ঢাকা, মঙ্গলবার ০১, সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৫৮:৩৩ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
লোডশেডিং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে কমে আসবে : জাহেদ উর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত রাজশাহীতে রেললাইনে ভাঙন, ২ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু নেপালে বন্যায় প্রাণহানী বেড়ে ৯৫৫, নিখোঁজ ৪৪৭১ আন্তর্জাতিক ফুটবলের কিংবদন্তি মেসির বিদায়! তিন মাস নিষেধাজ্ঞার পর আজ খুলেছে সুন্দরবন নেপালের বন্যায় এক বাড়ি থেকেই মিলল ২৪ মরদেহ

বিশ্ব চিঠি দিবস: হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সেই চিঠির দিনে

ডেস্ক নিউজ | উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১২:১৩ পিএম, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

একটি সাদা কাগজ। হাতে লেখা কয়েকটি কথা। ভাঁজ করে খামের ভেতর রাখা। খামের ওপর প্রাপকের নাম ও ঠিকানা লিখে সেটি ফেলে দেওয়া ডাকবাক্সে। তারপর অপেক্ষা—কবে চিঠি পৌঁছাবে, কবে আসবে উত্তর?

উত্তর আসার দিনটি যেন ছিল ছোট্ট এক উৎসব। ডাকপিয়নের হাতে প্রিয় মানুষের চিঠি দেখলেই মুখে ফুটে উঠত হাসি। কখনও সেই চিঠিতে থাকত ভালোবাসা, কখনও অভিমান, কখনও দূরে থাকা আপনজনের খবর। আবার কখনও কয়েকটি সাধারণ কথাই হয়ে উঠত সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই অতীতের গল্প। মুঠোফোনের এক ছোঁয়ায় মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায় বার্তা। তবু হাতে লেখা চিঠির আবেদন যেন পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। বরং দ্রুত যোগাযোগের এই সময়ে চিঠি হয়ে উঠেছে আরও ব্যক্তিগত, আরও আবেগময় এবং আরও দুর্লভ।

আজ বিশ্ব চিঠি দিবস

প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব চিঠি দিবস। এই দিবসের উদ্দেশ্য মানুষকে আবার কাগজ-কলমে চিঠি লেখার অভ্যাসে ফিরিয়ে আনা।

২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার লেখক, আলোকচিত্রী ও শিল্পী রিচার্ড সিম্পকিন সিডনির ওয়েভারলি কলেজে দিবসটির সূচনা করেন। চিঠি লেখার প্রতি তাঁর নিজের আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগের শুরু।

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে সিম্পকিন অস্ট্রেলিয়ার যাঁদের কিংবদন্তি মনে করতেন, তাঁদের কাছে চিঠি লিখতেন। অনেকের কাছ থেকেই তিনি উত্তর পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা পরে ২০০৫ সালে ‘অস্ট্রেলিয়ান লিজেন্ডস’ বইয়ে তুলে ধরেন। এরপর চিঠি লেখার আনন্দ আরও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন বিশ্ব চিঠি দিবস।

চিঠি মানেই ছিল অপেক্ষা

চিঠির সবচেয়ে আলাদা দিক ছিল তার ধীরগতি। এখন কেউ বার্তা পাঠিয়ে কয়েক মিনিট উত্তর না পেলেই অস্থির হয়ে পড়েন। অথচ চিঠির সময়ে অপেক্ষাটাই ছিল যোগাযোগের স্বাভাবিক অংশ।

চিঠি লেখার সময় মানুষকে ভাবতে হতো—কী লিখবেন, কোন কথাটি আগে বলবেন, কীভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করবেন। ফলে চিঠির প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত সময়, মনোযোগ ও আবেগ।

রিচার্ড সিম্পকিনের উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্যও ছিল এই মনোযোগী লেখার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা। তাৎক্ষণিক বার্তার মতো চিঠি লিখে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া যায় না। নিজের কথা গুছিয়ে লিখতে হয়, প্রাপককে নিয়ে ভাবতে হয়।

ডাকবাক্স ছিল দূরের মানুষের কাছে যাওয়ার দরজা

একসময় রাস্তার পাশে থাকা ছোট্ট ডাকবাক্সই ছিল দূরের মানুষের কাছে নিজের কথা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম। হাতে লেখা চিঠি সেখানে ফেলে দিয়ে মানুষ অপেক্ষা করত ডাকপিয়নের জন্য।

যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৫৮ সালে শহরের রাস্তায় চিঠি সংগ্রহের বাক্স স্থাপন শুরু হয়। ফলে প্রতিবার ডাকঘরে গিয়ে চিঠি জমা দেওয়ার প্রয়োজন থাকত না। রাস্তার সংগ্রহ বাক্সেই চিঠি ফেলে দেওয়া যেত।

ডাকব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দূরে থাকা মানুষদের যোগাযোগও সহজ হয়। উনিশ শতকে ডাকের খরচ কমে আসা এবং ডাকব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দূরে থাকা বন্ধু, পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও বাড়ে।

বাংলার জীবনেও চিঠির আলাদা জায়গা

বাংলার জীবনেও একসময় চিঠি ছিল খুব পরিচিত একটি বিষয়। বাড়ির সামনে ডাকপিয়ন এসে কারও নাম ধরে ডাকছেন—এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপেক্ষা, আনন্দ ও উৎকণ্ঠা।

দূরে থাকা সন্তান বাবা-মাকে চিঠি লিখেছেন। স্বামী লিখেছেন স্ত্রীকে। বন্ধু লিখেছে বন্ধুকে। কেউ জানিয়েছে চাকরির খবর, কেউ পরীক্ষার ফল। কেউ লিখেছে বাড়ির অভাব-অভিযোগ। আবার কেউ শুধু লিখেছে—ভালো আছি, তুমি কেমন আছ?

চিঠি সবসময় আনুষ্ঠানিক কথার জায়গা ছিল না। অনেক সময় মুখোমুখি বলা সম্ভব হয়নি এমন কথাও চিঠির পাতায় লেখা যেত। অভিমান, ভালোবাসা, অনুশোচনা, অপেক্ষা কিংবা মনের গোপন কথাগুলো জায়গা পেত কয়েকটি হাতে লেখা লাইনে।

হাতের লেখাতেই লুকিয়ে থাকত মানুষের ছোঁয়া

একটি চিঠির নিজস্ব একটা শরীর আছে। কাগজের ভাঁজ, খামের ওপর হাতের লেখা, কালির দাগ, ভুল করে কেটে দেওয়া কোনো শব্দ—সব মিলিয়ে চিঠিটি হয়ে উঠত আলাদা এক স্মৃতি।

আজকের একটি বার্তা হাজারো বার্তার ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বহু বছর আগের একটি চিঠি পুরোনো বইয়ের ভাঁজে কিংবা কাঠের বাক্সে পাওয়া গেলে মুহূর্তেই ফিরিয়ে নিতে পারে কোনো নির্দিষ্ট সময়, মানুষ কিংবা সম্পর্কের কাছে।

তাই চিঠি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, অনেকের কাছে এটি স্মৃতিরও একটি অংশ।

ইতিহাসও সংরক্ষিত হয়েছে চিঠির পাতায়

চিঠির গুরুত্ব শুধু ব্যক্তিগত আবেগে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও চিঠির পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে।

ব্যক্তিগত চিঠি, রাজনৈতিক চিঠিপত্র, যুদ্ধকালীন চিঠি কিংবা সাহিত্যিকদের পারস্পরিক যোগাযোগ—এসব অনেক সময় অতীতের মানুষ ও সময়কে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।

অর্থাৎ ডাকব্যবস্থা শুধু চিঠি বহন করেনি। এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের সম্পর্ক বদলে যাওয়ার ইতিহাসেরও অংশ।

মুঠোফোনের যুগে বদলে গেছে অপেক্ষা

প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে চিঠি লেখার অভ্যাস কমেছে। জরুরি খবরের জন্য মুঠোফোন, দীর্ঘ বার্তার জন্য বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম, আর অফিসের যোগাযোগে বৈদ্যুতিন ডাক—সবই এখন হাতের নাগালে।

অপেক্ষার জায়গা অনেকটাই দখল করেছে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ। ডাকপিয়নের পায়ের শব্দের বদলে এখন মানুষ অপেক্ষা করে মুঠোফোনের বার্তার সংকেতের জন্য।

তবু চিঠির আবেদন আলাদা। কারণ একটি চিঠি লিখতে কাউকে সময় দিতে হয়। ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় আলাদা করে কাগজ-কলম হাতে বসতে হয়। প্রাপককে মনে করতে হয়। নিজের কথাগুলো গুছিয়ে লিখতে হয়।

আর এই সময়টুকুই হয়তো চিঠির সবচেয়ে বড় উপহার।

হারিয়ে যেতে বসা অভ্যাসটি ফিরুক

বিশ্ব চিঠি দিবসের মূল বার্তা প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়া নয়। বরং দ্রুত যোগাযোগের এই সময়ে ধীর, ব্যক্তিগত ও অর্থবহ যোগাযোগের জায়গাটুকু ধরে রাখা।

দিবসটির প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড সিম্পকিন এখনো বিদ্যালয়ে চিঠি লেখার কর্মশালা করেন। শিশু-কিশোর ও বড়দের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে কাউকে চিঠি লেখার উৎসাহ দেন।

আজ হয়তো ডাকবাক্সের দিকে তাকালে আগের মতো চিঠির স্তূপ দেখা যায় না। অনেক ডাকবাক্স নীরব দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক সময়ের গল্প—কেউ লিখেছে, কেউ অপেক্ষা করেছে, কেউ উত্তর পেয়েছে, কেউ আবার উত্তর না পেয়েও চিঠিটি যত্ন করে রেখে দিয়েছে।

মুঠোফোনের পর্দায় ‘ভালো থেকো’ লেখা যায় কয়েক সেকেন্ডে। কিন্তু কাগজে ‘ভালো থেকো’ লিখতে গেলে হাত থামে, মন ভাবে, শব্দ বেছে নিতে হয়। আর সেই কারণেই হাতে লেখা একটি চিঠি শুধু কয়েকটি শব্দ নয়—এটি একজন মানুষের আরেকজন মানুষের জন্য রেখে যাওয়া সময়, স্মৃতি ও ভালোবাসার ছোট্ট দলিল।

আজ একটি চিঠি লিখবেন?

বিশ্ব চিঠি দিবসে পুরোনো ডাকবাক্সের কথা মনে করার পাশাপাশি একটি কাজ করা যায়—কাগজ-কলম হাতে নিয়ে এমন কাউকে চিঠি লেখা, যাকে অনেক দিন কিছু বলা হয়নি।

কারণ সব যোগাযোগ দ্রুত হতে হয় না। কিছু কথা একটু দেরিতে পৌঁছালেই তার মূল্য আরও বেড়ে যায়।

হয়তো আপনার লেখা কয়েকটি হাতে লেখা লাইন কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে বহু বছর পরও যত্ন করে রেখে দেওয়ার মতো একটি স্মৃতি।