০৪ সালে সেন্ট লুইসের মাঠে যে নারী তিনটি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন, তাঁর সাফল্যের তাৎপর্য সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

একটি তীর, একটি লক্ষ্য, একটি ইতিহাস
মাটিল্ডা হাওয়েলের জীবনকে শুধু তিনটি স্বর্ণপদকের গল্প বললে তাঁর প্রতি অবিচার হবে।
কারণ তাঁর আসল গল্প হলো সীমা অতিক্রম করার গল্প।
যে সময়ে নারীদের খেলাধুলার জগতে প্রবেশের পথ ছিল সংকীর্ণ, সে সময় তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন ধনুক। নিজের দক্ষতা দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেছিলেন এবং অলিম্পিকের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছিলেন ইতিহাসের পাতায়।
তাঁর তীর হয়তো এক শতাব্দীরও বেশি আগে লক্ষ্যভেদ করেছিল। কিন্তু সেই তীরের প্রতীকী অর্থ আজও অমলিন।
কারণ লক্ষ্য যত দূরেই থাকুক, সামনে যত বাধাই থাকুক—লক্ষ্য স্থির থাকলে ইতিহাস বদলে দেওয়া সম্ভব।
মাটিল্ডা ‘লিডা’ হাওয়েল সেই সাহসী নারীদের একজন, যিনি তীর-ধনুক হাতে শুধু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেননি; আঘাত করেছিলেন নারীদের সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত পুরোনো ধারণাতেও।